
স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের একটা বড় অংশ স্টুডিওতে কাটে। এ ধারণায় একটা বড় ধাক্কা হয়ে এসেছিল করোনা। থিওরির পড়ালেখা নাহয় অনলাইনে চলে। সফটওয়্যার আর অনলাইন প্রেজেন্টেশন—তা-ও নাহয় হলো। কিন্তু স্টুডিওতে নানা প্রকল্পের কাজ, নকশা করা, মডেল বানানো—এসব?
অবশেষে মহামারির প্রকোপ কাটিয়ে আবার পুরোনো রূপে ফিরেছে স্থাপত্য বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রদর্শিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের তৈরি নানা প্রকল্প। থিমগুলোও চমকপ্রদ। কেউ নাম দিয়েছে ‘এন্ড অব টার্ম’। কেউ বলছে ‘থ্রেশহোল্ড, ট্রানজিশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’। কারও থিম ‘ফার্স্ট স্টেপ টুওয়ার্ড আর্কিটেকচার’।
এন্ড অব টার্ম নামের প্রদর্শনীটির আয়োজক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ। প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে পঞ্চম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থীদের প্রকল্প নিয়ে এই আয়োজন। ২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনী চলেছে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। মূলত শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতেই এ আয়োজন করে বুয়েট স্থাপত্য বিভাগ।
উৎসবের উদ্বোধন করে বুয়েটের উপাচার্য সত্যপ্রসাদ মজুমদার বলেন, ‘এই যে পদ্মা সেতু হলো, কেমন হবে সেতুর দুই প্রান্তের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, তা নির্ধারণ করতে এগিয়ে আসতে হবে স্থপতি, নগর–পরিকল্পনাবিদ ও সরকারকে।’ তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের তৈরি প্রকল্পগুলোর এই প্রদর্শনী সব শ্রেণির মানুষেরই ঘুরে দেখা উচিত। তাহলে ছাত্রছাত্রীদের ভাবনাগুলো কাগজে আর ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে আটকে না থেকে হয়তো বাস্তবায়নের পথে এগোবে।
বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিলা হক বলছিলেন, ‘কোভিডের জন্য একটা দীর্ঘ সময় আমরা অনলাইন ক্লাস করেছি। অনেকটা সময়ই আমাদের ফিজিক্যাল মডেল বানানো বা প্রদর্শন করা সম্ভব ছিল না। কোভিড–পরবর্তী সময়ে এ রকম একটা প্রদর্শনী খুব দরকার ছিল। অনেক গণ্যমান্য স্থপতি এসেছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে ও শিখতে আগ্রহ জাগিয়েছে।’
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় স্থাপত্যের উৎসবটি হলো গত জুলাই মাসের শেষে। আয়োজক স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এসইউবি) স্থাপত্য বিভাগ। পাঁচ দিনের এ উৎসবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারি সেজেছিল এসইউবির শিক্ষার্থীদের স্থাপত্যশিল্পে। ‘থ্রেশহোল্ড, ট্রানজিশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ থিমে শিক্ষার্থীদের প্রকল্পের প্রদর্শনী ছাড়াও এ উৎসবে ছিল আরও নানা আয়োজন।
প্রদর্শনীর প্রথম দিনে আগা খান পুরস্কারপ্রাপ্ত স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের বক্তব্য ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এদিনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ নূরুল হুদা, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য আনোয়ারুল কবির, স্থাপত্য বিভাগের উপদেষ্টা স্থপতি শামসুল ওয়ারেস, স্থাপত্য বিভাগের প্রধান সাজিদ বিন দোজা প্রমুখ।
উৎসবের তৃতীয় দিনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত হয় ‘ডিজাইন শ্যারেটে’, যেখানে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন৷ এ যেন ছিল স্থাপত্য শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতে নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
স্থপতি শামসুল ওয়ারেস বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতেই এই প্রদর্শনী। আমাদের কাজগুলো কতখানি ভালো হচ্ছে এবং হবে, নির্ভর করে সরকারের সদিচ্ছা, সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা এবং স্থপতিদের কঠোর পরিশ্রমের ওপর।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সাউথ একাডেমিক ভবনের নবম তলায় স্থাপত্য বিভাগের বিশাল ঘরটিতেও এখন প্রদর্শনী চলছে। ‘ফার্স্ট স্টেপ টুওয়ার্ড আর্কিটেকচার’ শিরোনামে দশমবারের মতো আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে এনএসইউর স্থাপত্য বিভাগে সদ্য নাম লেখানো নবীনদের নানা রকম কাজ। মূলত নবীনদের উৎসাহ দিতেই নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ এই আয়োজন করে। স্থাপত্যকর্মগুলো নিয়ে দিনব্যাপী চলে আলোচনা, মতবিনিময়। ৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হবে আজ।
স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগই আয়োজন করে এ ধরনের উন্মুক্ত প্রদর্শনী। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। আসেন অভিভাবকেরা। শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ নিয়ে তুলে ধরেন তাঁদের সৃজনশীল সব প্রকল্প।