
বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মাসুকা বেগম। শেষ ইচ্ছা অনুয়ায়ী তাঁকে দাফন করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে বড় বোনের শ্বশুরবাড়ির গ্রামে। শাহাদৎ হোসেনকে ছোট বোন সম্পর্কে বললেন বড় বোন পাপড়ি রহমান
দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেক দিন ধরেই আমি অসুস্থ। চোখেও কিছুটা কম দেখি। (মাসুকা বেগম) নিপু নিজের ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়মিত আমার খোঁজ রাখত। গত শুক্রবারও ওর সঙ্গে কথা হলো। দুই ঘণ্টা ধরে কত কী নিয়ে যে আলাপ করল বোনটা—আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিল, ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিল আরও কত কী। সারাক্ষণ আমাকে নিয়েই ওর যত চিন্তা। নিজের বলতে বোনটার তো কিছু ছিল না, আমার ছেলেমেয়ে, সংসার নিয়েই চিন্তা। আমার তিন সন্তানও খালামণি বলতে পাগল। সে যেন ছিল তাদের আরেক মা।
সোমবার বিকেল চারটার দিকে আমার কলেজশিক্ষক মেয়ের কাছে শুনি নিপুদের স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। তখনো কিন্তু জানি না যে আমার বোনটাও আহত হয়েছে। আমার স্বামী-সন্তান নিজেদের মতো করে নিপুর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সময় যত গড়াচ্ছিল, তাদের আচরণ দেখে বুঝতে পারছিলাম—আমার কলিজার টুকরাটার কিছু একটা হয়েছে, ওরা লুকাতে চাচ্ছে। রাত সাড়ে আটটা কি নয়টার দিকে জানতে পারি, নিপু আহত হয়েছে। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। এরপর তো মৃত্যুর সংবাদই পেলাম।
আমাদের আদি বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে চিলোকুট গ্রামে। তবে বেড়ে উঠেছি শহরের মেড্ডা সবুজবাগ এলাকায়। বাবা (সিদ্দিক আহমেদ) এখনো সেখানেই থাকেন। আমাদের তিন ভাইবোনের মধ্যে নিপু সবার ছোট। ওর সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য আট বছর।
আমার অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের দিনের কথা এখনো মনে আছে। আমি খুব কাঁদছিলাম। নিপুর বয়স তখন ৫ কি ৬ বছর। আমার দেখাদেখি সে–ও কাঁদছিল। এরপর শ্বশুরবাড়িতে এলাম। কিন্তু সংসার কিছু বুঝি না। দেখা যেত বাবার বাড়িতেই তখন বেশি থাকতাম। আমি বাড়ি থাকলে ওর আর আনন্দের সীমা থাকত না।
আমাদের আদরের বোন ছিল নিপু। ছোটবেলায় নিপু যখন অসুস্থ হয়ে পড়ত, আমরা কান্নাকাটি শুরু করে দিতাম।
নিপু যখন এসএসসি পাস করল, তখন আমি বাবার বাড়িতে। সন্তানসম্ভবা। মা–ও তখন অসুস্থ। রুমে আমরা সবাই ওর আসার অপেক্ষায়। একসময় রেজাল্ট নিয়ে স্কুল থেকে বাড়িতে এল। ঘুরে ঢুকেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। এমন যেকোনো আনন্দে বোনটা আমাকেই প্রথম জানাত। একইভাবে ওর কোনো কষ্টের কথাও।
এমন কত স্মৃতি তাড়া করছে আজ। খাবারদাবার নিয়ে নিপুর খুব একটা বাছবিচার ছিল না। তবে অল্প খেত। আমার হাতের মুক্তাকোন পিঠা ছিল ওর খুব পছন্দ। এলেই বানিয়ে খাওয়াতাম।
মাসুকা যখন পড়াশোনা করছিল, তখন আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবাও খেয়ালি মানুষ। নিপুই তখন অসুস্থ মায়ের পাশাপাশি বাবাকে দেখাশোনা করত। মাকে সে অনেক দিন সেবা করেছে। প্রায় ১৫ বছর আগে মা হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান।
এর মধ্যে অনার্স শেষ করে নিপু। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী ছিল ও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে ঢাকার ইডেন কলেজে গিয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হলো। পড়াশোনা শেষ করে ঢাকাতেই শিক্ষকতা শুরু করে। কয়েক বছর আগে যোগ দেয় মাইলস্টোনে।
ঢাকায় চাকরি হওয়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জে তাঁর আসা-যাওয়া কমে যায়। ফোনেই কথা হতো বেশি। আমার মেয়ে ফাহমিদা খানম, শায়রিন জাহান ও নারিয়াহ নাশফিন এবং ছেলে আহনাফ হাসানের সঙ্গে বোনের আত্মার সম্পর্ক ছিল। তাদের সবখানে আমার বোনের উপস্থিতি ছিল। আমার সঙ্গে কথা না হলেও প্রতিদিন আমার সন্তানদের সঙ্গে ওর কথা হতো।
আমরা আর তার স্কুল—এই ছিল তার জীবন। বাবাকে নিয়মিত হাতখরচ পাঠিয়েছে। বাবা বেখেয়ালি মানুষ। সব হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সে বাবার খোঁজখবর রাখত। স্কুলের বাচ্চারাও তাকে অনেক পছন্দ করত। ‘মাসুকা মিস’ নামেই তাদের কাছে পরিচিত ছিল। ওর তত্ত্বাবধানে বাচ্চারা ভালো ফলাফল করত। অভিভাবকেরা ও বাচ্চারা খুশি হয়ে আমার বোনকে বিভিন্ন উপহার দিত। বিদ্যালয়ে যা-ই ঘটত আমাকে জানাত। আমি বলতাম, ‘এটাই তোমার প্রাপ্তি, এটাই তোমার পাওনা।’
অনেক দিন রাতে যখন আমার সঙ্গে কথা হতো, জিজ্ঞেস করতাম, এখন কী করবে? বলত, ‘ল্যাপটপ নিয়ে বসব, স্কুলের কাজ করব।’
বোনটা আমার সন্তানতুল্য। তবে দেখা যেত সব সময় আমার জীবনে সে মায়ের ভূমিকাই পালন করেছে। যে কাজটি আমাদের করার কথা, সেটি সে করত। মনে হতো আমরা না, নিপুই আমাদের অভিভাবক।
খুব কষ্ট হয় যখন মনে হয়, তাঁর শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। ওর সহকর্মীরা বলেছেন, নিপু চাইলে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে যেতে পারত। কিন্তু বাচ্চাদের রেখে আমার বোন রুম থেকে বের হয়ে যায়নি। বাচ্চাদের রেখে ও কীভাবে বের হবে!
মৃত্যুর আগেও বোন আমার কথা বলে গেছে। বলবেই না কেন! আমার বোন না। এখন এই সোহাগপুরেই আমার বোনটা আছে। মাঝেমধ্যে ভাবি, কী সৌভাগ্য আমার, বোনটা আমার কাছেই আছে।