বছর সাতেক আগেও পুরান ঢাকার চকবাজারে ‘জাহাজ বাড়ি’ নামে একটা ভবন ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ তৈরি এই তিনতলা বাড়িটিকে বলা হয় ঢাকার প্রথম বাণিজ্যিক ভবন। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ২০১৯ সালে ভবনটি গুঁড়িয়ে দেয় দখলদারেরা। জাহাজসদৃশ ভবনটার দোতলায় নকশা করা রেলিং, ছাদওয়ালা টানা বারান্দা ছিল। আর ভবনের অবয়বজুড়ে ছিল নানা কারুকাজ।
বাণিজ্যিক ভবন হলো এমন স্থাপনা, যেখানে ব্যবসা, সেবা ও পেশাগত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এসব ভবনে সাধারণত অফিস, ব্যাংক, শপিং মল, বিমাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট কার্যালয় কিংবা হোটেল থাকে। আবাসিক ভবনের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হলো বাণিজ্যিক ভবনের সঙ্গে বসবাস নয়; বরং আয় ও কর্মসংস্থান জড়িত।
রাজধানী ঢাকায় ক্রমাগত বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বাণিজ্যিক ভবনের সংখ্যা। ঢাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলোর সিংহভাগ মতিঝিল, গুলশান, তেজগাঁও-গুলশান সংযোগ সড়ক, বনানীর কামাল আতাতুর্ক রোড এবং উত্তরায় গড়ে উঠেছে। মতিঝিলের পর গত দেড় দশকে গুলশান এলাকা বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। তবে জায়গাস্বল্পতার কারণে গুলশান-বনানীর বাণিজ্যকেন্দ্রটির সম্প্রসারণের সুযোগ কম। বিশেষত বনানী এলাকায় পার্কিংয়ের সংকট তীব্র। পঞ্চাশের দশকে ৫০০ একরের বেশি জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ১৯৯৮ সালে তেজগাঁও-গুলশান সংযোগ সড়ককে ‘বাণিজ্যিক সড়ক’ ঘোষণা করে সরকার। ডেভেলপাররা আশা করছেন, ভবিষ্যতে ৩০০ ফিট ও মাটিকাটা রোড এলাকায় এ ধরনের বাণিজ্যিক হাব গড়ে উঠবে।
এসব ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকায় বাণিজ্যিক ভবন বাড়ার বহুমুখী কারণ আছে। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে সরকারের নীতি কঠোর হচ্ছে, ফলে বাণিজ্যিক ভবনের চাহিদা বাড়ছে। ছোট ছোট অনেক নতুন করপোরেট হাউস তৈরি হচ্ছে, যারা নিজেদের একটা জায়গা (স্পেস) চায়। নিজস্ব জায়গা ব্যবসায় স্থিতি এবং নতুন ক্রেতা পেতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এই ভবনগুলোয় লিফট, পার্কিং, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের মতো ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি–সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হয়। এ জন্য অনেকে আবাসিক এলাকা থেকে বেরিয়ে বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় যেতে আগ্রহী হচ্ছেন।
বর্তমানে ঢাকায় এ রকম কিছু বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ট্রপিক্যাল হোমসের টিএ টাওয়ার, আনোয়ার ল্যান্ডমার্কের আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক কলোজিয়াম, শান্তা হোল্ডিংসের পিনাকেল ও ঢাকা টাওয়ার, সেনাকল্যাণ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসের এসকেএস স্কাইরিচ ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমজিআই টাওয়ার। এর মধ্যে টিএ টাওয়ার মালিবাগে, আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক কলোজিয়াম ধানমন্ডিতে আর বাকিগুলো তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে। এ ভবনগুলোর মধ্যে চলতি বছর শেষ হবে পিনাকেলের নির্মাণকাজ।
মালিবাগে দেশের প্রথম ৪৫ তলা বাণিজ্যিক ভবন করছে ট্রপিক্যাল হোমস। টিএ টাওয়ার নামের এ ভবনের উচ্চতা ৫০০ ফুট। ৪৬ কাঠা জমির ওপর নির্মাণাধীন ভবনটিতে ২২টি লিফট, হাসপাতাল, হোটেল, সুপারশপ, কনফারেন্স হল, রেস্তোরাঁ, সুইমিংপুল, হেলিপ্যাড ও থ্রি–ডি মুভি থিয়েটার সুবিধা থাকবে।
ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কে ২০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণাধীন আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক কলোজিয়াম হবে ২৬ তলার আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন। রাজউক অনুমোদিত এ প্রকল্পে বেজমেন্ট-২ ও বেজমেন্ট-১, সেমি বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ ওপরের তলাগুলোতে থাকবে কমার্শিয়াল স্পেস। ভবনটিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস থাকছে। দক্ষিণ-পূর্বমুখী এ ভবনে থাকছে ৭০টি গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা।
পুরানা পল্টনে ১৪ দশমিক ১৬ কাঠা জমিতে নির্মিত ‘ট্রপিক্যাল ইলেকট্রা টাওয়ার’ একটি ২৬ তলা আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন। ২ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪৯১ বর্গফুট পর্যন্ত কমার্শিয়াল স্পেস এবং ৫ হাজার ৯৯২ বর্গফুটের পূর্ণ ফ্লোর—সব ধরনের ব্যবসার জন্যই উপযোগী। ভবনে থাকছে চারটি যাত্রীবাহী লিফট, দুই জোড়া সিঁড়ি এবং ১০০ ফুট প্রশস্ত প্রধান সড়কের মুখ।
গুলশান-বনানীর বাণিজ্যিক ভবনগুলোর চাহিদা বেশি। বিশেষত এখানকার ভবনগুলোর নিচের দিকের ফ্লোরের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। এসব ভবনের একেবারে ওপরের তলা (টপ ফ্লোর) বিভিন্ন রেস্তোরাঁর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। দ্বিতীয় তলা থেকে টপ ফ্লোরের আগপর্যন্ত বেশির ভাগ অফিসের কাজে ব্যবহার করা হয়। রিটেইল শপ, চেইন শপ—এসবের জন্য নিচতলা ও প্রথম তলার চাহিদা থাকে বেশি।
চাহিদা থাকলেও ডেভেলপাররা এখনো এসব ভবনে বেশি বিনিয়োগ করছে না। ডেভেলপাররা আবাসিক ভবনগুলোতেই বিনিয়োগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বর্তমানে হাতে গোনা পাঁচ-সাতটি প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করছে বলে জানা যায়।
বিশ্বে সুউচ্চ বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের একটা চল আছে। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফার কথা সবারই জানা। ১৬৩ তলাবিশিষ্ট বুর্জ খলিফার উচ্চতা ৮২৮ মিটার। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কুয়ালালামপুরের মারদেকা ১১৮। বাংলাদেশে এখনো এমন কোনো ‘আইকনিক’ বাণিজ্যিক ভবন নির্মিত হয়নি। এখন পর্যন্ত ঢাকার সবচেয়ে উঁচু ভবন মতিঝিলের সিটি সেন্টার। উচ্চতা ১৭১ মিটার। এক দশক আগে ৩৭ তলা এই বাণিজ্যিক ভবনের ব্হাযবর শুরু হয়।
ট্রপিক্যাল হোমস লিমিটেডের বিক্রয়, বিপণন ও গ্রাহকসেবা বিভাগের পরিচালক এম হক ফয়সাল বলেন, ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। পার্কিং, অগ্নিনিরাপত্তা, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করলে বলব, বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের এখন পর্যন্ত ১০-১৫ তলার ওপরে ফায়ার সার্ভিস রেসকিউ করতে পারে না। ডেভেলপাররা আন্তরিক কিন্তু সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের কাছাকাছি দেশ দুবাই, মালয়েশিয়া যেভাবে হাই রাইজে যেতে পারছে, আমরা ওভাবে যেতে পারিনি।’
বিশ্বজুড়েই আলোচিত ‘গ্রিন বিল্ডিং’-এর ধারণা। গ্রিন বিল্ডিং হলো পরিবেশবান্ধব, সম্পদসাশ্রয়ী ও টেকসই নির্মাণপদ্ধতি। শক্তি ও পানির দক্ষ ব্যবহার, বর্জ্য কমানো এবং ভবনের অভ্যন্তরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি এই পদ্ধতির লক্ষ্য। গত এক দশকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ভবনগুলোতেও এর ছোঁয়া লেগেছে। ভবনগুলো পুরোপুরি ‘গ্রিন’ না হলেও সেসবে ‘সাব গ্রিন’ বা ‘কোয়ার্টার গ্রিন’ সুবিধা থাকছে। বিশেষত সৌর প্যানেলের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পরিশোধন ও সংরক্ষণ করার মতো ব্যবস্থা থাকছে। আনোয়ার ল্যান্ডমার্কের জেনারেল ম্যানেজার এবং বিক্রয়প্রধান এ জেড এম তানভীর আহাদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সেরা আর্কিটেক্টদের (স্থপতি) দিয়ে এগুলো (ভবন) ডিজাইন করা হয়। আমরা গ্রিনের প্রতি বেশি ইমফেসাইজ (গুরুত্ব) দিই। ৫০ শতাংশের বেশি জায়গা আমরা খোলা রাখি। আলো-বাতাস যেন ঠিকমতো আসতে পারে, সেদিকে অগ্রাধিকার দিই।’
পরিকল্পিত বাণিজ্যিক ভবন ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করে। এটি বিনিয়োগ আকর্ষণেও সহায়ক। রাজধানীর এসব ভবনে অফিস, দোকান ও সেবাকেন্দ্র একত্রে গড়ে ওঠায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। এসব কমার্শিয়াল স্পেস ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও সহজলভ্য। ব্যাংক লোন-সুবিধা নিয়ে ছোট করপোরেট হাউস ৫০০-৭০০ বর্গফুটের অফিস স্পেস ব্যবহার করছে। বহুতল ভবনের মাধ্যমে সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারও সম্ভব হচ্ছে।
তবে এই উন্নয়নের আরেকটি দিক উপেক্ষা করা যায় না। অপরিকল্পিতভাবে কমার্শিয়াল ভবন নগরজীবনের ওপর চাপ বাড়ায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। একটি ভবনে শত শত অফিস বা প্রতিষ্ঠান হলে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত শুরু হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী রাস্তা বা পার্কিং সুবিধা তৈরি হয় না।
রাজধানীতে বাণিজ্যিক ভবন বৃদ্ধির চিত্র নিয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) পরিচালক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘ঢাকা এখন মেগা সিটি। প্রয়োজনের তুলনায় কমার্শিয়াল ডেভেলপমেন্ট আমাদের দেশে এখনো যথাযথ নয়। যার জন্য বাসাবাড়ি এলাকায় কমার্শিয়াল কার্যক্রম হচ্ছে। সরকারের উচিত ছিল কমার্শিয়াল জোন নির্ধারণ করে দেওয়া।’ তিনি আরও যোগ করেন, প্রতিটি এলাকাতেই বাণিজ্যিক হাব থাকবে। তারা আবাসিক এলাকার মধ্যে ঢুকতে পারবে না। কিন্তু এখনো ওই ধরনের কোনো পরিকল্পনা সরকার দেয়নি। এটা অপর্যাপ্ত হওয়ায় আবাসিক এলাকার ওপর চাপ পড়ছে। তিনি এই চাপ সামলাতে ঢাকার আশপাশে সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ—এই স্যাটেলাইট সিটিগুলোকে পরিকল্পনায় আনার পরামর্শ দেন।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে যেহেতু ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, তাই এখন প্রয়োজন সময়ের থেকে এগিয়ে পরিকল্পনা করার। এতে বাংলাদেশ আরও দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।