মাসের বেতন এসেছে। সঞ্চয়ও আছে। কিছু টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। হয়তো নিজের বাড়ি, গাড়ি সবই আছে। তারপরও মাঝরাতে হঠাৎ মনে হলো, ‘চাকরিটা যদি চলে যায়?’ কিংবা ‘সব সঞ্চয় যদি কোনো এক বিপদে শেষ হয়ে যায়?’ এমনকি কখনো কখনো মাথায় আসে, ‘একদিন যদি সত্যিই আমার কিছুই না থাকে?’ কেন এমন হয়?

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই ভয়টা সব সময় ব্যাংক ব্যালান্স দেখে আসে না। বরং ব্যালান্স যতই ভালো হোক, মাথার ভেতরের হিসাবরক্ষক যেন বলতেই থাকে, আরও একটু জমাও। কে জানে কী হয়! এই ভয়কেই বলা হয় ‘ব্যাগ লেডি সিনড্রোম’।
একজন নারী, নিজের সব সম্বল কয়েকটি শপিং ব্যাগে নিয়ে রাস্তায় ঘুরছেন—নামটি এসেছে ১৯৭০ দশকের পুরোনো এমনই একটি দৃশ্য থেকে। ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ভয় বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এটি কোনো রোগের নাম নয়। তবে ভয়টি বাস্তব। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার এই প্রবণতাকে অনেক সময় ‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাংজাইটি’ও বলা হয়ে থাকে।
নামটি পুরোনো হলেও সমস্যাটি মোটেও পুরোনো নয়। বরং এখনকার নারীদের জীবনেই এর অন্য রকম প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। পুরো বিশ্বেই নারীরা এখন আয় করছেন, বিনিয়োগ করছেন, নিজেদের সম্পদ তৈরি করছেন। তবু বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ, চাকরির অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ১১৪টি দেশের ৯৬ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরুষদের তুলনায় নারীদের আর্থিক উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপেও উঠে এসেছে, হঠাৎ বড় খরচ, পণ্যের দাম বাড়া কিংবা অবসরের পর পর্যাপ্ত টাকা থাকবে কি না, এসব নিয়ে নারীরা বেশি চিন্তিত। অর্থাৎ টাকা কম থাকার ভয় আর টাকা হারানোর ভয় এক জিনিস নয়।
নারীদের এই আর্থিক উদ্বেগকে ‘বেশি চিন্তা করার অভ্যাস’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সন্তান বা পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনার জন্য কর্মজীবনে বিরতি নিলে আয়, সঞ্চয় ও অবসরকালীন সঞ্চয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
নারীরা সাধারণত বেশি দিন বাঁচেন, ফলে তাঁদের সঞ্চয়ও দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রয়োজন হতে পারে। তার ওপর অনেক দেশেই কাজ বেশি করলেও পুরুষদের চেয়ে নারীদের বেতন কম। আবার টাকার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সম্পর্কও গভীর।
ছোটবেলায় পরিবারে অর্থকষ্ট দেখে থাকলে, চাকরি হারানো বা বিবাহবিচ্ছেদের পর কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে কিংবা কেউ যদি ‘নিজের টাকা না থাকলে বিপদে পড়তে হবে’—এই কথা শুনে শুনে বড় হন, তাহলে সঞ্চয় শুধু ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমিয়ে রাখা থাকে না। হয়ে যায় নিজের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।
তাই হাতে যথেষ্ট টাকা থাকলেও মনে হতে থাকে, ‘আরও একটু থাকলে ভালো হতো।’ এই ‘আরও একটু’ কখনো শেষ হয় না।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বর্তমান জীবনটাই আটকে যায়। জরুরি তহবিল যথেষ্ট হওয়ার পরও সেটি বাড়াতে থাকা, সামর্থ্যের মধ্যে কিছু কিনেও অপরাধবোধে ভোগা, টাকা হারানোর ভয়ে বিনিয়োগ না করা কিংবা বারবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দেখা—এসবই উদ্বেগের লক্ষণ হতে পারে।
সঞ্চয় করা অবশ্যই ভালো। কিন্তু যদি প্রতিটি খরচের সঙ্গে মনে হয়, ‘এটা না করলেই তো ভবিষ্যতের জন্য আরও কিছু টাকা থাকত’, তাহলে নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা সঞ্চয়ই একসময় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
‘ব্যাগ লেডি সিনড্রোম’ থেকে বের হওয়ার প্রথম ধাপ হলো, নিজের ভয়টাকে স্বীকার করা। টাকা নিয়ে নিরাপদ থাকতে চাওয়া স্বাভাবিক। এখানে টাকা নিয়ে ভাবা বন্ধ করতে হবে না। বরং ভয় যেন প্রতিটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
শুরুটা হতে পারে নিজের আর্থিক অবস্থার বাস্তব হিসাব দিয়ে। মাসে কত আয়, কত খরচ, কত সঞ্চয় আছে—এসব পরিষ্কারভাবে জানুন। চাকরি চলে গেলে কীভাবে মাসের খরচ চালাতে হবে, সেটিও হিসাব করুন। সেই অনুযায়ী জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন। অবসরের জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রাখুন।
তবে শুধু জমিয়ে গেলেই হবে না। টাকা খরচ করাও জীবনের অংশ। সাধ্যের মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখা বা পছন্দের কিছু কেনার জন্য টাকা খরচ করলেই ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে, এমন নয়।
আর্থিক নিরাপত্তা মানে কখনো ভয় না পাওয়া নয়। বরং এমন প্রস্তুতি থাকা, যাতে ভয় এলেও মনে হয়, ‘কিছু হলে সামলানোর মতো ব্যবস্থা আমার আছে।’
ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করুন, বিনিয়োগ করুন, তবে বর্তমান জীবনটিও একটু উপভোগ করুন। কারণ, নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা সঞ্চয়ের ভেতরেই যদি সারাক্ষণ ভয় নিয়ে বসে থাকতে হয়, তাহলে সেই নিরাপত্তার অর্থটাই হারিয়ে যায়।
সংসারের সব আর্থিক বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনের মধ্যে খোলাখুলি আলোচনাটা আবশ্যক। কোথায় কত টাকা আছে, কী কী সঞ্চয় বা বিনিয়োগ আছে, মাসে কত খরচ হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, অনলাইন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা তথ্য সম্পর্কেও সঙ্গীকে জানানো উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, সঙ্গীকে শুধু সংসারের খরচের দায়িত্ব দেবেন না, সংসারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনারও অংশ করুন। এতে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভয় কমবে এবং নিজের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও আত্মবিশ্বাস বাড়বে।