সবজি বিক্রেতা শেখ মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বিরামপুরের অনেকের কাছে স্রেফ ‘কবি মোস্তফা’। গান আর কবিতা লিখেই তাঁর এই পরিচয়। আর এই লেখাজোখার পেছনে আছে তাঁর এক বিচ্ছেদের গল্প। মোস্তফার কাছে সেই গল্পই শুনলেন নূরে আলম সিদ্দিকী

খোলা আকাশের নিচে একটি প্লাস্টিকের বস্তার ওপর বসে সবজি বিক্রি করছিলেন শেখ মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। আরেক বস্তার ওপর ঢিবি করে সাজানো আলু, বেগুন, পটোল, পেঁপে, কাঁচা মরিচসহ বিভিন্ন সবজি। ক্রেতাদের ব্যাগে সবজি তুলে দিতে দিতে খোশগল্প করছিলেন তিনি। আবার কখনো গুন গুন করে গাইছেন গান। ছন্দে ছন্দে সবজির দাম ও গুণ বলে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণও করছেন। উচ্চ স্বরে মোস্তফাকে বলতে শোনা গেল, ‘আলু ৩০০ টাকা ধাড়া (৫ কেজি), না নিলে ওই দিকে গিয়ে গায়ে মারো ঝাড়া’, ‘বড়-ছোট একই দাম, খাইলে পরে করবেন নাম’, ‘মঙ্গা জিনিস খাবেন অল্প, বেয়াইনের পাশে বসে করবেন গল্প’, ‘যত দিন যাননি মরে, বেঁচে থাকলে কিছু না কিছু খাবার লাগবে ঘরে।’
সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত সবজি বিক্রি করেন মোস্তফা। সকালের শুরুর দিকে তাঁর দোকান থেকে পাইকারি ক্রেতারা সবজি কেনেন। আর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় খুচরা ক্রেতাদের আনাগোনা। শনি ও মঙ্গলবার দিনাজপুরের বিরামপুর শহরের এই পুরাতন বাজারের খোলা চত্বরে সবজি বিক্রি করেন। অন্য দিনগুলোয় চলে যান নতুনবাজার। আর অবসর পেলেই লিখে ফেলেন গান বা কবিতা।
তাঁর এই লেখালেখি নিয়েই আগের দিন, ২৩ নভেম্বর আলাপ। সেদিন মোস্তফার বাড়ি গিয়ে গান ও কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখে এসেছি। একটি পুরোনো খাতায় ১০৮টি গান লিখেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন পাতায় ও খাতায় দেখেছি তাঁর লেখা অনেক কবিতা ও গান। সেই সূত্র ধরেই আজ তাঁর দোকানে এসেছি।
সবজি বেচাবিক্রির ফাঁকে ফাঁকে কবি মোস্তফার সঙ্গে গল্প জমল। তিনি দাবি করলেন, হাজারেরও বেশি বিচ্ছেদের গান ও কবিতা লিখেছেন। আর এই লেখালিখির পেছনে আছে এক বিচ্ছেদের গল্প।
যে বিচ্ছেদ কবি বানিয়েছে
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় সহপাঠী এক মেয়েকে মোস্তফার ভালো লেগে যায়। মাধ্যমিকে এসে মেয়েটির সঙ্গে তাঁর মন দেওয়া-নেওয়া হয়। সব বেশ ভালোই চলছিল। ১৯৮৬ সালে বিরামপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন মোস্তফা। এসএসসি পাসের পর দুজনের সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ান মোস্তফার বাবা। দুজনের পথ আলাদা হয়ে যায়। বিরহকাতর হয়ে পড়েন মোস্তফা। এর মধ্যে ১৯৮৯ সালে বিরামপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হন। এরপর জোর করে নিজের পছন্দের মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেন তাঁর বাবা। বিয়ের পর পড়াশোনাও আর এগোয়নি। বিচ্ছেদ ভুলে থাকতে গান ও কবিতা লেখা শুরু করেন মোস্তফা, ‘মনের মানুষকে না পাওয়ায় মনের মধ্যে অনেক কথা জমে ছিল। জমে থাকা সেই কষ্ট কবিতা ও গানের মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।’ সেই শুরু।
জীবন এগিয়ে চলে
বাউন্ডুলে জীবনে কখনো গায়ক হওয়ার চেষ্টা করেছেন, কখনো অভিনেতা। এ জন্য ঢাকায় এসে অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। একবার গান রেকর্ডিংয়ের কথাও পাকা হয়েছিল। কিন্তু খরচ হিসেবে দেড় লাখ টাকা জোগাড় করতে না পারায় সেই স্বপ্নের মৃত্যু হয়। ফিরে আসেন গ্রামের বাড়ি বিরামপুরের পলিপ্রয়াগপুর ইউনিয়নের চকবসন্তে। মনোযোগ দেন সংসারজীবনে।
২০১০ সালে স্থানীয় বাজারে শুরু করেন মুরগির ব্যবসা। সুবিধা করতে না পারায় এ ব্যবসা ছেড়ে দেন। ২০১৪ সালে অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেন সবজির ব্যবসা। সেই ব্যবসা এখনো চলছে। এখন থাকেন বিরামপুর পৌর শহরের কৃষ্টচাঁদপুর মহল্লায় নিজ বাড়িতে।
মোস্তফার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সংসার। প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হয়। ব্যবসার আয় ও সামান্য আবাদি জমির ফসল থেকে যা আসে, তা দিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালোই আছেন মোস্তফা।
গল্প গল্পে জানালেন, তাঁর লেখা ৩৫টি কবিতা স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ ‘শূন্যতা থেকে পূর্ণতা’ নামে একটি ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা ‘বাবা’ শিরোনামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়।
মোস্তফার স্বপ্ন, একদিন তাঁর লেখা কবিতা দেশের প্রথম সারির পত্রিকায় প্রকাশিত হবে, নিজের লেখা গান গাইবেন কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে।