প্রায় ১০ হাজার ভৌতিক ঘটনার তদন্ত করেছেন এই দম্পতি

অতিপ্রাকৃত বা ভৌতিক ঘটনা নিয়ে যে গবেষণাও সম্ভব, প্রথমবার তা প্রমাণ করেছিলেন মার্কিন এক দম্পতি। একে অপরের হাতে হাত রেখে দুজনেই আটকে গিয়েছিলেন ভৌতিক এক জগতে। সাহায্য করেছেন বহু পরিবারকে। ভালোবাসার সঙ্গে পেয়েছেন সমালোচনাও। হরর সিনেমার ভক্তরা চেনেন তাঁদের। পুরো ‘কনজুরিং ইউনিভার্স’–এর কাহিনি নেওয়া হয়েছে যাঁদের জীবন থেকে, তাঁরা হলেন বিখ্যাত প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর—এড ও লরেইন ওয়ারেন।

বিখ্যাত প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর—লরেইন (বাঁয়ে) ও এড ওয়ারেন (ডানে)
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

শৈশবে শুরু

আটলান্টিক সমুদ্রপারে ছোট্ট এক শহরতলি। জায়গাটি মার্কিন মুলুকের সবচেয়ে ছোট অঙ্গরাজ্যগুলোর একটি কানেটিকাটের সমুদ্রবন্দর এলাকা ব্রিজপোর্ট। সেখানে বাস করত ওয়ারেন পরিবার।

ক্যাথলিক পরিবারটির কর্তা ফ্র্যাংক ওয়ারেন মাইনি ছিলেন পুলিশ কর্তা আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধর্মভীরু গৃহিণী। ১৯২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তাঁদের কোলজুড়ে আসে অন্য রকম এক শিশু। ওয়ারেন দম্পতি সন্তানের নাম রাখেন এড।

শৈশব থেকেই নানা অদ্ভুতুড়ে ঘটনা দেখতে পেত এড। পাঁচ বছর বয়সী শিশুটির চোখের সামনে ভেসে উঠত অপরিচিত ছায়া। অন্য কেউ দেখতে পেত না সেসব। গভীর রাতে সে শুনত অচেনা কণ্ঠস্বরের ডাক। বাড়ির বারান্দায় প্রায়ই হাঁটতে দেখত এক নারীর ছায়ামূর্তি, মুহূর্তেই মিলিয়ে যেত সেটি।

ভয় পেয়ে মা–বাবার কাছে ছুটে যেত এড। ঘটনাগুলোকে তার মনের ভুল বলে উড়িয়ে দিতেন তাঁর বাস্তববাদী বাবা। বলতেন, ‘সবকিছুরই যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে।’ বাবার কথায় সাময়িক আশ্বাস পেলেও চোখের দেখা ও অনুভূতিকে অবিশ্বাস করার উপায় ছিল না এডের।

অন্যদিকে এডের জন্মের এক বছর পর, ১৯২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি একই শহরে বসবাসরত মোরান পরিবারে জন্ম নেয় এক মেয়ে। মোরান দম্পতি মেয়ের নাম রাখেন লরেইন রিটা মোরান।

জন্মের পর থেকেই অন্য রকম ছিল মেয়েটি। মাঝেমধ্যেই ভীষণ ভয় পেত। অদৃশ্য কিছু দেখে চেঁচিয়ে উঠত। প্রায়ই বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটার আগেই বলে দিত সে।

শহর বা শহরের বাইরে কোনো বাড়ি নিয়ে ভুতুড়ে গুজব শুনলেই লরেইনকে নিয়ে চলে যেতেন সেখানে। বাড়িগুলোর ছবি আঁকতেন এড আর লরেইন অপেক্ষা করতেন অদৃশ্য কোনো উপস্থিতির।

এসব ঘটনায় অবাক হতেন অন্যরা। সবাই ভাবত, মেয়েটির বোধ হয় দিব্যশক্তি আছে।
বিংশ শতাব্দীর মার্কিন সমাজে সাধারণ পারিবারিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত লরেইনও বুঝতেন, তিনি এমন কিছু দেখেন এবং অনুভব করেন, যা অন্যরা করে না।

ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত ঘটনার প্রতি লরেনের আগ্রহ বাড়ছিল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে খুব অল্প বয়স থেকে ধ্যান করতে শুরু করেন তিনি।

এদিকে কৈশোরে পা দেওয়ার আগে থেকেই অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করতে শুরু করেন এড। সময়ের সঙ্গে দৃঢ় হতে থাকে তাঁর বিশ্বাস। এড জানতেন, পৃথিবী আদতে তেমন সাদামাটা নয়। সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে এমন সব শক্তি লুকিয়ে আছে, যা বোঝার একমাত্র উপায় বিশ্বাস আর অনুসন্ধিৎসা।

ছবি এঁকে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার চেষ্টা করতেন এড। আশপাশের ভুতুড়ে বাড়িগুলোর ছবি আঁকতেন। ছবিগুলো বাড়ির লোকদের দেখালে অনেকেই স্বীকার করতেন, নিজেদের বাড়িতে তাঁরাও অদ্ভুত সব ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। ঘটেছে নানা ঘটনা।

প্রথম দেখা

১৯৪০–এর দশকে ব্রিজপোর্টের কলোনিয়াল থিয়েটারে খণ্ডকালীন গাইডের কাজ নিয়েছিলেন কিশোর এড। এক সন্ধ্যায় হলের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। টিকিট দেখে দর্শককে আসন দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দল বেঁধে আসা একঝাঁক কিশোর-কিশোরীর দেখা পান এড।

তাঁর চোখ আটকে যায় একটি মেয়ের ওপর। কারণটা তখনো ধরতে পারেনি এডের মন। অপরিচিত মেয়েটির কিছু একটা যেন টানছিল তাঁকে। কিছুটা সাহস সঞ্চয় করেই মেয়েটির দিকে এগিয়ে যান। নিজের পরিচয় দিয়ে মেয়েটির নাম জানতে চান এড।

হেসে ওঠে মেয়েটির বন্ধুরা। কিন্তু শান্ত স্বভাবের মেয়েটি না হেসে উত্তর দেয়—লরেইন মোরান। কথা না বাড়িয়ে লরেইনের কাছে একটি সন্ধ্যা চেয়ে বসেন এড। রাজি হয়ে যান লরেইন। শুরু হয় দুজনের প্রেম।

ব্রিজপোর্ট শহরের পথ আর অলিগলি হয়ে ওঠে এড ও লরেনের প্রেমের সাক্ষী। অকৃত্রিম আকর্ষণে একে অপরকে দ্রুতই বেঁধে ফেলেন তাঁরা। নিজেদের সঙ্গে ঘটা অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলো নিয়েও মিল খুঁজে পান দুজনে।

এরপর বিয়ে

সময় তখন অস্থির। মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন এড। এদিকে দূরত্ব যেন আরও গভীর করে তাঁদের প্রেমকে। দূরে থেকেও কাছাকাছি থাকার আকুলতায় ভরে ওঠে তাঁদের চিঠিগুলো। যুদ্ধ শেষে একসঙ্গে থাকা নিয়ে আর কোনো দ্বিধাই থাকে না দুজনের মনে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। এক বছর বাদে এড যুদ্ধ থেকে ফিরলে ১৯৪৫ সালের ২২ মে খুব অল্প বয়সেই বিয়ে করেন এড ও লরেইন। বিয়ের দ্বিতীয় বছরে জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে জুডি।

ওয়ারেনরা কী করছেন, জানতে চাইত লোকে। ১৯৮০–৯০–এর দশকে তারকা পর্যায়ে পৌঁছায় তাঁদের খ্যাতি। টেলিভিশনে প্রায়ই সাক্ষাৎকার দিতে হতো এড ও লরেইনকে।

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে একসঙ্গে

বিয়ের পর পেশা হিসেবে লোকের বাড়িতে রং করার কাজ করতেন এড। ছবি আঁকতেন খাতা আর ক্যানভাসেও। ভুতুড়ে বাড়ি আঁকার ছোটবেলার অভ্যাসটাও অটুট ছিল। শহর বা শহরের বাইরে কোনো বাড়ি নিয়ে ভুতুড়ে গুজব শুনলেই লরেইনকে নিয়ে চলে যেতেন সেখানে। বাড়িগুলোর ছবি আঁকতেন এড আর লরেইন অপেক্ষা করতেন অদৃশ্য কোনো উপস্থিতির।

ছবি আঁকা শেষ হলে বাড়ির দরজায় কড়া নেড়ে ছবিগুলো বাড়ির মালিককে উপহার দিতেন এড। তখনই শুরু হতো কথোপকথন। বাড়িতে বসবাসকারীরা ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতার কথা জানাত দুজনকে।

তাঁদের সাহায্য করতে চাইতেন ওয়ারেন দম্পতি। ব্যাপারগুলো আরও স্পষ্ট করে বোঝার জন্য অতিপ্রাকৃত এবং ভৌতিক বিষয়বস্তু নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করেন দুজন।

পড়াশোনায় কাজ হয়। আরও শক্ত হয়ে ওঠে তাঁদের অনুভূতি ও বিশ্বাস। তখনই তরুণ এই দম্পতি ডাক পেতে থাকেন অনেক বিপদগ্রস্ত পরিবারের বাড়িতে। মনোযোগ দিয়ে তাঁদের কথা শুনতেন এড ও লরেইন। টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করতেন সব কথা। খাতায় টুকে রাখতেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। ব্যবহার করতেন ক্যামেরাও।

গির্জার সঙ্গে যোগাযোগ

লরেইন ও এড ওয়ারেন

ভৌতিক ঘটনাগুলো অনুভব করতে পারলেও আক্রান্ত ব্যক্তি বা পরিবারগুলোকে সাহায্য করতে ধর্মের প্রয়োজন বোধ করতেন ওয়ারেন দম্পতি। ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন তাঁরা, নিজেরাও ছিলেন ধার্মিক।

তাঁরা বিশ্বাস করতেন, সব সত্যিকার ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা শুধু মৃত আত্মার কারণে নয়, কখনো কখনো এর পেছনে অন্য অশুভ শক্তি কাজ করে, যাকে এড বলতেন ‘ইনহিউম্যান স্পিরিট’। এ–জাতীয় শক্তি মোকাবিলায় অভিজ্ঞ ছিল ক্যাথলিক গির্জা।

তাই গির্জার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন এড ও লরেইন। তবে স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া কখনোই ‘এক্সরসিজম’ বা ভূত তাড়ানোর কাজ করত না গির্জা।

এ কারণে কোনো ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে যখনই এড–লরেইনের মনে হতো, সেটা কোনো সাধারণ আত্মা নয় বরং ‘ইনহিউম্যান স্পিরিট’ ও আক্রমণাত্মক উপস্থিতি, যা দেহ দখলের চেষ্টা করছে, তখনই তাঁরা বিস্তারিত নথিপত্র তৈরি করতেন।

আক্রান্তদের সাক্ষাৎকার ও ছবি মিলিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিবেদন বানাতেন। সেই প্রমাণ হাতে নিয়েই তাঁরা স্থানীয় গির্জার পুরোহিত বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।

কিন্তু প্রথম দিকে এড ও লরেইনকে নিয়ে বেশ সাবধান ছিল গির্জা। তবে খুব দ্রুতই গির্জার আস্থা অর্জন করেন তাঁরা। ১৯৬০–৭০-এর দশকে খ্যাতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এড ও লরেইনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে শুরু করেন দূরদূরান্তের গির্জার পুরোহিতেরা।

সে সময় ঘটনার তদন্তে তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগ দিতেন অনেক পুরোহিত। গির্জার অনুমতি নিয়ে পুরোহিতদের সাহায্যে এক্সরসিজম করতেন ওয়ারেন দম্পতি।

ভূতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা

ওয়ারেন দম্পতির ভূতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা

অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে যে গবেষণা করাও সম্ভব, প্রথমবারের মতো পুরো বিশ্বকে তা দেখিয়েছিলেন ওয়ারেন দম্পতি। ১৯৫২ সালে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘নিউ ইংল্যান্ড সোসাইটি ফর সাইকিক রিসার্চ’, সংক্ষেপে এনইএসপিআর।

স্বচক্ষে দেখা অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর তথ্য–উপাত্ত থেকে উপসংহারে পৌঁছানোর চেষ্টাই ছিল সংস্থাটির কাজ। এর মাধ্যমে নিজেদের কাজকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন এড ও লরেইন। তত দিনে একজন স্বশিক্ষিত ‘ডেমোনোলজিস্ট’ বা পিশাচতত্ত্ববিদ হয়ে উঠেছেন এড।

অ্যামিটিভিলের ঘটনা

যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের অ্যামিটিভিল শহরে একটি পুরোনো ডাচ ঔপনিবেশিক বাড়িতে থাকত ডেফো পরিবার। রোনাল্ড ডেফো সিনিয়র ও লুই ডেফোর পাঁচ সন্তান।

১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসের এক কনকনে শীতের রাতে নিজের ঘুমন্ত মা–বাবাসহ ছোট চার ভাই-বোনকে গুলি করে হত্যা করেন পরিবারটির বড় ছেলে ২৩ বছর বয়সী রোনাল্ড ডেফো জুনিয়র। আদালতে রোলান্ড দাবি করেন, কোনো এক অদৃশ্য কণ্ঠস্বর তাঁকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছিল।

এ ঘটনার এক বছর পর, ১৯৭৫ সালে খুব অল্প দামে ডেফো পরিবারের বাড়িটি কিনে নেন জর্জ ও ক্যাথি লুটজ। বাড়িতে ওঠার পরই তাঁদের সঙ্গে ঘটতে থাকে অদ্ভুত সব ঘটনা।

হঠাৎ তীব্র ঠান্ডা হয়ে যেত ঘর, বাতাসে ভেসে আসত অচেনা দুর্গন্ধ। রাতের অন্ধকারে ফিসফিস আওয়াজ শোনা যেত, দেয়ালে ভেসে উঠত অপরিচিত ছায়া। নিজে নিজেই নড়াচড়া করত দরজা ও জানালা।

প্রায়ই কোনো অদৃশ্য হাত যেন স্পর্শ করত বাড়ির সদস্যদের। ভয়ে-আতঙ্কে সাহায্যের আশায় ওয়ারেন দম্পতির কাছে হাজির হন লুটজ দম্পতি।

লরেইন তাঁর অতিপ্রাকৃত দৃষ্টি দিয়ে দেখেন, বাড়িতে একটি দানবীয় শক্তি বাস করছে। সেটি কোনো সাধারণ আত্মা নয়, বরং ভয়ানক এক অশুভ শক্তি। ছবি তুলে, সাক্ষাৎকার নিয়ে বাড়িটিতে ঘটা সব ঘটনা নথিভুক্ত করেন ওয়ারেন দম্পতি।

যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের অ্যামিটিভিল শহরের এই পুরোনো বাড়িতে থাকত ডেফো পরিবার

তারপর গির্জার সাহায্য নিয়ে এক্সরসিজম করেন। তবু সেখানকার অশুভ শক্তি পুরোপুরি দূর করতে পারেন না তাঁরা।

আর বাড়িতে পা রাখার মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে নিজেদের সব আসবাব ফেলে রেখেই চিরতরে বাড়িটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয় লুটজ পরিবার।

এ ঘটনা সাড়া ফেলে পুরো মার্কিন মুলুকে। বিস্তারিত জানতে ও জানাতে সাংবাদিকেরাও ছোটেন এড ও লরেইনের পেছনে। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে ওয়ারেন দম্পতির নাম।

‘অ্যামিটিভিল হরর’ মামলার সঙ্গে নিউ ইংল্যান্ডের ছোট ছোট বাড়ির ঘটনাগুলোও উঠে আসতে থাকে সবার সামনে। এভাবে দ্রুতই তাঁরা হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পরিচিত অতিপ্রাকৃত তদন্তকারী।

অ্যামিটিভিলের এই একটি ঘটনা নিয়ে ১৯৭৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৬০টি সিনেমা হয়েছে।

আলোচনা ও সমালোচনা

ওয়ারেনরা কী করছেন, জানতে চাইত লোকে। ১৯৮০–৯০–এর দশকে তারকা পর্যায়ে পৌঁছায় তাঁদের খ্যাতি। টেলিভিশনে প্রায়ই সাক্ষাৎকার দিতে হতো এড ও লরেইনকে।

পত্রিকায় তাঁদের নিয়ে লেখালেখিও হতো ব্যাপক। উৎসুক জনতার চোখের আড়াল হতো না ওয়ারেন দম্পতির একটি কাজও। আলোচনা ও সমালোচনা, দুটিই জুটত কপালে।

এ সময় সন্দেহপ্রবণ গবেষক জো নিকেল এবং বেনজামিন রজারফোর্ড ওয়ারেনদের কয়েকটি বিখ্যাত কেস পরীক্ষা করে দেখেন, বেশ কয়েকটি অতিপ্রাকৃত ঘটনার শক্ত কোনো প্রমাণ পান না তাঁরা।

কিন্তু যাঁরা ওয়ারেনদের সাহায্য নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই মানসিক স্বস্তি, সমাধান বা শান্তি পাওয়ার দাবি করেছিলেন। অনেক পরিবারের বিশ্বাস, ওয়ারেনদের উপস্থিতি ভয় কমাতে ও পরিস্থিতি বোঝার জন্য সহায়ক ছিল।

অ্যানাবেল পুতুল

আসল অ্যানাবেল পুতুলটি নিজেদের সংগ্রহে নেওয়ার পর লরেইন ওয়ারেন

গাল জোড়া হাসিমাখা ছোট্ট একটা পুতুল। একেবারেই নিরীহ, তাই তো? মোটেও না! ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭০–এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাটের একটি ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাসরত নার্সিং পড়ুয়া দুই তরুণীর সঙ্গে। একা একাই জায়গা বদল করত পুতুলটি। বাসার ভেতর ছোট ছোট ছেঁড়া কাগজে লেখা থাকত, ‘সাহায্য করো।’

পুতুলের ভেতর কোনো ছোট শিশুর আত্মা আছে ভেবে বিষয়টিকে সহজভাবেই নেন ওই দুই তরুণী। পুতুলটির নাম রাখেন অ্যানাবেল। দাবি করেন, পুতুল নিজেই নিজের নাম কাগজে লিখে দিয়েছে।

একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে পুতুলটিকে পায়ের কাছে আবিষ্কার করেন তরুণীদের একজন। সে সময় হঠাৎ বুকে ব্যথা করতে থাকে তাঁর। খেয়াল করেন, বুকে আঁচড়ের গভীর ক্ষত।

সিনেমার অ্যানাবেল পুতুলের তুলনায় বাস্তবের এই অ্যানাবেল দেখতে অতটা ভয়ংকর নয়

ভয়ে আতঙ্কে ওই তরুণী ও তাঁর বন্ধু সাহায্য চান এড ও লরেইনের কাছে। পুতুলটি যে সাধারণ শিশুর আত্মার দখলে নেই, তা স্পষ্ট জানিয়ে দেন লরেইন। দানবীয় এক শক্তি নিজেকে নিরীহ দেখানোর ছদ্মবেশ ধরেছিল।

এড ও লরেইন সতর্কভাবে পুতুলটি সংগ্রহ করে তাঁদের বাড়ি নিয়ে যান। আটকে রাখেন তালাবদ্ধ কাচের বাক্সে। বাক্সের ওপর স্পষ্ট করে লিখে দেন, ‘ডু নট ওপেন!’ পুতুলটির ওপর ভীষণ বিরক্ত লরেইন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুতুলটির দিকে তাকাতেও চান না তিনি।

২০১৩ সালে ‘কনজুরিং ইউনিভার্স’–এর প্রথম সিনেমা ‘দ্য কনজুরিং’–এ প্রথমবারের মতো দেখা যায় অ্যানাবেল পুতুলটিকে। তবে পুতুলটির পুরো গল্প উঠে আসে পরের বছর প্রকাশিত ‘অ্যানাবেল’ সিনেমায়। শুধু অ্যানাবেলকে নিয়েই বানানো হয়েছে ৩টি সিনেমা।

কনজুরিং ইউনিভার্স

‘দ্য কনজুরিং’ সিনেমার একটি দৃশ্য

জীবদ্দশায় প্রায় ১০ হাজারের বেশি অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে কাজ করেছেন ওয়ারেন দম্পতি। সেখান থেকে আলোচিত কয়েকটি ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেয় ‘নিউ লাইন সিনেমা’ ও ‘ওয়ারনার ব্রাদার্স পিকচার্স’।

যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের পেরন পরিবারের ঘটনা নিয়ে বানানো হয় প্রথম সিনেমা ‘দ্য কনজুরিং’। পরের বছরের সিনেমায় উঠে আসে অ্যানাবেল পুতুলের গল্প।

২০১৬ সালে আসে তৃতীয় কিস্তি ‘দ্য কনজুরিং ২’। ১৯৭৭ সালে ঘটা ‘এনফিল্ড পোল্টারজিস্ট কেস’ নামে পরিচিত ঘটনাটি থেকে নির্মিত সিনেমাটিতে এক মা ও তাঁর চার সন্তানের ভৌতিক অভিজ্ঞতা দেখানো হয়। সিনেমায় ভ্যালেক নামের একটি ভয়ানক দানবীয় শক্তির মোকাবিলা করেন ওয়ারেন দম্পতি।

অ্যানাবেল পুতুলের গল্প নিয়ে দ্বিতীয় সিনেমা ‘অ্যানাবেল: ক্রিয়েশান’ মুক্তি পায় ২০১৭ সালে। দেখানো হয় পুতুলটির ভৌতিক হয়ে ওঠার ইতিহাস। পরের বছর ভ্যালেক দানবের গল্প নিয়ে মুক্তি পায় ‘দ্য নান’।

১৯৭০-এর দশকের লস অ্যাঞ্জেলেসে শিশুদের শিকার করা এক আত্মার গল্প নিয়ে ২০১৯ সালে মুক্তি পায় ইউনিভার্সের ষষ্ঠ সিনেমা ‘দ্য কার্স অব লা লোরোনা’।

‘অ্যানাবেল কামস হোম’ সিনেমার একটি দৃশ্য

একই বছর মুক্তি পায় অ্যানাবেল পুতুলের শেষ সিনেমা ‘অ্যানাবেল কামস হোম’। সিনেমায় ওয়ারেনকন্যা জুডির ক্ষতি করার চেষ্টা করতে দেখা যায় পুতুলটিকে।

৮ নম্বর সিনেমায় দেখানো হয় মার্কিন আদালতের ইতিহাসের কুখ্যাত একটি ঘটনা। ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকফিল্ডের বাসিন্দা আরনি জনসন হত্যা করে বসেন তাঁর বাড়িওয়ালাকে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আদালতে ‘ভূতে ধরা’কে আত্মরক্ষার আইনগত যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আরনির পক্ষে ছিলেন ওয়ারেন দম্পতি। তবে শেষমেশ আরনির শাস্তি হয়েছিল কি না, জানতে হলে দেখতে হবে ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দ্য ডেভিল মেড মি ডু ইট’। দুই বছর পর ভ্যালেক দানবের অতীত ইতিহাস নিয়ে মুক্তি পায় ‘দ্য নান টু’।

২০২৫ সালে মুক্তি পেয়েছে সর্বশেষ এবং ১০ নম্বর সিনেমা ‘কনজুরিং: দ্য লাস্ট রাইটস’। একটি অভিশপ্ত আয়না আর স্মারল পরিবারের ভৌতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওয়ারেন পরিবারের যুক্ত হওয়ার কাহিনি নিয়ে বানানো হয়েছে সিনেমাটি।

অনেকেই বলছেন, এটি এই ইউনিভার্সের শেষ সিনেমা। তবে ওয়ারেনদের পুরোনো অন্য কোনো কাহিনি নিয়ে নতুন আর কোনো সিনেমা আসবে কি না, এ ব্যাপারে এখনো মুখ খোলেননি নির্মাতারা।

অলৌকিক জাদুঘর

ভৌতিক ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে অভিশপ্ত বা ভূতে পাওয়া বস্তু সংগ্রহ করতেন ওয়ারেন দম্পতি

ভৌতিক ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে অভিশপ্ত বা ভূতে পাওয়া বস্তু সংগ্রহ করতেন ওয়ারেন দম্পতি। মন্ত্র পাঠ ও শুদ্ধীকরণ শেষে কানেটিকাটের মনরোয় নিজেদের পারিবারিক বাড়ির বেজমেন্টে আটকে রাখতেন সেসব।

এভাবেই গড়ে ওঠে তাঁদের ‘অকাল্ট মিউজিয়াম’ বা অলৌকিক জাদুঘর। এড নিজেই ঘরটির দেখভাল করতেন। কেউ চাইলে ঘুরেও দেখাতেন। তবে জাদুঘরের দরজা খুলেই সবাইকে সাবধান করে বলতেন, ‘এখানকার কোনো কিছুই খেলনা নয়। কিছু স্পর্শ করবেন না।’

২০০৬ সালের ২৩ আগস্ট এডের মৃত্যুর পর জাদুঘরটি দেখাশোনা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে লরেইনের জন্য। তারপরও মেয়ে জুডি এবং মেয়েজামাই টোনি স্পেরার সাহায্যে সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন।

কিন্তু ২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল ইহলোক ত্যাগ করেন লরেইন। আর নিরাপত্তাজনিত কারণে সে বছরই বন্ধ করে দেওয়া হয় ওয়ারেনদের অলৌকিক জাদুঘরটি।

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে জুডি ও টোনির কাছ থেকে ওয়ারেনের বাড়ি এবং জাদুঘর কিনে নিয়েছেন মার্কিন কমেডিয়ান ও অভিনেতা ম্যাট রাইফ ও ইউটিউব ব্যক্তিত্ব এলটন কাস্টি।

তাঁরা জানিয়েছেন, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়িতে থাকা সব নিদর্শনের আইনি অভিভাবক তাঁরা। জাদুঘরটি আবার খোলা হবে এবং আগ্রহীরা বাড়িটিতে রাতও কাটাতে পারবেন।

সূত্র: ফ্যানডম, অল দ্যাটস ইন্টারেস্টিং, ইউএস গোস্ট অ্যাডভেনচার, কানেটিকাট পোস্ট, রেডইট