রুফটপ রেস্তোরাঁয় বিয়ের আয়োজনে যেসব সুবিধা মিলবে

চার দেয়ালে বন্দী কমিউনিটি সেন্টারের বদলে এখন শহরের রুফটপ রেস্তোরাঁয় বিয়ের আয়োজনই ট্রেন্ডি। বিশেষ করে ঢাকা শহরে বিষয়টি বেশি চোখে পড়ছে। খোলা আকাশের নিচে, ছাদ থেকে চোখে পড়ে ঢাকা শহরের বিস্তৃত দৃশ্যপট—এই আবহকে সঙ্গী করে ছাদের রেস্তোরাঁ বিয়ের আমেজে সাজছে। গায়েহলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে ও রিসেপশন—সব আয়োজনই হচ্ছে সেখানে। বিয়ের আয়োজন হয়, তেমন কিছু রুফটপ রেস্টুরেন্টের খোঁজ থাকছে এই লেখায়।

স্কাই লাউঞ্জে ভেন্যু চার্জ লাগবে না
ছবি: স্কাই লাউঞ্জের সৌজন্যে

স্কাই লাউঞ্জ

মিরপুর–১ নম্বরের সনি স্কয়ার ভবনের চূড়ায় স্কাই লাউঞ্জ। গায়েহলুদ থেকে বিয়ে—সব ধরনের আয়োজন হয় এখানে। অবস্থান ‘আকাশমুখী’ হলেও জমিনের মতো গাছগাছালির সবুজে ঘেরা প্রতিটা অংশ। আছে স্থাপত্য নকশায় গড়া পাহাড়–পর্বতের দৃশ্য। জাহাজের আদলে গড়া বিয়ের মঞ্চ। অতিথি ধারণক্ষমতা এখানে ২০০ থেকে ২৫০ জন। পার্টি মেনু থেকে বেছে নেওয়া খাবারের খরচ পড়বে জনপ্রতি ৭৭০ থেকে ১ হাজার ১২০ টাকা। সাধারণত ভেন্যু চার্জ লাগে না।

শুধু শুক্রবার বা বিশেষ ছুটির দিনে ৫ হাজার টাকার মতো চার্জ যোগ হতে পারে। ডেকোরেশনের চার্জ নির্ভর করবে বিয়ের আয়োজকদের চাহিদা অনুযায়ী। স্কাই লাউঞ্জের সহকারী পরিচালক সাদ বিন সিরাজ জানান, দিনে দুটি আলাদা স্লটে বিয়ের আয়োজন হয়ে থাকে এখানে। দুপুরের খাবারকে প্রাধান্য দিয়ে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত, আর রাতের খাবারকে প্রাধান্য দিয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিয়েবাড়ির আয়োজন করার সুযোগ আছে এখানে।

লেক গ্রিন লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট

আফতাবনগরের সিরাজ কনভেনশন সেন্টারের ছাদে লেক গ্রিন লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। ছাদ বলতে শুধু একটি ছাদই নয়, এখানে ছাদের নিচেও আছে পরপর চারটি ফ্লোর। সব মিলে ধারণক্ষমতা ৩৫০ থেকে ৪০০ জন। ছাদের প্রথম ফ্লোরের ভেন্যু চার্জ এখানে ৩০ হাজার টাকা। গায়েহলুদ থেকে রিসেপশন—বিয়ের বেশির ভাগ আয়োজনই হয়ে থাকে এখানে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানজিলা রাখি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিম আছে। ফলে নিশ্চিন্তে আপনার আয়োজনের সবটাই সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। খাবারের ক্ষেত্রে পার্টি মেনুতে থাকা লিস্ট অনুযায়ী জনপ্রতি খাবার খরচ শুরু ৯৬০ টাকা থেকে।’

গায়েহলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে ও রিসেপশন—সব আয়োজনই হচ্ছে ছাদে

বার্ডস আই রুফটপ রেস্টুরেন্ট

ঢাকার পুরানা পল্টনে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট–সংলগ্ন বায়তুল ভিউ টাওয়ারের ছাদে অবস্থিত বার্ডস আই রুফটপ রেস্টুরেন্ট। রেস্তোরাঁর ইনচার্জ জুয়েল খান জানান, ৩০০-৫০০ জনকে নিয়ে বিয়ের আয়োজন করার সুযোগ আছে এখানে। ছাদসহ আরও দুটি ফ্লোরজুড়েও আয়োজন করা যায়। ২০০ জন বা তার কম হলে ছাদের একটি ফ্লোরই যথেষ্ট। অতিথিসংখ্যা ও খাবারের মেনুর ওপর ভিত্তি করে ভেন্যু চার্জ ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা হতে পারে।

এখানে খাবারের খরচ জনপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কাচ্চিসহ দেশি, ইন্ডিয়ান, থাই ও চায়নিজ খাবারের ব্যবস্থা আছে। উচ্চ মূল্যের খাবার অর্ডার করলে অনেক সময় জায়গার আলাদা ভাড়া দেওয়া লাগে না। আর সাজসজ্জায় খরচ পড়ে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা।

স্কাই রেস্টুরেন্ট

ফার্মগেটের বাবুল টাওয়ারের ছাদে অবস্থিত স্কাই রেস্টুরেন্ট। ছাদ থেকে দেখা যায় মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ব্যস্ত ফার্মগেট মোড়, আনোয়ারা উদ্যান, দূরের জাতীয় সংসদ ভবন, নভোথিয়েটার ও তেজগাঁও পুরোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে। কৃত্রিম সবুজ ঘাসে ছাওয়া তিন স্তরের ছাদজুড়ে বসার ব্যবস্থা। রঙিন বৈদ্যুতিক বাতির সঙ্গে হারিকেনের মৃদু আলো, ফুল–পাতায় সাজানো প্রতিটি অংশ। বিয়ের আয়োজনে তাই বাড়তি সজ্জার প্রয়োজন কমিয়ে দিতে পারে।

স্কাই রেস্টুরেন্টের পরিচালক হ্যাপি মেরিয়ান বলেন, ‘ছোট পরিসরে ৫০ থেকে ১০০ জন অতিথি নিয়ে বিয়ের আয়োজন করতে চাইলে আমাদের এই জায়গাটি আদর্শ। এখানে আলাদা জায়গার ভাড়া নেই। শুধু পছন্দমতো সাজিয়ে নেওয়া আর খাবারের মেনুতেই যা খরচা। সে ক্ষেত্রে জনপ্রতি খাবার খরচ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আছে নির্দিষ্ট খাবারের সমন্বয়ে মেনু নির্বাচনের সুযোগ, সে ক্ষেত্রে জনপ্রতি খাবার খরচ আরও কমিয়ে আনা সম্ভব।’

অনেক রেস্টুরেন্টে খাবারের মেনু আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যায়

নন্দিনী রুফটপ রেস্টুরেন্ট

ছাদবাগানের সবুজকে সঙ্গী করে বিয়ের আয়োজন বসে শুক্রাবাদের নন্দিনী রুফটপ রেস্টুরেন্টে। অতিথি ধারণক্ষমতা এখানে ৮০ জনের। খাবার খরচ জনপ্রতি ১ হাজার টাকায় শুরু। ভেন্যুর ভাড়া ২৫ হাজার টাকা। তবে সম্পূর্ণ ৮০ জনের জন্য বুকিং দিলে এবং জনপ্রতি খাবার খরচ কমপক্ষে ১ হাজার টাকা নিশ্চিত করলে ভেন্যু ভাড়ায় আলাদা টাকা লাগবে না। খাবারের মেনু আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যাবে।

ইম্পেটাস লাউঞ্জ

তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে নিনাকাব্য ভবনের বিপরীতে এর অবস্থান। ইম্পেটাস লাউঞ্জের অতিথি ধারণক্ষমতা ১৮০ থেকে ২২০ জন। ইম্পেটাস লাউঞ্জের পরিচালক সাইদ আহমেদ জানান, ১৮০ জনের জন্য প্রিমিয়াম ও ২২০ জনের জন্য হয় পার্টির আয়োজন। প্রতিদিন দুটি স্লটে দুটি বিয়ের আয়োজন সম্ভব এখানে।

দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। এখানে খাবার খরচ জনপ্রতি ১ হাজার ৪৫০ টাকায় শুরু। ভেন্যুর ভাড়া ও বুকিং চার্জ নেই। আছে বাজেট অনুযায়ী বিয়েবাড়ি সাজানোর সব রকম ব্যবস্থা।

রেইনি রুফ রেস্টুরেন্ট

গায়েহলুদ থেকে বিয়ে—সব আয়োজনই হয় কারওয়ান বাজারের বিটিএমসি ভবনের ছাদে থাকা রেইনি রুফ রেস্টুরেন্টে। নিয়মিত অতিথি ধারণক্ষমতা ৩০০ জন, প্রয়োজনে ৩৫০ জন পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ আছে। রেস্তোরাঁটি দুটি অংশে বিভক্ত। এসি কাভার্ড এরিয়া ও গার্ডেন এরিয়া। এসি কাভার্ড এরিয়ায় সর্বোচ্চ ১৫০ জন বসতে পারেন, গার্ডেন এরিয়ায় বসতে হবে বাকি ১৫০ জনকে।

খাবার মেনুর মধ্যে থাই, চায়নিজ, কন্টিনেন্টাল, ইন্ডিয়ান, দেশি বাংলা খাবারসহ ১০ রকমের মেনু আছে বিভিন্ন রকম প্রোগ্রামের জন্য। এ ছাড়া যে কেউ প্রোগ্রামের মেনু পছন্দমতো সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

ভেন্যুর ভাড়া এখানে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে ওঠানামা করে। ডেকোরেশন খরচ নির্ভর করে চাহিদামতো। রেইনি রুফ রেস্টুরেন্টে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজারের মধ্যে বিভিন্ন রকমের ডেকোরেশন প্যাকেজ রয়েছে, চাইলে এখান থেকেও বেছে নিতে পারবেন।

জনপ্রিয় হচ্ছে শহরের রুফটপ রেস্তোরাঁয় বিয়ের আয়োজন

পশ লাউঞ্জ রুফটপ 

বিয়ে আপনার, আয়োজনের দায়িত্ব আমাদের’—এ স্লোগানে বিয়েবাড়ির পূর্ণাঙ্গ আয়োজন নিয়ে মিরপুরবাসীর পাশে আছে পশ লাউঞ্জ রুফটপ। মিরপুর–১২ পল্লবী মেট্রোস্টেশনের পাশে সাফুরা টাওয়ারে এর অবস্থান। এখানে কোনো ভেন্যু চার্জ নেই। আইটেম অনুযায়ী খাবারের খরচ পড়বে জনপ্রতি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। সাজসজ্জা আয়োজকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করতে হবে। বেলা ১টা থেকে বিকেল ৫টা এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা—এই দুই সময়ে ভাড়া নেওয়া যাবে।

দ্য ইটালিয়া

মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানা রোডে অবস্থিত দ্য ইটালিয়া রুফটপ রেস্টুরেন্টে ৮০ থেকে ১২০ জন অতিথি নিয়ে বিয়ের আয়োজন করা যায়। প্রতিষ্ঠানটির ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের অর্ণব হাসান উৎসর তথ্যমতে, এখানেও খাবারের বাইরে আলাদা কোনো ভেন্যু চার্জ দিতে হয় না। খাবারের ক্ষেত্রে জনপ্রতি খরচ হতে পারে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। ডেকোরেশনের চার্জ নির্ধারিত হয় আয়োজকদের চাহিদামতো।

(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন ‘বর্ণিল বিয়ে’ জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)