পরিবারের কোন কোন সম্পর্কে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে জেনে নিন

কারও মা কিংবা আপন বোনের স্তন ক্যানসার হলে ধরে নেওয়া হয় যে তাঁরও এই রোগের ঝুঁকি আছে। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক থাকা স্বজনদের মধ্যে অন্য কারও ক্যানসার থাকলেও কি এমন ঝুঁকির কথা বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান? ঝুঁকি থাকলে করণীয়ই-বা কী?

স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বোঝার সুবিধার্থে আত্মীয়তার ধরনগুলো জানা থাকা ভালো
ছবি: পেক্সেলস

কিছু রোগীর স্তন ক্যানসারের সঙ্গে জিনগত ব্যাপার জড়িত থাকে। এমনটা হলে ওই পরিবারের অন্য কারও মধ্যেও সেই জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে কেবল নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এই বাড়তি ঝুঁকি থাকে।

এ বিষয়ে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের অনকোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. অরুনাংশু দাস বলেন, ‘সব স্তন ক্যানসার বংশগত নয়। কিছু রোগীর স্তন ক্যানসারের সঙ্গে বংশগত জিনের সম্পর্ক থাকে। শুধু মায়ের দিকের ইতিহাস নয়—বাবার দিকের পারিবারিক ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বংশগত ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট জিন মা কিংবা বাবা—দুই দিক থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে আসতে পারে।'

আত্মীয়তার ধরন জানেন তো?

সব আত্মীয়ের সঙ্গে আপনার জিনগত বৈশিষ্ট্য একইভাবে মিলবে না। তাই স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বোঝার সুবিধার্থে আত্মীয়তার ধরনগুলো জেনে নেওয়া যাক।

  • ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ: মা-বাবা, আপন ভাইবোন ও নিজ সন্তান।

  • সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভ: আপন মামা, চাচা, খালা ও ফুফু। আপন ভাগনে-ভাগনি, আপন ভাতিজা-ভাতিজি। আপন দাদা-দাদি ও নানা-নানি। আপন নাতি-নাতনি। সৎভাই ও সৎবোন।

  • থার্ড ডিগ্রি রিলেটিভ: দাদা-দাদি ও নানা-নানিদের ভাইবোনেরা। আপন মামাতো, চাচাতো, খালাতো ও ফুফাতো ভাইবোন। প্রপিতামহ, প্রপিতামহী।

যাঁদের ঝুঁকি বেশি

  • ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভদের মধ্যে কোনো নারীর যদি ৪০ বছর বয়স হওয়ার আগে স্তন ক্যানসার হয়।

  • অন্তত একজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ এবং অন্তত একজন সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভের যদি যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার হয়।

  • অন্তত দুজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভের যদি যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার হয়।

  • অন্তত তিনজন সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভের যদি যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার হয়।

  • অন্তত একজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভের যদি দুই স্তনেই ক্যানসার হয় এবং প্রথম স্তন ক্যানসার যদি হয় তাঁর বয়স ৫০ পেরোনোর আগে।

  • দুজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ কিংবা একজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ ও একজন সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভের যদি যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার হয়।

ঝুঁকি কম হলেই কি নিরাপদ?

নিয়মিত শরীরচর্চা করুন

ধরা যাক, এই সাত ধরনের ঘটনার কোনোটাই আপনার পরিবারে নেই। তাহলে জিনগত কারণে আপনার স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কম। তারপরও কিন্তু নিজেকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ক্যানসারকে বলা হয় ‘মাল্টিফ্যাক্টরিয়াল ডিজিজ’, অর্থাৎ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানান ব্যাপার-স্যাপার। কেবল নির্দিষ্ট জিনের কারণেই কারও স্তন ক্যানসার হয় না। আবার জিনগত ঝুঁকি না থাকলেও অনেকেরই স্তন ক্যানসার হয়।

সুস্থ থাকতে সবার জন্য যা করণীয়

স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি এড়াতে ত্রিশের মধ্যেই প্রথম সন্তানধারণের চেষ্টা করুন
  • টাটকা খাদ্যপণ্য বেছে নিতে চেষ্টা করুন। পরিশোধিত (রিফাইন্ড) শস্যদানা, প্রক্রিয়াজাত মাংস, লাল মাংস, কোমল পানীয় ও অন্যান্য অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার বা পানীয় (আলট্রা প্রসেসড ফুড বা ড্রিংক) এড়িয়ে চলুন।

  • সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করুন অথবা অন্তত ৭৫ মিনিট ভারী ব্যায়াম (হাই ইনটেনসিটি এক্সারসাইজ) করুন।

  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

  • ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করুন।

  • ত্রিশের মধ্যেই প্রথম সন্তানধারণের চেষ্টা করুন। সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান।

  • হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি গ্রহণ করতে হলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন।

  • স্তনে নতুন গোটা, স্তনের আকার বা ত্বকের পরিবর্তন, নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া, নিপল থেকে অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ কিংবা বগলে গোটা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

  • প্রতি মাসে নিজের স্তন ও বগল পরীক্ষা করুন।

  • ৪০ বছর বয়সের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি স্ক্রিনিং করা উচিত। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে স্ক্রিনিংয়ের সময় ও ব্যবধান নির্ধারণ করা হয়।

  • পারিবারিক কারণে ঝুঁকি বেশি থাকলে ৩০ বছর বয়স থেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। প্রয়োজনে স্তনের এমআরআইও করাতে হতে পারে।

  • পরিবারে অল্প বয়সে স্তন ক্যানসার, একাধিক সদস্যের স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, পুরুষের স্তন ক্যানসার কিংবা একই ব্যক্তির দুই স্তনে ক্যানসার হলে জেনেটিক কাউন্সেলিং গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

  • দেশে এখন স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত জিন পরীক্ষার সুযোগ আছে। এসব জিনের মধ্যে বিআরসিএওয়ান ও বিআরসিএটু (শরীরের স্বাভাবিক জিন, যা ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামত করতে সাহায্য করে এবং কোষকে ক্যানসারে রূপান্তর হওয়া থেকে রক্ষা করে) সবচেয়ে পরিচিত।

    এ ছাড়া পিএএলবিটু, টিপিফাইভথ্রি, চেকটু, এটিএমসহ কিছু জিনের কারণে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জিন পরীক্ষার প্রয়োজন আছে কি না, তা চিকিৎসকই বলে দেবেন।