নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের এই বুকশপে নোবেল, বুকার আর পুলিৎজারজয়ী অনেক লেখকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। ৬ আগস্ট হলো এক বাংলাদেশি তরুণ লেখকের বইয়ের প্রকাশনা উৎসব। জায়গাটি ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ স্ট্র্যান্ড বুকস্টোর। ডায়াল প্রেস প্রকাশ করেছে পি. পারমিতার প্রথম বই ‘অ্যাপেটাইট’। উপন্যাসের অংশবিশেষ পড়ে এবং তাঁর লেখক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও যাত্রাপথের গল্প বলে পারমিতা শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।

পি. পারমিতাকে হলভর্তি মার্কিন সাহিত্য অনুরাগীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ‘নিউইয়র্ক টাইমস’–এর এডিটরস-চয়েসখ্যাত লেখক হেলি জ্যাকবসন। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রবেশ মূল্য ছিল ২০ ডলার। জায়গা স্বল্পতার কারণে কেউ কেউ ফিরেও গেছেন।
শতাধিক দর্শক-শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে পারমিতার কথা শুনছিলেন। উপন্যাসের কিছু অংশ পাঠ করার পর লেখক, শিল্পী, প্রকাশক ও পাঠকেরা প্রশ্ন করেন। পারমিতার সাবলীল কিন্তু প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা, হাসি আর উচ্ছ্বাসকে দর্শক করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান।
পারমিতা যখন বলেন, ‘আমার মা মেরিনা মনে করেন, এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জরিনা নামটি তাঁর মেরিনা নাম থেকে নিয়েছি’, তখন হাসির রোল ওঠে।
পারমিতা বলেন, ‘আমার এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আমেরিকাপ্রবাসী বাংলাদেশি নারী। সে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করে, কিন্তু সে ভীষণ ভক্ত আমেরিকান প্রফেশনাল রেসলার সিয়েরা মিস্টের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্র ধরে তারকা ও অনুরাগীর সম্পর্কের নানামুখী জটিলতা এই উপন্যাস।’
কৌতূহলী দর্শক নীরবতার মধ্য দিয়ে শুনতে থাকেন উপন্যাসের গল্প। একজন মার্কিন শিল্পী ধ্যানীর মতো বসে পেনসিলে আঁকছিলেন পারমিতার মুখ।
আলাপ শেষে পারমিতার সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত হন সবাই। দুজন নিয়ে আসেন ‘অ্যাপেটাইট’ লেখা কেক। আরেকজন বইয়ের প্রচ্ছদ এবং পারমিতার ছবি দিয়ে প্রিন্ট করে টি-শার্ট নিয়ে আসেন বেশ কয়েকটি।
যাঁরা অগ্রিম অর্ডার করেছিলেন, তাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে যান ‘অ্যাপেটাইট’–এ পারমিতার অটোগ্রাফ নিতে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে স্ট্র্যান্ড বুকসের ইভেন্ট কো–অর্ডিনেটর ক্রিস্টি ম্যাককুইন ঘোষণা দেন, ‘সোল্ড আউট। সোল্ড আউট। আর কপি নেই।’
মন ভরিয়ে দেওয়ার মতো এই দৃশ্যগুলো উপভোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ২৫ জনের মতো বাংলাদেশিও। বইটি লেখার উপাদান সংগ্রহ করতে গিয়ে রেস্তোরাঁর যে রন্ধনশিল্পীদের সঙ্গে পারমিতা কথা বলতেন, তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এসেছিলেন তাঁরাও।
অনেকে ভেবেছিলেন অনুষ্ঠানে এসে বই কিনবেন। ক্রিস্টি বলেন, ‘আমরা আসলে অগ্রিম অর্ডার অনুযায়ী বই এনেছি পেঙ্গুইন থেকে।’ আরেকজন ইভেন্ট কো–অর্ডিনেটর টিকো তজিপতারতোর সঙ্গে কথা বলি। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইভেন্ট টিম জানত “অ্যাপেটাইট” ভালো বিক্রি হবে। প্রচারণায় ভালো সাড়া পাচ্ছিলাম। এ জন্য অর্ডারের চেয়ে কিছু বই বেশি এনেছিলাম। সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে।’
স্ট্র্যান্ড বুকস্টোর যাত্রা করে ১৯২৭ সালে, নিউইয়র্কে। বইপ্রেমীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। নোবেলজয়ী টনি মরিসন, কাজুও ইশিগুরো, বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত সালমান রুশদি, পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত ঝুম্পা লাহিড়ীর মতো বিশ্বখ্যাত লেখকদের বহুল আলোচিত বই নিয়ে অনুষ্ঠান আর সাহিত্য আড্ডা হয়েছে স্ট্র্যান্ড বুকসে।
বইটির প্রকাশক পেঙ্গুইন এবং অনুষ্ঠানের আয়োজক স্ট্র্যান্ড বুকস্টোর অনুষ্ঠানের প্রচার চালিয়েছিল তাদের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই–মেইলে। এ বই নিয়ে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে পারমিতার বিশেষ বুক ট্যুর।
৮ আগস্ট নিউ হেভেনের পসিবল ফিউচারসে পাঠকের সঙ্গে কথা বলেছেন অ্যানেলিস চেনকে সঙ্গে নিয়ে। ২৫ আগস্ট প্রভিডেন্সের রিফ র্যাফ বুকসে।
২৭ আগস্ট সামারভিলের ন্যারেটিভ বুকশপে এবং ৮ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসির লস্ট সিটি বুকসে উরসুলা ভিলারিয়াল-মূরার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেবেন পারমিতা।
পেপারব্যাক, অডিওবুক এবং ই-বুক—এই তিন সংস্করণেই বইটি প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন। এর পেপারব্যাক বা ছাপা সংস্করণটি ১৮ ডলারে অ্যামাজন, বার্নস অ্যান্ড নোবেল, বুকস-এ-মিলিয়ন, বুকশপ ডটওআরজি, হাডসন বুকসেলার্স, পাওয়েলস, টার্গেট ও ওয়ালমার্টে পাওয়া যাবে।
৮ ঘণ্টা ৯ মিনিটের অডিওবুক সংস্করণটি শোনা ও ডাউনলোড করা যাবে অ্যাপল বুকস, অডিবল, অডিওবুকস ডটকম, অডিওবুকস্টোর ডটকম, বার্নস অ্যান্ড নোবেল, চার্প, গুগল প্লে, কোবো, লিব্রো ডটএফএম এবং স্পটিফাইয়ে।
এ ছাড়া অনলাইনে পড়ার জন্য ই-বুক সংস্করণটি কিন্ডল, কোবো, গুগল প্লে বুকস ও অ্যাপল বুকসে পাওয়া যাবে। সব মাধ্যমে বিক্রির রয়্যালটি পাবেন পারমিতা। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের প্রধান কেন্দ্রস্থল জ্যাকসন হাইটস। এই এলাকার ৭৩ স্ট্রিটের ৩৪ এভিনিউর দ্য ওয়ার্ল্ডস বরো বুক শপ এবং রুজভেল্ট অ্যাভিনিউর ৭৪ স্ট্রিটের মুক্তধারাতেও পাওয়া যাবে ‘অ্যাপেটাইট’।
বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র্যানডম হাউসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান দ্য ডায়াল প্রেস ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট এক সপ্তাহের জন্য উন্মুক্ত পাণ্ডুলিপির আহ্বান করেছিল। হাজারখানেক পাণ্ডুলিপি থেকে ‘অ্যাপেটাইট’ নামের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য নির্বাচন করে প্রকাশনা সংস্থাটি।
পারমিতা বলেন, ‘বইটি ২০২৩ সালের জুনে লেখা শুরু করেছিলাম। আগস্টে লেখার কাজ শেষ হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সম্পাদক কেটি নিশিমোটোর সঙ্গে আলোচনা চলে। পাশাপাশি এমএমকিউএ এজেন্সির এজেন্ট অ্যাশলি লোপেজের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় এবং তাঁর অধীনে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পাণ্ডুলিপিটি সম্পাদনা করে মে মাসে সম্পাদকের কাছে পুনরায় জমা দেওয়া হয়। ২০২৪-এর জুনে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ পরীক্ষার পর বইটি পেয়েছি।’
পারমিতা স্কুলজীবনে লেখালেখি শুরু করেন। বাংলাদেশে ‘ডেইলি স্টার’–এ লিখছেন ২০১০ সাল থেকে। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তাঁর লেখা ‘টিন ভোগ’, ‘দেম’, ‘কালার ব্লগ’, ‘অটোস্ট্র্যাডল’, ‘সাদাম্পটন রিভিউ’ এবং ‘ডগউড জার্নাল’-এ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালে পারমিতা কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে মাস্টার্স করেন। পরের বছর একই বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন সাদার্ন কানেটিকাট স্টেট ইউনিভার্সিটিতে।