জরায়ুমুখ ক্যানসার সচেতনতা মাস

তিনবার ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়ে শিলা এখন কেমন আছেন

চার ভাইয়ের একমাত্র বোন। মা-বাবা আর ভাইয়েদের আদরে-আহ্লাদে গাজীপুরের একটা গ্রামে বেড়ে উঠেছেন শিলা রেজিনা গোমেজ। উচ্চমাধ্যমিক পড়তে ঢাকায় আসেন। বিয়ের পর আবিষ্কার করেন জীবনের অন্য এক রূপ। দীর্ঘ এক লড়াই শেষে যখন স্বপ্ন দেখছিলেন সব দুঃখ-দুর্দশা কাটিয়ে উঠবেন, তখনই ধরা পড়ে ক্যানসার। তা–ও একবার নয়, তিনবার। তাঁর জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন রাফিয়া আলম

শিলা রেজিনা গোমেজ
ছবি: কবির হোসেন

মা-বাবা চেয়েছিলেন, একমাত্র মেয়ে অনেক দূর অবধি পড়ালেখা করবে। তবে শিলার ইচ্ছায় পড়াশোনার মাঝপথেই তাঁর বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন তাঁরা। ১৯৯৩ সালে বিয়ে করেন শিলা। বিয়ের পর জানতে পারলেন, স্বামী নেশায় আসক্ত।

ওই সংসারে তাঁর জন্য ভালোবাসা নেই। স্বামীর সংসার ছেড়ে তাঁদের কাছে চলে আসতে বলেছিলেন তাঁর মা–বাবা। শিলা রাজি হননি। ভালোবাসা আর শ্রম দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন সংসার। নিজ উদ্যোগে পড়ালেখাও করেন আরও কিছু দূর। নিজেই রোজগারের ব্যবস্থা করেন।

কখনো প্রশিকার স্কুলে শিক্ষকতা করেন। কখনো অন্যত্র জোগাড় করেন বাবুর্চির কাজ। এই লড়াইয়ের মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁর দুই ছেলে। ২০০০ সালের পর থেকে স্বামীও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০১৭ সালে তাঁর স্ট্রোক করে। অসুস্থ মানুষটার সব দায়িত্বও শিলার ওপর এসে পড়ে।

ছোট্ট একটা ঘরে নিদারুণ কষ্টে পরিবার নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন শিলা। তারপরও আশা ছিল। ছেলেরা বড় হচ্ছে, শিলা ভেবেছিলেন, শিগগিরই পরিবারের দুঃখ ঘুচবে। সেই স্বপ্নের মধ্যে দুঃস্বপ্ন হয়ে এল ক্যানসার।

নতুন চ্যালেঞ্জ

২০১৯ সালের কথা। শিলার বয়স তখন ৪৭ বছর। অনেক দিন ধরেই স্বাভাবিকভাবে বসতে পারতেন না শিলা। তবে অভাব–অনটনের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। মাসিকও স্বাভাবিক নিয়মে হচ্ছিল না। তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ। তলপেটেও ব্যথা। অনেকেই বললেন, এটা এই বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন। তবে চিকিৎসকের কাছে যখন গেলেন, তখন কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হলো।

আসাদ গেটে, পিমে মিশনারিজে তিনি তখন বাবুর্চির কাজ করেন। তাদেরই সহায়তায় (বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) নিয়ে যাওয়া হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল, জরায়ুমুখের ক্যানসারে ভুগছেন শিলা। অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে ক্যানসার। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল, সম্ভব হলে পরদিন থেকেই যেন ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু করা হয়।

আশা-নিরাশার জীবন

শিলাকে শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতারের কাছে নিয়ে গেল পিমে মিশনারিজ। সদা হাস্যোজ্জ্বল এই চিকিৎসক শিলাকে সাহস জোগালেন। কাছের বন্ধু মতো ক্যানসার নিয়ে আলাপ করতেন তিনি। সেখানেই সপ্তাহে একটা করে কেমোথেরাপি দেওয়া হলো।

একই সময়ে সপ্তাহে পাঁচটি করে রেডিওথেরাপি দেওয়া হলো মিরপুরের ডেলটা হাসপাতাল লিমিটেডে। শেষে আরও দেওয়া হলো তিনটি ব্র্যাকিথেরাপি (বিশেষ ধরনের রেডিওথেরাপি)। আশা করা হয়েছিল আর ফিরবে না এই জীবনঘাতী ব্যাধি।

কিন্তু পরের বছর ফিরে এল ক্যানসার। আবার চিকিৎসা নিতে হলো। সেই সময়টা ছিল সবচেয়ে কঠিন। বললেন, ‘করোনা অতিমারির সময়ে সবাই যখন সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্কিত, আমি তখন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়ছি। তখন অনেক রক্তক্ষরণ হতো। মনে হতো মরে যাব। তবে কাউকেই বলিনি। মনোবল ধরে রেখেছি শেষ পর্যন্ত। প্রার্থনা করেছি।’

সেবারের কেমোথেরাপিগুলোর পর মাঝেমধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। তখন কেমোথেরাপির পর সপ্তাহখানেক বিশ্রাম নিতে হতো। সেই সময় ডায়াবেটিসও ধরা পড়ে। অসুস্থ অবস্থায় বাবুর্চি হিসেবে রোজকার দায়িত্ব পালন করা কঠিন। তবে চাকরি যায়নি। দায়িত্বটা শুধু বদলে দেওয়া হলো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রান্নার কাজে সহযোগিতার দায়িত্ব।

আবার ক্যানসার

তিন দফায় সব মিলিয়ে তাঁকে ৪৩ ধাপে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে হয়েছে শিলাকে

২০২২ সালে আবারও ক্যানসার ফিরে এল। আবারও নিতে হলো চিকিৎসা। তিন দফায় সব মিলিয়ে তাঁকে ৪৩ ধাপে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে হয়েছে। রক্তও নিতে হয়েছে কয়েকবার। চিকিৎসার খরচ জোগানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য শিলার ছিল না।

ভাইয়েদেরও আর্থিক সহায়তা করার মতো অবস্থা ছিল না। তবে ভাইসহ আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুরা দূরদূরান্ত থেকেও তাঁকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন সব সময়। করোনা অতিমারির সময়েও পাশে ছিলেন প্রতিবেশীরা। ক্যানসার ফিরে আসায় দূরসম্পর্কের আত্মীয়রা অবশ্য খারাপ কথা বলতেও ছাড়েননি।

শিলাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে পিমে মিশনারিজ। ২০২০ সালে থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশনে শিলার নিয়মিত ফলোআপের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তাঁরা। পিমে মিশনারিজের জন্য আমৃত্যু কাজ করে যেতে চান তিনি।

শিলা এখন সুস্থ। বলছিলেন, ‘বিয়ের পর থেকে রোজ ডায়েরিতে লিখে রাখতে চেষ্টা করতাম নিজের কথা। অসুস্থ অবস্থাতেও সেই চেষ্টা ছিল। সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এত মানুষ যে আমাকে ভালোবাসেন, ক্যানসার না হলে হয়তো জানতেও পারতাম না।’