ঈদে আমাদের পাতে সেমাই থাকা চাই-ই চাই। থাকে আরও বহু রকম মিষ্টান্ন। তবে মিষ্টি খাবার সবার জন্য ভালো নয়। এ ধরনের খাবার খাওয়ার সময় পরিমিতিবোধ থাকা আবশ্যক। এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ও পুষ্টিবিদ অধ্যাপক শম্পা শারমিন খান-এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম।

চিনিতে ক্যালরির পরিমাণ বেশি। মাত্র এক চা–চামচ চিনিতেই আছে ২০ ক্যালরি। আর চিনি এমন খাবার, যা রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায় খুব দ্রুত। এই শর্করা আবার রক্ত থেকে দেহের কোষেও ঢুকে যায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে।
তাই চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার অল্প সময় পরই ক্ষুধা লাগে। উৎসবের সময়টায় যেসব খাবারের আয়োজন করা হয়, সেসবের বেশির ভাগই উচ্চ ক্যালরিসম্পন্ন। মিষ্টি খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পর যদি আপনি সেসব খাবারের কোনোটা খেয়ে ফেলেন, তাহলে সারা দিনে মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যাবে।
উৎসবের সময় এমনিতেই রোজকার শরীরচর্চায় কিছুটা অনিয়ম হয়। এর ফলে বাড়তি ক্যালরি পোড়ানোও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করলে তা শরীরে জমা হবে মেদ হিসেবে। এভাবে ওজন বেড়ে যেতে পারে সহজেই। এ ছাড়া—
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে
রক্তনালির প্রাচীরে জমা হতে পারে খারাপ চর্বি
লিভারে চর্বি জমা হতে পারে
উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে
যেকোনো সুস্থ ব্যক্তি চিনির কারণে এসব সমস্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। আজকে যিনি বয়সে তরুণ, তিনি অবশ্য অতিরিক্ত চিনি খেয়ে কালকেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন না। তবে অদূর ভবিষ্যতে নিজেকে সুস্থ দেখতে চাইলে আজ থেকেই সচেতন হোন।
আর যাঁদের আগে থেকেই এ ধরনের কোনো সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। তাই তাঁদের সতর্ক থাকা খুবই জরুরি।
এ ছাড়া প্রি–ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যাঁদের দাঁতে ক্যাভিটি-জাতীয় সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। ‘এক দিন খেলে কিছু হবে না’—এ ধরনের কথার আদতে কোনো ভিত্তি নেই।
চিনির ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় রেখে কেউ কেউ চিনির বিকল্প খোঁজেন। মধু বা গুড় তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া হয়। তবে কোনোটাই আপনি ইচ্ছেমতো খেতে পারবেন না। কারণ, এসবের কোনোটিতেই ক্যালরির পরিমাণ কম নয়।
তবে এসব উপাদানের একটি ইতিবাচক দিক হলো, এসব কম পরিমাণে ব্যবহার করেও সুস্বাদু পদ তৈরি করা যায়। আর্টিফিশিয়াল সুইটনার বা কৃত্রিম চিনি অনেকেই খান। তবে এসবও রোজকার ব্যবহারের জন্য নয়।
উৎসবের সময়ও যেকোনো ব্যক্তিরই একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা উচিত। মিষ্টি খাবার খাবেন, তবে পরিমিত পরিমাণে। ধরুন, আপনি নেমন্তন্নে গেছেন। সেখানে একজনের জন্য পরিবেশিত মিষ্টান্ন আপনি ভাগ করে নিতে পারেন আপনার কাছের কারও সঙ্গে।
আর খাবার তৈরি করার সময় তাতে অতিরিক্ত চিনি দেবেন না। মিষ্টিমুখ করতে ফলের মিষ্টতা কাজে লাগাতে পারেন। টক দই দিয়ে সালাদ করতে পারেন। নানান রকম মসলা ব্যবহার করতে পারেন সালাদে। তাতে অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমবে। দোকানের মিষ্টান্ন এড়িয়ে চলাই ভালো।
অতিথি আপ্যায়নে অনেকেই রাখেন ‘ওয়েলকাম ড্রিংক’। গরমের সময় ঈদে এ ধরনের পানীয়ের আয়োজন আপনিও রাখতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, কোনো শরবত বা ওয়েলকাম ড্রিংকেও যেন চিনির পরিমাণ বেশি রাখা না হয়।
জিরাপানি বা টক দইয়ের তৈরি কোনো পানীয় রাখতে পারেন। একটু লবণ দিলে মিষ্টির চাহিদা কমে যায়। পানীয় অনুযায়ী অন্যান্য মসলাও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ছোটদের ক্ষেত্রেও চিনি কম গ্রহণ করার স্বাস্থ্যকর চর্চা গড়ে তোলা উচিত। তাহলে ভবিষ্যতে তার জন্যও চিনির স্বাদের হাতছানি থেকে নিজেকে বাঁচানো অনেকটাই সহজ হবে।