২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে অশান্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে সংঘাতের প্রভাব। চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন সেখানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। স্বজন হারানো দুই প্রবাসীসহ তিনজনের অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’তে। এখানে একজনের মুখে শুনুন তাঁর অভিজ্ঞতা।
জীবিকার তাগিদে বাহরাইনে আছি ৩২ বছর। এই দীর্ঘ প্রবাসজীবনে এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আগে কখনো হইনি। প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকি কখন কী হয়ে যায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কখন না জানি শেষ হয়ে যাই।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ২ মার্চ রাতে বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে তেহরান। সেই হামলাতেই মারা গেছে আমার জ্যাঠাতো ভাই আবুল মহসিন। বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে সে কাজ করত। তার সঙ্গে ওই দিন কাজ করছিল মোহাম্মদ নাজিম নামের আরেকজন। আমাদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। মহসিনের মাথায় ওপর যখন ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে, তখন পাশেই কাজ করছিল নাজিম। তাকে বাঁচাতে এসে নাজিমের হাত, মুখেও আগুন লেগে যায়। সে এখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। মহসিন ও নাজিম দুজনই আমার সঙ্গে একই রুমে থাকত। আজ একজন পৃথিবী থেকে চলে গেছে। আরেকজন চিকিৎসাধীন। রুমে তাদের দুজনের খাট খালি পড়ে আছে। তাদের খাট, জিনিসপত্র দেখলে নিজেকে সামলে রাখতে পারি না।
আমার সঙ্গে রুমে থাকেন আজিমুল ইসলাম, আবুল কাশেম, নাছির উদ্দিন। তাঁদের বাড়িও সদ্বীপ। মহসিন নিহত হওয়ার পর থেকে আমরা কেউ আর কাজে যাচ্ছি না। রুমের ভেতর দিনরাত কাটছে। কোম্পানি থেকে ৪ মার্চ কাজ করার জন্য ডাকা হলেও আতঙ্কে আমরা যাইনি। এক শিফটে যেখানে ৪০০ থেকে ৫০০ লোক কাজ করে, সেখানে কাজে যাচ্ছে এখন মাত্র ১০–১২ জন লোক।
আমাদের আতঙ্কের কারণও আছে। ড্রাইডকে আমরা কাজ করি, সেখান থেকে মার্কিন ঘাঁটি মাত্র দেড় কিলোমিটার। ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যচ্যুত হয়ে আশপাশের এলাকায় পড়ছে। আবার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাটিতে পড়ার আগে প্রযুক্তির সাহায্য এগুলোকে ধ্বংসও করা হচ্ছে। দিনে ২০ থেকে ২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস কিংবা লক্ষ্যবস্তুতে পড়ছে। একেকটির বিকট শব্দে বুক কেঁপে উঠছে। আর প্রতিবারই আল্লাহকে ডাকছি।
ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক ও দুই দেশের দূতাবাসের সব কার্যক্রম শেষ হলে মহসিনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হবে। ৪ মার্চ দুপুরে মহসিনের লাশ দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কফিনের ভেতর তার লাশটি দেখে কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। ১৯৯৩ সালে দুজনে একসঙ্গে বাহরাইন এসেছিলাম। বছরখানেক পর সে দুবাই চলে যায়। দুই বছর পর আবার বাহরাইনে আসে। আমাদের দুজনের পরিবারও চট্টগ্রাম শহরের হালিশহরে থাকে। বয়সে মহসিন আমার ছোট। কিন্তু আমার আগেই সে চলে গেল। দেশে তার স্ত্রী, সন্তানদের কথা মনে পড়েছে। সামনের কঠিন দিনগুলো তারা কীভাবে পাড়ি দেবে?
দিন দিন যুদ্ধ পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে। এভাবে কত দিন রুমের মধ্যে বসে থাকতে হবে, জানি না। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, বুঝতে পারছি না। আমাদের মতো বাংলাদেশে আমাদের পরিবারের সদস্যরাও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অনেকের পরিবার দেশে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে, কিন্তু দেশে গিয়ে আমরা কী করব?
অনুলিখন: গাজী ফিরোজ