মাইগ্রেনের ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেশি থাকে যে স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যথা শুরু হলে কড়া ডোজের ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাকেন অনেকে। তবে করণীয় কেবল এতটুকুই নয়, বরং জীবনধারার কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে আপনি এমন সমস্যা কমিয়ে আনতে পারবেন অনেকটাই। কদিন পরপরই ভুগতে হবে না। এ প্রসঙ্গে ঢাকার ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান-এর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম।

মাইগ্রেনের ব্যথা হলে যদি আপনি ওষুধ খান, সেটি সাময়িক স্বস্তি দেয়। তবে তা মূল সমাধান নয়। তাই ব্যথা ফিরে আসে বারবার। মাথাব্যথা হওয়ার অর্থ হলো মস্তিষ্কের কোষগুলোর জন্য মস্তিষ্কের ভেতরের পরিবেশটা ভারসাম্যের মধ্যে থাকছে না। ব্যথাটাকে এই ভারসাম্যহীনতার একটা সংকেত হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।
আপনি সে সময় নীরব একটা অন্ধকার ঘরে শুয়ে থেকে স্বস্তি পান। কারণ, তাতে মস্তিষ্কের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। গোটা জীবনধারাতেই এমন কিছু বিষয় আছে, যেসবে খেয়াল রাখলে এই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। এর ফলে মাথাব্যথা প্রতিরোধ করা সহজ হয়ে ওঠে।
আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোয় পানির ভারসাম্য ঠিক রাখা খুব জরুরি। আর এর জন্য কেবল পানি খাওয়াই যথেষ্ট নয়। দেহের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু খনিজ উপাদানের ঘাটতি হলেও কোষে পানির ভারসাম্য ঠিক থাকে না। আর সে কারণেও হতে পারে মাথাব্যথা।
ধরা যাক, আপনি অতিরিক্ত ঘামছেন। ঘামের সঙ্গে যে লবণ বেরিয়ে গেল, তার ঘাটতি যদি আপনি পূরণ করতে না পারেন, তাহলে কিন্তু মুশকিল। সুস্থ থাকতে রোজকার পানীয়র পরিমাণ এবং পানীয়র ধরন বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত ঘাম হলে সামান্য লবণমেশানো পানীয় খান। এমন পরিস্থিতিতে খেতে পারেন ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিংকও। বমি কিংবা পাতলা পায়খানা হলে সঠিক নিয়মে ওরস্যালাইন খান।
আবার উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণ করলেও মাইগ্রেনের ব্যথায় ভুগতে পারেন আপনি। তাই চা, কফি কিংবা চকলেটমেশানো পানীয় কম খাওয়া ভালো। চায়ের চেয়ে কফিতে ক্যাফেইনের মাত্রা বেশি। তবে আপনার যদি কফিই পছন্দ হয়, তাহলে ডিক্যাফ কফি খেতে পারেন। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্যন্ত্রের বৈকল্য (হার্ট ফেইলিউর) বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ থেকে থাকলে পানীয়র পরিমাণ ও ধরন বিষয়ে চিকিৎসকের কাছে জেনে নেওয়া ভালো।
খাবারদাবার থেকেও আমরা খনিজ উপাদান পাই। ম্যাগনেশিয়াম এমনই এক উপাদান, এর অভাবে মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়তে পারে। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা আবশ্যক। সবুজ শাক, গোটা শস্য, নানান রকম বাদাম, ডাল ও অন্যান্য বীজ, ডার্ক চকলেট প্রভৃতি থেকে ম্যাগনেশিয়াম পাবেন।
তবে কিছু খাবার খেলে আবার কারও কারও মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়তে পারে। চকলেট, পুরোনো পনির, প্রক্রিয়াজাত মাংস, গাঁজানো খাবার, টক ফল, টেস্টিং সল্ট কিংবা অন্য কোনো কিছুর কারণে ব্যথা হচ্ছে কি না, তা আপনি খেয়াল করলে নিজেই বুঝতে পারবেন।
যে খাবারে আপনার সমস্যা হয়, কেবল সেটিই এড়িয়ে চলুন। মাইগ্রেনের রোগীর জন্য নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা খুঁজে বের করে সব বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
একটানা লম্বা সময় না খেয়ে থাকতে নেই। তাতেও বাড়ে মাইগ্রেনের ব্যথা। লম্বা সময়ের জন্য বাইরে গেলে সঙ্গে রাখুন হালকা স্ন্যাকস।
যেসব খাবার খেলে হুট করে রক্তের সুগার বাড়ে, যেমন ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও মিষ্টি খাবার, এসব খেলেও মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়তে পারে। এ ধরনের খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো।
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠুন। রোজ অন্তত ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখুন। উজ্জ্বল আলো ও শব্দে যাতে ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। প্রয়োজনে চোখে বিশেষ ধরনের মাস্ক পরে নিন।
মানসিক চাপ থেকে বহু রোগের সূত্রপাত হয়। জীবনকে বরং সহজভাবে নিন। জীবন আদতে খুব সুন্দর এক উপহার। নিজের খুঁতগুলোকে মেনে নিন। অন্যের কথায় নিজের বিচার করবেন না।
সৎ থাকুন, প্রাণ ও পরিবেশের প্রতি মমতা প্রকাশ করুন। সৃজনশীল কাজের চর্চা করুন। ব্যায়াম করুন, যোগব্যায়ামও করতে পারেন।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিন, হাসুন। মনে রাখবেন, দুশ্চিন্তা করেও আপনি অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। তাই বৃথা চিন্তায় জীবন কাটিয়ে দেবেন না।
ডিজিটাল স্ক্রিনে জীবনকে বেঁধে ফেলবেন না। প্রয়োজনের বেশি সময় কাটাবেন না স্ক্রিনে। স্ক্রিন টাইম কমিয়ে সময়টাকে ভিন্নভাবে কাজে লাগান। তাতে ঘুমও ঠিক থাকবে, মানসিক চাপ সামলানোও সহজ হবে।
আর কাজের সময়ও একটানা ২০ মিনিটের বেশি সময় স্ক্রিনে ব্যয় করবেন না। অবশ্যই বিরতি নিন। বসা থেকে উঠুন। হাত-পা ও ঘাড়ের পেশি টান টান করুন।