সিনেমার জন্য মাইকেল জ্যাকসনের পোশাক নিয়ে ডিজাইনারকে কত কিছুই না করতে হয়েছে

মাইকেল জ্যাকসনকে পর্দায় তুলে আনার জন্য যতটা না কষ্ট করতে হয়েছে ক্যামেরার সামনে, তার থেকেও বেশি কষ্ট করতে হয়েছে ক্যামেরার পেছনে। আপন চাচার চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে দুই বছরের বেশি সময় পরিশ্রম করেছেন জাফর জ্যাকসন। কিন্তু সবকিছুই পণ্ড হয়ে যেত যদি পর্দায় ফুটে না উঠত মাইকেল জ্যাকসনের আইকনিক পোশাকগুলো। পর্দার পেছনে থেকে সেই কঠিন কাজই করেছেন কস্টিউম ডিজাইনার মার্সি রজার্স।

‘জ্যাকসন’ সিনেমায় মাইকেল জ্যাকসন চরিত্রে অভিনয়ে করেছেন জাফর জ্যাকসন
মাইকেল জ্যাকসন

‘পপ তারকা’—শব্দযুগল শুনলেই সবার আগে মাথায় আসে মাইকেল জ্যাকসনের নাম। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন শুধু তাঁর গান আর নাচ দিয়ে নয়, অপ্রতিম ‘ফ্যাশন সেন্স’-এর জন্যও। তাই তো মৃত্যুর ১৭ বছর পরও মাইকেল জ্যাকসন সমান জনপ্রিয়।

সেই মাইকেল জ্যাকসনের শৈশব থেকে শুরু করে তাঁর সাফল্যের চূড়ায় ওঠার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে বায়োপিক ‘মাইকেল’। নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন তাঁরই আপন ভাইপো জাফর জ্যাকসন। পর্দায় জাফরকে দেখে মনে হয়েছে, স্বয়ং মাইকেল জ্যাকসনই ফিরে এসেছেন আবার।

সবচেয়ে কঠিন যা ছিল

‘মাইকেল’ সিনেমার কস্টিউম ডিজাইনার মার্সি রজার্সের জন্য কাজটা ছিল সবচেয়ে কঠিন। কারণ, মেকআপ দিয়ে, অনুশীলন করে হয়তো মাইকেল জ্যাকসনকে পর্দায় আনা যাবে। কিন্তু মাইকেল জ্যাকসনের মতো পোশাক তৈরি করার জন্য দরকার নিখুঁত হাতের ছোঁয়া।

‘মাইকেল’ সিনেমায় কস্টিউম ডিজাইন করেছেন মার্সি রজার্স (বাঁয়ে)

ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন ক্যামেরাবন্দী। তাঁর প্রতিটি নাচের মুদ্রা থেকে শুরু করে জ্যাকেটের সূক্ষ্ম কাজ—সবকিছুই ভক্তদের একদম মুখস্থ। মার্সি রজার্সকে সেই সূক্ষ্ম কাজ ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে পর্দায়।

‘পিপল ম্যাগাজিন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্সি রজার্স জানান, জাফর জ্যাকসনের জন্য প্রতিটি পোশাক তিনি একেবারে শূন্য থেকে তৈরি করেছেন। মূল পোশাকের সঙ্গে হুবহু মিল রেখে কাপড় থেকে শুরু করে সুতার রং পর্যন্ত ছিল ঠিক আগের মতোই।

ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন ক্যামেরাবন্দী

শুধু মাইকেলের পোশাক নয়

এ সিনেমায় মাইকেল জ্যাকসনের ছোটবেলা থেকে ১৯৮৮ সালের ভিক্টোরি ট্যুরের গল্প পর্যন্ত উঠে এসেছে। ফলে শুধু মাইকেল নয়, তাঁর পরিবার ও ‘জ্যাকসন ফাইভ’ ব্যান্ডের পোশাকের দিকেও আলাদা নজর রাখতে হয়েছিল মার্সি রজার্সকে।

মাইকেল জ্যাকসনের পুরো পরিবার, তাঁর বাসায় পরা কাপড়চোপড় নিয়েও আলাদা কাজ করেছেন মার্সি। তাঁর ভাষায়, ‘বাড়িতে মাইকেল লিভাইস জিনস ও ক্যাজুয়াল শার্ট পরতেন। সেটাও যেন নিখুঁত হয়, সেই চেষ্টা ছিল।’

১৯৭২ সালে ‘জ্যাকসন ফাইভ’–এর পরিবেশনা

সিনেমার সঙ্গে মাইকেল জ্যাকসনের পরিবার সরাসরি যুক্ত থাকায় বেশ সুবিধা হয়েছে মার্সির। যখনই প্রয়োজন পড়েছে, মাইকেলের পোশাকের আর্কাইভ দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

কিন্তু তাতেও অনেক সময় কাজ হয়নি। কারণ, অর্ধশতক পর এসে অনেক পোশাকই ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে, কয়েকটি নিলামে উঠেছে, কয়েকটির গুরুত্বপূর্ণ ডিটেইল নষ্ট হয়েছে বা খোয়া গেছে।

মার্সি রজার্স
শুরুটা করেছিলাম মাইকেলের গানগুলো দিয়ে। শুধু মাইকেল ও তাঁর পরিবারের পোশাকের ওপরই প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার একটা বই বানিয়েছি। মাইকেল জ্যাকসন থেকে শুরু করে তাঁর পরিবার—‘জ্যাকসন ফাইভ’-এর প্রতিটি সদস্যকে একদম নিখুঁত করে তুলে আনতে চেয়েছি।
মার্সি রজার্স, কস্টিউম ডিজাইনার, ‘মাইকেল’

পোশাক নিয়ে গবেষণা

পোশাকের ক্রিস্টালে পরা আলো কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটাও বারবার পরীক্ষা করে দেখতে হয়েছে মার্সিকে

বিশেষ করে ১৯৮৮ সালের ভিক্টোরি ট্যুরের সাদা-কালো আইকনিক লুক ফুটিয়ে তোলা ছিল চ্যালেঞ্জিং।

মার্সি বলেন, ‘ইউটিউবে এই ট্যুরের ভিডিওগুলো এতবার এডিট করা হয়েছে যে প্যান্টের কাজগুলো বোঝাই যাচ্ছিল না। তাই “ইবোনি” বা “জেট”-এর মতো পুরোনো ম্যাগাজিনগুলো খুঁজে বের করি। তখনকার সময় তোলা ছবি থেকে বুঝতে পারি, প্যান্টে মূলত বিউগল বিডস (একধরনের কাচের পুঁতি) ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখান থেকে ধরে ধরে প্রতিটি পোশাক তৈরি করেছি।’

প্রতিটি পোশাকের ওজন নিয়েও আলাদা করে সময় দিতে হয়েছে মার্সিকে

মার্সি রজার্সকে শুধু পোশাকের দিকে নজর দিলেই হয়নি, নজর দিতে হয়েছে পর্দায় কীভাবে ফুটে উঠবে, তার ওপরও। কনসার্টে পরা পোশাকগুলো শুটিংয়ের লাইটিংয়ে মলিন হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়।

এ কারণে ছিল বাড়তি প্রস্তুতি। এমনকি প্রতিটি পোশাকের ওজন নিয়েও আলাদা করে সময় দিতে হয়েছে তাঁকে। মোজার ব্যাপারেও মার্সি শর্টকাট বেছে নেননি।

মার্সি বলেন, ‘সে সময়ের পোশাকগুলো পর্দায় আনতে শুধু ডিজাইন নয়, ওজন আর চাকচিক্য নিয়েও ভাবতে হয়েছে। কারণ, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মাইকেল সাধারণ রাইনস্টোন (কৃত্রিম পাথরবিশেষ) ব্যবহার করলেও পরে দামি সরোভস্কি ক্রিস্টাল ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেই ক্রিস্টালে পরা আলো কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটাও বারবার পরীক্ষা করে দেখতে হয়েছে।’

লাল রং যেভাবে ঘামাল

‘থ্রিলার’ গানের মিউজিক ভিডিওতে মাইকেল জ্যাকসন

তবে মার্সিকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়েছে লাল রং নিয়ে। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘থ্রিলার’ অ্যালবামের দুই গান—‘থ্রিলার’ ও ‘বিট ইট’ পুরোপুরি উঠে এসেছে পর্দায়।

১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া মিউজিক ভিডিওতে মাইকেল জ্যাকসনকে দেখা গিয়েছিল লাল রঙের জ্যাকেটে। কিন্তু দুই গানের দুই লাল রং ছিল একেবারেই আলাদা।

‘বিট ইট’ গানের মিউজিক ভিডিওতে মাইকেল জ্যাকসন

মার্সি বলেন, ‘দুটি পোশাকের ডিজাইনার ছিলেন আলাদা, পোশাকের রং ডাই করার ধরনও ছিল আলাদা। কিন্তু এতটাই সূক্ষ্ম যে খালি চোখে খুব একটা পার্থক্য বোঝা যায় না। কিন্তু দুই গানের দুই সেটিংয়ে ছিল আকাশপাতাল তফাত। তাই রঙের এই সূক্ষ্ম পার্থক্যও আমাকে ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে। এমনকি চাঁদের আলোয়, স্টুডিও লাইটের নিচে বর্তমান সময়ে কাপড়টি কেমন দেখায়, সেটাও খুঁটে খুঁটে দেখতে হয়েছে।’

মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে এত প্রত্যাশা, এত আয়োজন ব্যর্থ হয়নি একেবারে। সমালোচকদের রিভিউ ‘আশানুরূপ’ না হলেও ভক্তদের কাছে ‘মাইকেল’ সিনেমা বেশ ভালোভাবে উতরে গেছে।

অনেকেরই মন্তব্য, প্রথম দেখায় যেন মনে হয়েছে পর্দায় সত্যিকারের মাইকেল উঠে এসেছেন। মার্সি রজার্সের পরিশ্রম সেদিক দিয়ে সফল নিঃসন্দেহে।

সূত্র: পিপল ম্যাগাজিন