এআইয়ের সহায়তায় তৈরি
এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

রস‍+আলো

জিন্নাহর দুটো মৃত্যুই করুণ হলো

জিন্নাহর প্রথম মৃত্যু হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮। অ্যাম্বুলেন্সের পেট্রল ফুরিয়ে যাওয়ায় রাস্তার ধারে তাপ আর অপেক্ষায় পড়ে থেকে। দ্বিতীয় মৃত্যুটা হলো ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬—ডাকসুর সংগ্রহশালায়। ছবি ছিঁড়ে।

প্রথমবার কেউ চেনেননি যে রাস্তার ধারে শুয়ে আছেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। দ্বিতীয়বার সবাই চিনলেন। চিনেই টেনেহিঁচড়ে নামানো হলো।

১১ আগস্ট ১৯৪৭, করাচিতে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে জিন্নাহ বলেছিলেন, মন্দিরে, মসজিদে যাওয়ার স্বাধীনতা সবার। ধর্ম রাষ্ট্রের কাজের সঙ্গে জড়িত নয়। সময়ের সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম পরিচয় রাজনৈতিক অর্থে মিলিয়ে যাবে, প্রত্যেকে প্রথমে এই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে।

সেই ভাষণ আজও জিন্নাহর সবচেয়ে উদ্ধৃত বক্তব্য। উদ্ধৃত করা হয়, পালন করা হয় না। পাকিস্তান সংবিধানও দিতে পারেনি। তিনি যে দুটো কাজ তুলে ধরেছিলেন, তার একটিও শেষ হয়নি।

তারপর ১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকায় এসে জিন্নাহ আরেক কথা বলেন। রেসকোর্স ময়দানে আর কার্জন হলে: উর্দু অ্যান্ড অনলি উর্দু উইল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান।

যে মানুষটা আগস্টে বলেছিলেন ধর্ম রাষ্ট্রের কাজের অংশ নয়, তিনিই মার্চে ভাষাকে ইসলামি সংস্কৃতির বাহন বানিয়ে দিলেন। ঢাকার ছাত্ররা সেদিনই ধিক্কার দিয়েছিল। সেই ধিক্কৃত ছবিই ডাকসুর দেয়ালে টাঙানো হয়—ইতিহাস শেখানোর নামে।

ইতিহাসের থলে থেকে বিড়াল উঁকি দিচ্ছে। এবার থলের বিড়ালটা বের করা যাক, যেহেতু টানাটানি শুরু হয়েছে।

জিন্নাহ প্রাকটিসিং মুসলিম ছিলেন না। সুট-টাই, সিগার, হুইস্কি, লন্ডনের ব্যারিস্টারি—এগুলোই তাঁর দৈনন্দিন জীবন ছিল। তাঁর নামাজ-রোজা আদায়ের খবর ইতিহাসে কম। তিনি ইসমাইলি ঘর থেকে এসে সুন্নি রাজনীতি করেছেন, কিন্তু ধর্ম তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের চেয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার বেশি ছিল।

জিন্নাহর স্ত্রী ছিলেন রতনবাই পেটিট। মুম্বাইয়ের ধনী পারসি পরিবারের মেয়ে। জরাথুষ্ট্রীয়। বিয়ের আগে ইসলাম গ্রহণ করে নাম হয় মরিয়ম, কিন্তু তিনি নিজে রুত্তিই থাকতেন। বাবার অমতে, সম্প্রদায় ত্যাগ করে ৪২ বছর বয়সী জিন্নাহকে ১৮ বছর বয়সে বিয়ে করেন। পারসি সমাজ তাঁকে ত্যাগ করে। মুসলিম আলেমদের একদল বিয়েটাকে অনৈসলামিক বলে।

মেয়ে দিনা পরে অমুসলিমকে বিয়ে করলে বাবা-মেয়ের সম্পর্ক ভেঙে যায়। দিনা তখন বাবা জিন্নাহকে মনে করিয়ে দেন, তুমি তো নিজেও পারসি মেয়েকে বিয়ে করেছিলে।

যে মানুষটা নিজে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন, যাঁর ঘর পারসি-মুসলিম মিশেলে তৈরি, যাঁর শেষযাত্রায় অ্যাম্বুলেন্সও পেট্রল পায়নি, তাঁকে এখন কেউ ইসলামের প্রতীক বানাচ্ছেন। তাঁকে নিজেদের মতো করে মারছেন।

ডাকসুর বাড়াবাড়ি তাই জিন্নাহর দ্বিতীয় মৃত্যু হয়ে দাঁড়াল।

জিন্নাহ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো আবার সেই কথাই বলতেন, ইউ আর ফ্রি টু গো টু ইয়োর টেম্পেলস, ইউ আর ফ্রি টু গো টু ইয়োর মস্কস।

জিন্নাহ দুবার মরলেন। দ্বিতীয়বার মারল কায়েমি স্বার্থবাদীরা।