১০০ বছর বয়সী ডেভিড অ্যাটেনবরোর দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের ৪ রহস্য

৮ মে ১০০ বছরে পা দিয়েছেন প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের কিংবদন্তিতুল্য সম্প্রচারক ডেভিড অ্যাটেনবরো। তাঁর এই দীর্ঘায়ু ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার রহস্য কী? তিনি নিজে অবশ্য বিনয় করে বলেন, এটা স্রেফ ভাগ্য। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন অন্য কথা। তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শতায়ু হওয়ার রহস্য।

৮ মে ১০০ বছরে পা দিয়েছেন প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের কিংবদন্তিতুল্য সম্প্রচারক ডেভিড অ্যাটেনবরো
ডেভিড অ্যাটেনবরো

লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম দারুণ এক উপহার দিয়েছে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোকে। তাঁর শততম জন্মদিন উপলক্ষে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির এক বোলতার নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। নতুন এ প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে ‘অ্যাটেনবরোনকুলাস টাউ’।

‘প্ল্যানেট আর্থ, লাইফ অন আর্থ’ বা ‘দ্য প্রাইভেট লাইফ অব প্ল্যান্টস’-এর মতো ডকু সিরিজের মাধ্যমে তিনি আমাদের প্রকৃতির যে বিস্ময় ও সৌন্দর্য দেখিয়েছেন, এটি তারই একটি ছোট্ট স্বীকৃতি।

প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের এই কিংবদন্তিতুল্য সম্প্রচারক ৮ মে ১০০ বছরে পা দিয়েছেন। এই বয়সেও দিব্যি কাজ করে যাচ্ছেন। গত বছর ৯৯ বছর বয়সেও নেটফ্লিক্সের ‘সিক্রেট লাইভস অব ওরাংওটাং’ ডকুমেন্টারির জন্য সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে ডেটাইম এমি অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন।

পৃথিবীর যেসব অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি দিন বাঁচে, সেসব অঞ্চলকে বলে ‘ব্লু জোন’। মজার ব্যাপার, অ্যাটেনবরোর জীবনযাপনের সঙ্গে ওই ব্লু জোনের মানুষদের দারুণ মিল আছে। চলুন, জেনে নিই তাঁর সেই চমৎকার চারটি অভ্যাসের কথা, যা তাঁর শতায়ুর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

১. রেড মিটকে ‘না’

ডেভিড অ্যাটেনবরো পুরোপুরি নিরামিষভোজী নন, তবে তাঁর খাদ্যতালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি মাসের পর মাস কোনো রেড মিট খাইনি।’

অ্যাটেবরো মূলত ‘ফ্লেক্সিটারিয়ান ডায়েট’ মেনে চলেন। মানে ডিম, দুগ্ধজাত খাবার বা সামুদ্রিক মাছ পুরোপুরি ছাড়েননি, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরামিষ খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।

মাছ খাওয়ার এই অভ্যাস তাঁর দীর্ঘায়ু ও বৃদ্ধ বয়সে ভালো থাকার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্যামন, ম্যাকেরেল, টুনা বা সার্ডিনের মতো মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। আমাদের মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে এসব দারুণ সাহায্য করে।

২. প্রকৃতির সঙ্গে ১০ মিনিট

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে মাত্র ১০ মিনিট সময় কাটালে মানসিক চাপ কমে যায় এবং মন বেশ ফুরফুরে থাকে

আপনি যদি পার্ক, বন বা কোনো সবুজ জায়গায় থাকেন, তবে প্রকৃতির জাদু দেখতে খুব বেশি সময় লাগে না। অ্যাটেনবরো ‘কল অব দ্য ওয়াইল্ড’ নামে একটি পডকাস্টে দারুণ একটি পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সুযোগ পেলেই একটা খুব সাধারণ কাজ করবেন। কোথাও চুপচাপ বসে পড়ুন, একদম নড়াচড়া করবেন না এবং ১০টা মিনিট অপেক্ষা করুন। আমি নিশ্চিত, খুব দারুণ কিছু আপনার চোখে পড়বে।’

বিজ্ঞানও তাঁর এ কথার সঙ্গে একমত। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে মাত্র ১০ মিনিট সময় কাটালে মানসিক চাপ কমে যায় এবং মন বেশ ফুরফুরে থাকে। জাপানিদের ‘ফরেস্ট বাথিং’ ধারণাও ঠিক এমনই। বনের ভেতর দিয়ে চুপচাপ হাঁটা এবং বর্তমান মুহূর্তকে অনুভব করাই ফরেস্ট বাথিং। সঙ্গে কিন্তু কোনো ফোন বা গ্যাজেট থাকা চলবে না!

৩. জীবনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য

১৯৫২ সালে বিবিসির হয়ে কাজ শুরু করেছিলেন অ্যাটেনবরো। সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো অবসরে যাননি। নিজের কাজকে অসম্ভব ভালোবাসেন। ২০১৭ সালে ‘টাইমস’ পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘প্রকৃতি নিয়ে কেউ কখনো ক্লান্ত হতে পারে না। পা গুটিয়ে বসে থাকাটা তো খুব বোরিং, তাই না? আপনি কি বেলুনে চড়ে আল্পস পর্বতের ওপর দিয়ে উড়তে চাইবেন, নাকি বাড়িতে বসে ঝিমাবেন?’

অন্যান্য শতায়ু ব্যক্তিরাও ঠিক এমনটাই মনে করেন। যেমন ২০২৫ সালে ১০৩ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক চিকিৎসক হাওয়ার্ড টাকার বলেছিলেন, ‘অবসর হলো দীর্ঘায়ুর সবচেয়ে বড় শত্রু।’

জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপের বাসিন্দাদের অভিধানে অবসর বলে কোনো শব্দ নেই। এই জায়গাও ব্লু জোনের একটি অংশ। অবসরের বদলে তাঁরা ‘ইকিগাই’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এই শব্দের মানে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার একটি কারণ বা তাগিদ। ২০১৯ সালে ‘জামা’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনে একটি শক্তিশালী লক্ষ্য থাকলে তা আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করে। সমাজসেবা বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ জীবনের এই লক্ষ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। অ্যাটেনবরোর কাজের প্রতি এই ভালোবাসাই হয়তো তাঁকে এত দিন সুস্থ রেখেছে।

৪. প্রাণীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের মতে, পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটালে আমাদের শরীরে কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে

চিতার সঙ্গে বন্ধুত্ব থেকে শুরু করে গরিলা ছানার সঙ্গে খেলাধুলা, অ্যাটেনবরোর পুরো জীবনটাই কেটেছে প্রাণীদের একেবারে কাছাকাছি থেকে। আর প্রাণীদের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্কও তাঁর সুস্বাস্থ্যের অন্যতম কারণ।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের মতে, পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটালে আমাদের শরীরে কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এমনকি দূর থেকে বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ করা বা চিড়িয়াখানায় ওদের দেখলেও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানুষ প্রাণীদের কাছাকাছি গেলে একধরনের ভালোবাসা, পূর্ণতা ও ইতিবাচক অনুভূতি লাভ করে।

ডেভিড অ্যাটেনবরোর এই সাধারণ অথচ দারুণ অভ্যাসগুলো আমাদের সবার জন্যই শিক্ষণীয় হতে পারে। শতবর্ষী অ্যাটেনবরোর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে প্রকৃতিও আমাদের দুহাত ভরে ফিরিয়ে দেয়।

সূত্র: টুডে ডটকম