পবিত্র রমজান মাস এলে ইফতারের সময় টেবিলে যে খাবারটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, সেটি হলো মুড়ি। ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, জিলাপি—সব কিছুর সঙ্গেই মুড়ির দারুণ বন্ধুত্ব। অনেকের কাছে তো ইফতারি মানেই মুড়িমাখা। কিন্তু দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর এই মুড়ি কি সত্যিই শরীরের জন্য ভালো? নাকি এতে লুকিয়ে আছে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি?

এক কাপ (প্রায় ১৪ গ্রাম) মুড়িতে গড়ে পাওয়া যায়—
ক্যালরি: ৫৬ কিলোক্যালরি
প্রোটিন: ০.৯ গ্রাম
শর্করা: ১২.৬ গ্রাম
ফাইবার: ০.২ গ্রাম
চর্বি: ০.১ গ্রাম
আয়রন ও বি-ভিটামিন (বি৬, নিয়াসিন): অল্প পরিমাণে
দেখা যাচ্ছে, মুড়িতে ক্যালরি ও চর্বি খুব কম। একই সঙ্গে ফাইবার ও প্রোটিনও সামান্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুড়ির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) খুব বেশি, প্রায় ১০৫। অর্থাৎ এটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে যায়।
সারা দিন না খেয়ে থাকার পর শরীর দ্রুত শক্তি চায়। মুড়ির শর্করা দ্রুত ভেঙে শক্তি জোগায়, তাই ইফতারের শুরুতে অল্প পরিমাণ মুড়ি খেলে তাৎক্ষণিক এনার্জি পাওয়া যায়।
কিন্তু সমস্যা হলো—
মুড়িতে ফাইবার ও প্রোটিন কম থাকায় এটি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ক্ষুধা লাগে। আবার রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে পরে দ্রুত কমে গেলে ক্লান্তি, ঝিমুনি, মাথা হালকা লাগার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তাই মুড়ি খাওয়া যাবে, তবে শুধু মুড়ি নয়, আর পরিমিত পরিমাণে।
অনেকের ধারণা, মুড়ি খেলেই ওজন কমে। বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। মুড়িতে ক্যালরি কম, তাই অল্প পরিমাণে খেলে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু ফাইবার ও প্রোটিন কম থাকায় এটি দ্রুত ক্ষুধা বাড়ায়। ফলে পরে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ভালো উপায়
ইফতারিতে মুড়ি রাখুন ১–২ কাপের মধ্যে এবং সঙ্গে রাখুন—
শসা, টমেটো, পেঁয়াজ
ছোলা বা বাদাম
দই
এতে পেট ভরবে, রক্তে শর্করাও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য মুড়ি সবচেয়ে বেশি সতর্কতার বিষয়। কারণ, মুড়ির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অত্যন্ত বেশি, যা রক্তে শর্করার হঠাৎ স্পাইক ঘটাতে পারে।
যদি খেতেই হয়—
একবারে আধা কাপের বেশি নয়
অবশ্যই সঙ্গে প্রোটিন (ডিম, পনির, দই) বা স্বাস্থ্যকর চর্বি (বাদাম, চিনাবাদাম)
খালি পেটে একেবারেই নয়
শুধু মুড়ি খেলে সমস্যা, কিন্তু সঠিক খাবারের সঙ্গে মিশলে এটি হয়ে উঠতে পারে স্বাস্থ্যকর ইফতারির উপাদান।
ভালো ‘কম্বিনেশন’ হতে পারে—
প্রোটিন ও ভালো চর্বি: ছোলা, চিনাবাদাম, কাজুবাদাম
হজমে সহায়ক প্রোবায়োটিক: দই
ফাইবার ও ভিটামিন: শসা, টমেটো, পেঁয়াজ, ধনেপাতা
ওজন নিয়ন্ত্রণ বা সাধারণ স্বাস্থ্যের জন্য: ১–২ কাপ
ডায়াবেটিস থাকলে: সর্বোচ্চ আধা কাপ
শরীরচর্চা বা ভারী কাজের আগে: ২–৩ কাপ (তবে সঙ্গে প্রোটিন ও চর্বি থাকা জরুরি)
এর বেশি খেলে শরীরে পুষ্টির তুলনায় শর্করাই বেশি ঢুকে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
খালি পেটে মুড়ি খাওয়া সাধারণত ভালো নয়। এতে রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে গিয়ে পরে দ্রুত কমে যায়, ফলে দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে যাঁদের আছে—
ডায়াবেটিস
রিঅ্যাকটিভ হাইপোগ্লাইসেমিয়া
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা পিসিওএস
তাঁদের জন্য খালি পেটে মুড়ি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
সাধারণভাবে পপকর্ন মুড়ির চেয়ে স্বাস্থ্যকর। কারণ এতে—
ফাইবার অনেক বেশি
প্রোটিন প্রায় দ্বিগুণ
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম
তবে মুড়ির সুবিধা হলো, ক্যালরি খুব কম এবং আমাদের ঐতিহ্যবাহী ইফতার–সংস্কৃতির অংশ।
অর্থাৎ ফাইবার ও পুষ্টির জন্য পপকর্ন ভালো; আর হালকা, কম ক্যালরির দেশি নাশতা হিসেবে মুড়ি বেছে নিতে পারেন।
মুড়ি আমাদের ইফতারির অংশ হয়ে গেছে। একে বাদ দেওয়ার দরকার নেই। তবে পরিমাণ ও সঙ্গী খাবারের দিকে নজর রাখলে মুড়ি হতে পারে হালকা, উপভোগ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত ইফতারির উপাদান।
সূত্র: নিউট্রিস্ক্যান