রমজান মাসে রোজা রাখা ইবাদত। তবে রোজা শুরুর আগেই স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে বিরূপ প্রভাব এড়ানো যায়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, কিডনির রোগ, ক্যানসার ও স্নায়ুরোগের মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য রোজা রাখা একটি চ্যালেঞ্জ। সঠিক পরিকল্পনা, ওষুধের সমন্বয় ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে এই চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন এমন রোগীদের জন্য রোজা রাখার মূল চাবিকাঠি হলো ‘সতর্কতা ও সচেতনতা’।
দেশে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, কিডনির রোগ, ক্যানসার ও স্নায়ুরোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারে এক বা একাধিক অসংক্রামক রোগী আছেন। এসব রোগীর জন্য নির্দিষ্ট খাবার ও খাওয়ার সময় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও ওষুধ খাওয়ার সময়। রমজান মাসে সময়শৃঙ্খলা অন্যান্য মাসের মতো নয়। এ মাসে সঠিকভাবে তা সমন্বয় করতে হয়।
কোন রোগে কী সতর্কতা
ডায়াবেটিক রোগীদের প্রধান ঝুঁকি হলো রক্তে শর্করার আকস্মিক ওঠানামা। দ্রুত চিনি বাড়ায় এমন খাবারের বদলে ইফতারে জটিল শর্করা ও আঁশযুক্ত খাবার রাখা জরুরি। ডায়াবেটিস–বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তের শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা করা রোজার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অন্যদিকে হৃদ্রোগে ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শরীরে লবণ (সোডিয়াম) নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। হৃদ্রোগ–বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইফতারে ডুবোতেলে ভাজা খাবারের পরিবর্তে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত মাছ, বাদাম ও ডাবের পানি হৃদ্যন্ত্রের জন্য সহায়ক। সঠিক খাদ্যাভ্যাসে রোজা রাখলে শরীরের ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ উল্লেখযোগ্য হারে কমে।
কিডনির রোগীদের জন্য পানি ও ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে যাঁদের ক্রিয়েটিনিন বেশি, তাঁদের জন্য দীর্ঘ সময় পানিশূন্য থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পটাশিয়াম ও ফসফরাসযুক্ত খাবার (যেমন বড় কলা, ডাল বা কোল্ড ড্রিংকস) এড়িয়ে চলা কিডনির রোগীদের জন্য বাধ্যতামূলক।
মৃগী বা মাইগ্রেনের মতো স্নায়ুরোগে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সাহ্রিতে পর্যাপ্ত জটিল শর্করা ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ করা উচিত, যাতে মস্তিষ্কে গ্লুকোজ সরবরাহ সচল থাকে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা-কফি) পানিশূন্যতা ও স্নায়বিক অস্থিরতা বাড়িয়ে মাথাব্যথার উদ্রেক করতে পারে।
ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা সম্পূর্ণ নিভ৴র করে তাঁদের থেরাপির অবস্থার ওপর। কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি চলাকালে রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে করণীয় ঠিক করবেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।
সাধারণ খাদ্যতালিকা
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ করা একটি আদর্শ খাদ্যতালিকায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো প্রাধান্য দেওয়া উচিত: ইফতার: ১-২টি খেজুর, লেবুর শরবত (চিনি ছাড়া), পাতলা সবজি খিচুড়ি বা ওটস এবং টক ফল। ডুবোতেলে ভাজা পেঁয়াজু, বেগুনি বা জিলাপি সম্পূর্ণ বর্জনীয়।
সাহ্রি: লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি, মুরগি বা মাছ এবং প্রচুর সবজি। সাহ্রিতে ওটস বা দই-চিড়া দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে এবং শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
রাতের খাবার: হালকা ও সহজপাচ্য খাবার। প্রচুর সালাদ এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন নিশ্চিত করতে হবে। যেন শরীরের ক্ষয় পূরণ হয়।
ওষুধের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ
রোজার সময় ওষুধের সময়সূচি পরিবর্তন ও সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ কোন সময় (সাহ্রি বা ইফতার) খেলে ঝুঁকি কম থাকে, সেটিই মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। যেমন বিশেষজ্ঞরা বলেন, থাইরয়েডের ওষুধ সাহ্রি খাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে খালি পেটে খাওয়া উচিত। আবার ডায়াবেটিসের ইনসুলিন বা ওষুধ ইফতারের ঠিক আগে বা খাবারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে, যেন হাইপোগ্লাইসেমিয়া না হয়।
চিকিৎসকের পরামর্শই চূড়ান্ত
রোজা থাকার কারণে প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যেতে পারে, কারও কারও তীব্র মাথাব্যথা বা বুকব্যথা অনুভূত হতে পারে, কারও হঠাৎ প্রচণ্ড ঘাম ঝরতে পারে। অন্যদিকে কেউ চোখে ঝাপসা বা কারও খিঁচুনি শুরু হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও ওষুধের নিয়ম মেনে চললে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও নিরাপদে রমজানের কল্যাণ লাভ করতে পারেন।