‘সিটি অব গড’ সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য। কোলাজ
‘সিটি অব গড’ সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য। কোলাজ

আলোচনায় ‘সিটি অব গড’, কী আছে এই সিনেমায়

ব্রাজিলের প্রধান পর্যটন শহর রিও ডি জেনিরোর উপকণ্ঠে ‘সিটি অব গড’ নামে একটি বস্তি রয়েছে। সেই বস্তির অপরাধী দল নিয়ে ২০০২ সালে সিনেমাটি তৈরি করেন ব্রাজিলের চলচ্চিত্র পরিচালক ফের্নান্দো ফেরেইরা মেইরেলেস ও কাতিয়া লুন্দ। বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারায় ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বস্তি ‘সিটি অব গড’ এখনো অপরাধপ্রবণ। বাংলাদেশের মোহাম্মদপুরও যেন ‘সিটি অব গড’ দশকের পর দশক ধরে সেখানে অপরাধী দল নিজেদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি খুন করছে। মাদক ব্যবসা করছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি করছে। কিন্তু তাদের দমন করা যাচ্ছে না। গতকাল রোববার প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে ‘মোহাম্মদপুর কি ঢাকার “সিটি অব গড”’ শিরোনামের প্রতিবেদন। সেই সূত্র ধরে আবার আলোচনায় ‘সিটি অব গড’ সিনেমাটি।

আজও যখন বিশ্বের নানা প্রান্তে দারিদ্র্য, বৈষম্য আর অপরাধ একই সুতোয় গাঁথা, তখন ‘সিটি অব গড’ নতুন করে প্রশ্ন তোলে—সমস্যাটা কোথায়? ব্যক্তি, না সমাজ?ছবিটি দেখার পর দর্শক শুধু একটি গল্প দেখে না, বরং একটা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। রকেটের ক্যামেরা যেন আমাদের চোখ হয়ে ওঠে, আর লিল’জে আমাদের ভয়। আমেরিকান সিনেমায় বয়েজ এন দ্য হুড যেমন দক্ষিণ লস অ্যাঞ্জেলেসের কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরে ‘হুড ফিল্ম’ধারার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি ‘সিটি অব গড’ সেই ধারাকে নিয়ে যায় ব্রাজিলের ফাভেলা সংস্কৃতিতে। এখানে ‘হুড’ বদলে হয়ে যায় ‘ফাভেলা’, কিন্তু দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর সহিংসতার ভাষা একই থাকে।

ব্রাজিলের শহুরে অন্ধকার, অপরাধ আর বেঁচে থাকার নির্মম বাস্তবতাকে এমন শ্বাসরুদ্ধকর ভঙ্গিতে খুব কম সিনেমাতেই তুলে ধরতে পেরেছে, যেমনটা করেছে ‘সিটি অব গড’। মুক্তির দুই দশক পেরিয়েও ছবিটি বিশ্ব সিনেমার আলোচনায় অনিবার্য—কারণ, এটি শুধু একটি অপরাধভিত্তিক গল্প নয়, বরং একটি সমাজের গভীর ক্ষতচিহ্নের নির্মম দলিল।

বস্তির গল্প, মানুষের গল্প
রিও ডি জেনিরোর এক বস্তি ‘সিটি অব গড’। নাম শুনলে মনে হতে পারে স্বপ্নের কোনো জায়গা, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল অপরাধ, দারিদ্র্য আর সহিংসতার এক দহনক্ষেত্র। ফের্নান্দো ফেরেইরা মেইরেলেস ও কাতিয়া লুন্দ পরিচালিত এই ছবি সেই বস্তির কয়েক দশকের বিবর্তনের গল্প বলে, যেখানে শিশুদের হাতেই বন্দুক উঠে যায়, আর স্বপ্নগুলো গুলির শব্দে হারিয়ে যায়।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র রকেট—এক কিশোর, যে এই সহিংস বাস্তবতার ভেতর থেকেও অন্য এক জীবন খুঁজে পেতে চায়। ফটোগ্রাফির প্রতি ভালোবাসা তাকে আলাদা করে দেয়। অপর দিকে আছে লিল’জে—শৈশব থেকেই নির্মম, যে বড় হয়ে এলাকার সবচেয়ে ভয়ংকর মাদক সম্রাট হয়ে ওঠে। এই দুই চরিত্রের বিপরীত জীবনধারা আসলে একই সমাজের দুই দিক।

বাস্তবতার নির্মমতা ও সিনেমার ভাষা
এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি এর নির্মাণশৈলী। দ্রুতগতির এডিটিং, ডকুমেন্টারি ধাঁচের ক্যামেরা, আর অপ্রফেশনাল অভিনেতাদের ব্যবহার ছবিটিকে দিয়েছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা। মনে হয় যেন কোনো গল্প দেখছি না, বরং প্রত্যক্ষ করছি জীবন্ত এক ইতিহাস।
ছবিটি তৈরি হয়েছে পাউলো লিন্সের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে। লেখক নিজেই সেই বস্তির বাসিন্দা ছিলেন, ফলে গল্পে বাস্তবতার গভীরতা এসেছে স্বাভাবিকভাবেই।

‘সিটি অব গড’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

সহিংসতা, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন নয়

‘সিটি অব গড’-এ সহিংসতা আছে—অনেকটাই। কিন্তু তা কখনোই বিনোদনের জন্য নয়, বরং প্রতিটি গুলির শব্দ, প্রতিটি হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে তুলে ধরে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা: যখন রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, তখন অপরাধই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।
বিশেষ করে শিশুদের জড়িয়ে পড়ার দৃশ্যগুলো দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে। লিল’জে যখন ছোট শিশুদের বন্দুক ধরিয়ে তাদের দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, কাকে গুলি করা হবে, তখন সিনেমা আর শুধু গল্প থাকে না, হয়ে ওঠে নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
এই সহিংসতা কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং একটি ভেঙে পড়া সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন। যেখানে দারিদ্র্য, মাদক আর রাষ্ট্রীয় অবহেলা মিলে তৈরি করে এক ভয়ংকর চক্র।

‘সিটি অব গড’-এর আগে ব্রাজিলের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেলেও তা ছিল মূলত শিল্পঘেঁষা ড্রামা। যেমন ‘সেন্ট্রাল স্টেশন’ বা ‘ফোর ডেজ ইন সেপ্টেম্বর’, যেগুলো সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও মূলধারার দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।কিন্তু ‘সিটি অব গড’ সেই সীমা ভেঙে দেয়। এটি একই সঙ্গে শিল্পমান বজায় রেখে জনপ্রিয়তাও অর্জন করে। কান উৎসবে প্রদর্শিত হওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে বক্স অফিস সাফল্য—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক বৈশ্বিক ঘটনা।

গ্যাংস্টার সিনেমা, কিন্তু ভিন্ন স্বাদে
‘সিটি অব গড’ অনেকাংশে গ্যাংস্টার সিনেমার কাঠামো অনুসরণ করে। ‘গুডফেলোজ’-এর মতোই এখানে একজন বর্ণনাকারী আমাদের নিয়ে যায় অপরাধের ভেতরের জগতে। আবার দ্রুতগতির সম্পাদনা, অধ্যায়ভিত্তিক গল্প বলা—এসবের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় কোয়েন্টিক ট্যারান্টিনোর প্রভাব।

কিন্তু পার্থক্য হলো—এখানে গ্ল্যামার নেই। বন্দুক, টাকা আর ক্ষমতা—সবই আছে, কিন্তু সেগুলো কখনোই আকর্ষণীয় করে দেখানো হয়নি। বরং প্রতিটি দৃশ্যই মনে করিয়ে দেয়, এই জীবন বেছে নেওয়া নয়, বরং বাধ্য হয়ে তাতে জড়িয়ে পড়া।
ছবিটির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য এর অভিনেতারা। অধিকাংশই ছিলেন ফাভেলা থেকে উঠে আসা নতুন মুখ। অভিনয়ের আগে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ওয়ার্কশপে, দীর্ঘ প্রস্তুতির মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় চরিত্র।
এই পদ্ধতির ফলে ছবির প্রতিটি চরিত্রে এসেছে এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতা। মনে হয় না তারা অভিনয় করছে, বরং যেন নিজেদের জীবনই বাঁচছে।

ব্রাজিলিয়ান সিনেমার মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
‘সিটি অব গড’-এর আগে ব্রাজিলের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেলেও তা ছিল মূলত শিল্পঘেঁষা ড্রামা। যেমন ‘সেন্ট্রাল স্টেশন’ বা ‘ফোর ডেজ ইন সেপ্টেম্বর’, যেগুলো সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও মূলধারার দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
কিন্তু ‘সিটি অব গড’ সেই সীমা ভেঙে দেয়। এটি একই সঙ্গে শিল্পমান বজায় রেখে জনপ্রিয়তাও অর্জন করে। কান উৎসবে প্রদর্শিত হওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে বক্স অফিস সাফল্য—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক বৈশ্বিক ঘটনা।

চারটি বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পায়—সেরা পরিচালক, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি ও সেরা এডিটিং। যদিও কোনো পুরস্কার জেতেনি, তবু এটি ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে আধুনিক ক্ল্যাসিক হিসেবে।
বিশ্বের নানা চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমালোচকেরা এই ছবিকে উল্লেখ করেন অপরাধভিত্তিক সিনেমার নতুন ভাষা হিসেবে। হলিউডেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

‘সিটি অব গড’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

প্রশংসা, বিতর্ক ও প্রশ্ন
ছবিটি যেমন প্রশংসা পেয়েছে, তেমনি বিতর্কও কম হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন, এটি ফাভেলার মানুষের জীবনকে একপক্ষীয়কভাবে সহিংস হিসেবে তুলে ধরেছে। আবার অনেকে বলেন, এটি বাস্তবতাকে তুলে ধরার সাহসী প্রচেষ্টা।

পরিকল্পনা নয়, আবেগ
পরিচালক ফের্নান্দো ফেরেইরা মেইরেলেস নিজেই স্বীকার করেছেন, এই ছবি তিনি বানিয়েছিলেন কোনো ‘মাস্টারপিস’ তৈরির উদ্দেশ্যে নয়, বরং একদল তরুণ নির্মাতা, সীমিত বাজেট, অচেনা অভিনেতা—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক আবেগঘন উদ্যোগ। এমনকি অর্থের সংকটে পড়ে ছবির অর্থায়নও তিনি নিজেই করেছিলেন।
এই অকৃত্রিমতা, এই স্বাধীনতা সম্ভবত ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ, এতে কোনো স্টুডিওর চাপ, বাজারের হিসাব বা তারকাখ্যাতির বোঝা ছিল না। ফলে গল্পটি হয়েছে নির্মমভাবে সৎ।

‘সিটি অব গড’ শুধু আন্তর্জাতিক দর্শককেই নয়, ব্রাজিলের মানুষকেও নতুনভাবে তাদের সমাজকে দেখতে বাধ্য করেছিল। মেইরেলেসের ভাষায়, এই ছবি ‘ব্রাজিলকে ব্রাজিলের কাছেই উন্মোচন করেছে।’

রিও ডি জেনিরোর ‘সিদাদে দে দেউস’ ফাভেলা, যেখানে দারিদ্র্য, অপরাধ, পুলিশের দুর্নীতি আর মাদক চক্র এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে, সেটি আগে খুব কমই সিনেমায় এভাবে উঠে এসেছে। ছবিটি সেই অদেখা বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয়।

‘সিটি অব গড’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

কেন এখনো প্রাসঙ্গিক
আজও যখন বিশ্বের নানা প্রান্তে দারিদ্র্য, বৈষম্য আর অপরাধ একই সুতোয় গাঁথা, তখন ‘সিটি অব গড’ নতুন করে প্রশ্ন তোলে—সমস্যাটা কোথায়? ব্যক্তি, না সমাজ?
ছবিটি দেখার পর দর্শক শুধু একটি গল্প দেখে না, বরং একটা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। রকেটের ক্যামেরা যেন আমাদের চোখ হয়ে ওঠে, আর লিল’জে আমাদের ভয়। আমেরিকান সিনেমায় বয়েজ এন দ্য হুড যেমন দক্ষিণ লস অ্যাঞ্জেলেসের কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরে ‘হুড ফিল্ম’ধারার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি ‘সিটি অব গড’ সেই ধারাকে নিয়ে যায় ব্রাজিলের ফাভেলা সংস্কৃতিতে। এখানে ‘হুড’ বদলে হয়ে যায় ‘ফাভেলা’, কিন্তু দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর সহিংসতার ভাষা একই থাকে।

আইএমডিবি ও কোলাইডার অবলম্বনে