
বাড়ির কিশোরী মেয়েটি প্রতি মাসের নির্দিষ্ট দিনে স্কুল বা কলেজে যেতে পারে না। কারণ, ঋতুচক্রের নির্দিষ্ট দিনগুলোয় শুরু হয় অসহ্য পেটব্যথা। এর সঙ্গে কারও কারও অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণও হয়।
অনেক সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা বিষয়টি জানেন ও বোঝেন; তবে বেশির ভাগ সময় তাঁদের কাছে লুকিয়ে রাখা হয় সামাজিক ও লোকলজ্জার ভয়ে।
প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ের এ ব্যথা বাড়তে বাড়তে একসময় নৈমিত্তিক ব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে কারও কারও সব সময় তলপেটে ব্যথা থাকে, পায়খানা–প্রস্রাব করতে কষ্ট হয়।
বিয়ের পর দেখা দেয় আরেক সমস্যা—সহবাসে কষ্ট। এমনকি এই রোগ থেকে হতে পারে বন্ধ্যত্ব, বরণ করতে হয় সামাজিক অপবাদ। রোগটির নাম এন্ডোমেট্রিওসিস।
মেয়েদের জরায়ুর একদম ভেতরের যে আস্তর (এন্ডোমেট্রিয়াম) তা মাসিকের রক্তক্ষরণের সঙ্গে প্রতি মাসে বের হয়ে আসে। কখনো কখনো তা নিচের দিকে বের না হয়ে উল্টো দিকেও প্রবাহিত হতে পারে।
ফেলোপিয়ান টিউব দিয়ে জরায়ু ও এর আশপাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে একধরনের ঘন আঠালো নিঃসরণ হিসেবে জমা হয়। আশপাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একটি অপরটির সঙ্গে জোড়া লাগে, যাকে বলে এডহেসন। পরে ডিম্বাশয়ে সিস্ট তৈরি হয়। একে এন্ডোমেট্রিওটিক সিস্ট বা চকলেট সিস্ট বলে।
এই তরলগুলো বের হতে না পেরে প্রদাহ তৈরি করে ও স্থায়ী ব্যথার কারণ হয়। এন্ডোমেট্রিওসিস যখন জরায়ুতে হয়, তখন একে এডেনোমায়োসিস বলে।
এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পর্কে কিছু তথ্য রোগীকে, প্রয়োজন হলে তাঁর অভিভাবককে অবশ্যই জানাতে হবে। এটা একটা ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ। তবে চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এটিকে বলা হয় রিকারেন্ট ডিজিজ মানে একবার ভালো হয়ে আবার হতে পারে। তাই কখনোই চিকিৎসায় অবহেলা করা যাবে না। এটা একটি প্রগ্রেসিভ ডিজিজ মানে ক্রমবর্ধমান। এই অসুখ ক্রমে বাড়তে থাকে এবং শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মার্চ মাস এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ নারী নীরবে এই ব্যথা বহন করে চলেছেন ও চিকিৎসার অভাবে জটিলতার শিকার হচ্ছেন। নারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
মাসিক চলাকালে তীব্র অসহনীয় ব্যথা হতে পারে এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রাথমিক লক্ষণ। উপসর্গ লুকিয়ে না রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে জটিলতা ও কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব।
ডা. শাহীনা বেগম, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা–বিশেষজ্ঞ, বিআরবি হাসপাতাল, ঢাকা