বছরের প্রথম বৃষ্টি নামলে বাঙালির মন স্বভাবতই উদাস হয়। গ্রীষ্মের ঠা ঠা রোদ্দুর আর খরতাপের পর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলে এখনো আমরা ‘পথের পাঁচালী’র অপু-দুর্গার মতো বৃষ্টিতে আপাদমস্তক ভিজতে চাই। অনেক দিনের পর বৃষ্টি নামলে মাটি থেকে যে সোঁদা গন্ধ উঠে আসে, তা আমাদের এখনো উতলা করে। প্রশ্ন হলো, বৃষ্টির পানি কি বিশুদ্ধ? বৃষ্টিতে ভিজলে কি অসুখ হতে পারে? বিজ্ঞান কী বলে?
বৃষ্টিতে ভিজলেই ঠান্ডা লাগবে—এ ধারণা আসলে ঠিক নয়। কারণ, বৃষ্টির পানিতে সাধারণত জীবাণু বা ভাইরাস থাকে না।
তবে দীর্ঘ সময় শরীর বা জামাকাপড় ভেজা থাকলে দেহের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে এই কম তাপমাত্রা। ফলে অসুখ হতে পারে।
গবেষকেরা বরং বলছেন—
প্রচণ্ড খরতাপের পর বৃষ্টি পরিবেশের দূষণ কমায়, বাতাসের জীবাণু পরিষ্কার করে।
বৃষ্টিতে ভেজা আমাদের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ দূর করতে সাহায্য করে, মুড ভালো রাখে, আনন্দ দেয়।
বৃষ্টির ফোঁটা পরিবেশে নেগেটিভ এয়ার আয়ন বাড়ায়, যা মানুষ ও প্রাণীর মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে প্রভূত আনন্দ অনুভূতির সৃষ্টি করতে পারে।
বৃষ্টিতে ভেজা প্রকৃতির সরাসরি সান্নিধ্য এনে দেয়, ফলে ভালো লাগার অনুভূতি বাড়ে।
বৃষ্টির পানি বাতাসকে দূষণমুক্ত করে, ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের আরাম বাড়ায়। ফুসফুস সতেজ করে।
ত্বক বা চুলের জন্যও বৃষ্টির পানি ততটা ক্ষতিকর নয়; কারণ, বৃষ্টির পানি সাধারণত কোমল, মানে এর পিএইচ ৫ থেকে ৬ এর মধ্যে; যা আমাদের ত্বকের কাছাকাছি। এ ছাড়া বৃষ্টির পানিতে ক্ষার বা খনিজ থাকে না বলে ত্বক বা চুলের তেমন ক্ষতি করে না।
তবে শহরের দূষিত আবহাওয়ায় অনেক সময় বৃষ্টির পানি বেশি ‘অ্যাসিডিক’ বা অম্লযুক্ত হয়ে যেতে পারে, যা ত্বকে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, বছরের প্রথম বৃষ্টিতে খানিকটা দূষণ থাকতে পারে, পরিবেশের বাতাস ও মাটি থেকে এই দূষণ মিশ্রিত হয়। তাই মৌসুমের একেবারে প্রথম বৃষ্টিতে না ভেজাই ভালো।
যদি বৃষ্টিতে ভেজেন, তবে—
বাসায় ফিরে প্রথমেই পরনের ভেজা পোশাকটা পাল্টে নেবেন। অনেকক্ষণ ভেজা কাপড় গায়ে থাকলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে, শরীরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে।
সবচেয়ে ভালো হয় যদি বৃষ্টিতে ভেজার পর বাসায় ফিরে উষ্ণ পানিতে গোসল করে নিতে পারেন। এতে মানসিক চাপ আরও কমবে, আনন্দের অনুভূতি বাড়বে।
মাথা, চুল ও ত্বক শুকিয়ে নিয়ে ভালো একটি ময়েশ্চারাইজার মেখে নিতে হবে।
ব্যস, দেখবেন, আপনি আগের চেয়ে আরও বেশি ফুরফুরে।
শহরের মায়েরা শিশুদের বৃষ্টিতে ভিজতে দিতে চান না মোটেও; ঠান্ডা লেগে যাবে এই ভয়ে। কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজা আসলে মোটেও খারাপ কিছু নয়।
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এলে এবং বজ্রপাতের ঝুঁকি না থাকলে দুরন্ত শিশুকে ঘরে আটকে না রাখাই ভালো। কারণটা ছেলেবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথের ছড়াতেই আছে—
‘ঘরেতে দুরন্ত ছেলে
করে দাপাদাপি,
বাইরেতে মেঘ ডেকে ওঠে—
সৃষ্টি ওঠে কাঁপি।
মনে পড়ে মায়ের মুখে
শুনেছিলেম গান—
“বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর,
নদেয় এল বান!”’