
গ্যাসের সংকটে রান্নাবান্না নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন বহু মানুষ। এমন ভোগান্তিতে পড়লে যে কেউ সাধারণ কিছু ভুল করে ফেলতে পারেন। আর কিছু ভুল থেকে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ প্রসঙ্গে গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্টারপ্রেনিউরশিপ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা শরীফের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম
সব চুলাই গ্যাসের চুলা হলেও সব ধরনের গ্যাস ব্যবহারের জন্য নয়। সংযোগের মাধ্যমে সরবরাহকৃত গ্যাস (সাপ্লাই গ্যাস) ব্যবহারের উপযোগী চুলায় সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে নেই। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে চাইলে সেটির উপযোগী চুলা নিতে হবে। নইলে কেবল ভুল চুলা ব্যবহারের কারণেই ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। কারণ, সাপ্লাই গ্যাস ও সিলিন্ডার গ্যাসের ক্ষেত্রে জ্বালানির চাপ ও ধরন এক নয়।
নিরাপদে ব্যবহারের জন্য বার্নারের ছিদ্রের আকার আলাদা করেই আলাদা ধরনের চুলা তৈরি করা হয়। একটির চুলা অন্যটিতে ব্যবহার করা উচিত নয়।
সংকটের সময় নানান পণ্য মজুত করার প্রবণতা দেখা দেয়। নৈতিকভাবে যেমন এই কাজ ঠিক নয়, তেমনই সিলিন্ডার গ্যাসের মতো পণ্য মজুত করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিলিন্ডার গ্যাস ঘরে রাখতে নেই। তাতে আকস্মিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। সামান্য এই ভুলের কারণেই মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
গ্যাসের অভাবে চুলা যখন জ্বলছেই না, তখন সাপ্লাই লাইনে গ্যাস নেই বলেই সাধারণত ধরে নেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা হলো, চুলা না জ্বললেও মাঝেমধ্যে লাইনে খুব সামান্য পরিমাণ গ্যাস আসতে পারে। তাতে চুলা না জ্বললেও নব অন রাখার কারণে রান্নাঘরে গ্যাস জমা হতে পারে। আপনার অজান্তে যদি এভাবে গ্যাস জমা হতে থাকে, তাহলে এই গ্যাসের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বারবার চুলার নব অন–অফ করলেও এমন ঘটতে পারে।
গ্যাসের চাপ কম থাকলে কখনো কখনো খুব অল্প আঁচে চুলা জ্বলে। এমন ক্ষেত্রে কখনো কখনো শিখাটি নীল রঙের না হয়ে হলুদ বা কমলা ধরনের হয়। অনেকে এ সময় চুলা জ্বালিয়ে রান্নার চেষ্টা করেন। কিন্তু নীল শিখা না থাকলে চুলা ব্যবহার করা কখনো কখনো অনিরাপদ হতে পারে।
গ্যাসের অপর্যাপ্ত দহন হলে, বাতাস ও গ্যাসের অনুপাত ঠিক না থাকলে কিংবা বার্নারে ময়লা জমলে হলুদ বা কমলা শিখা দেখা যেতে পারে।
গ্যাসের অপর্যাপ্ত দহন হলে কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই হলুদ বা কমলা শিখা অপর্যাপ্ত দহনের একটা ইঙ্গিত হতে পারে।
কার্বন মনোক্সাইড জমা হলে সেটির প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন বাড়ির যেকোনো সদস্য। তাই যখন গ্যাসের চাপ পর্যাপ্ত হবে, পর্যাপ্ত নীল শিখা দেখা যাবে, তখন রান্না করা ভালো। যখন বারবার শিখা হলুদ বা কমলা হয়ে যাচ্ছে কিংবা বারবার শিখা নিভে যাচ্ছে, তখন রান্না না করে বরং এমন হওয়ার কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
অপর্যাপ্ত আঁচে একাধিক চুলা জ্বালালে আপনার এটা ঠিকই মনে হবে যে একাধিক চুলায় রান্না বসিয়েছেন। আদতে এভাবে রান্না করতে প্রায়ই অনেকটা বেশি সময় লেগে যায়। বরং এমন অবস্থায় একটি চুলা জ্বালিয়ে তাতে অল্প আঁচে রান্না করা সুবিধাজনক হতে পারে। একটি পদ শেষ করে আরেকটি পদ বসানোর সম্ভাবনা থাকবে।
যেকোনো চুলা ব্যবহারের ক্ষেত্রেই সতর্কতা আবশ্যক। গ্যাসের চুলা ব্যবহারের নিয়ম সব সময়ই মেনে চলুন। এ বিষয়গুলোয় ভুল করা যাবে না—
চুলা জ্বালানোর আগে ও চুলা জ্বালানোর সময় রান্নাঘরের বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন। তখনই রান্নাঘরের দরজা–জানালা খুলে দিন, চালিয়ে দিন এগজোস্ট ফ্যান।
গ্যাস লিকেজ হয়েছে সন্দেহ হলে বাড়ির ভেতর কোনো বৈদ্যুতিক সুইচ অন কিংবা অফ করার ভুল করা যাবে না। গ্যাস লিকেজ পরীক্ষা করতে আগুন জ্বালানো যাবে না।
প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত সিলিন্ডার গ্যাস আনা–নেওয়া করতে গিয়ে তা কাত করে ফেলা বা গড়িয়ে নেওয়া যাবে না। এতেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। সিলিন্ডার সব সময় উল্লম্ব (সোজা অবস্থায়, লম্বাভাবে) রাখুন।
গ্যাসের সংকটের সময় বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো খেয়াল না রাখলে রান্নাবান্না নিয়ে আরও বেশি সমস্যায় পড়বেন আপনি। কোন কোন বিষয় খেয়াল রাখা উচিত, তা মনে করিয়ে দেওয়া যাক—
চুলা ও পাত্র পরিষ্কার না রাখলে আপনি যেটুকু গ্যাস পাচ্ছেন, সেটুকুও সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। তাই এসব অবশ্যই পরিষ্কার রাখুন।
সম্ভব হলে একই পদে একাধিক খাদ্যদ্রব্য যোগ করে নিন। তাহলে কমসংখ্যক পদের মাধ্যমেই নানান রকম পুষ্টির চাহিদা মিটবে।
খাদ্যদ্রব্য খুব বড় আকারে কাটা হলে রান্না করতে জ্বালানি বেশি লাগবে। মাঝারি কিংবা একটু ছোট আকারে কেটে নেওয়া ভালো।
ঢেকে রান্না করলে রান্না করতে তুলনামূলক কম সময় লাগে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা এখন কাজে না লাগানোই একটা ভুল। প্রেশার কুকারে দ্রুত রান্না হয়। স্টিম কুকারে একাধিক পদ একসঙ্গে বসিয়ে দেওয়া যায়।
গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে সেটির সঠিক নিয়ম জেনে নিন।