অনেকে মনে করেন, ব্যস্ত থাকা মানেই উৎপাদনশীল হওয়া; যত দ্রুত দিন শুরু করব, তত বেশি কাজ করতে পারব। কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্ক কোনো মেশিন নয় যে তাকে সারাক্ষণ চাপ দিলেই সে ভালো কাজ করবে। মস্তিষ্ক একটি জীবন্ত অঙ্গ, যার বিশ্রাম, ধীর শুরু এবং মনোযোগ ধরে রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট ছন্দ প্রয়োজন।
আমরা অনেকে সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিয়ে মুঠোফোনের নোটিফিকেশন দেখি, খবর পড়ি, তাড়াহুড়া করে নাশতা সারি, তারপর অফিস, ক্লাস বা কাজের চিন্তা শুরু করি। দিন শুরু হওয়ার আগেই মাথার ভেতর যেন একটি অদৃশ্য দৌড় শুরু হয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফোন, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া আর চাপের কারণে অনেক মানুষ সকাল ৯টার মধ্যেই তাঁদের মানসিক শক্তির বড় একটি অংশ খরচ করে ফেলেন। ফলে দিনের বাকি সময়টা তাঁর ক্লান্তিতে কাটে। যাঁদের ওপর গবেষণা হয়েছে, তাঁরা এই বিষয়গুলো জানার পর অনেকেই সকালবেলার কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করেছেন। চলুন, জেনে নিই সকালের কোন পাঁচটি অভ্যাস আমাদের ত্যাগ করা উচিত।
আজকাল সবারই সকালটা শুরু হয় মুঠোফোন হাতে নিয়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নোটিফিকেশন, খবরের শিরোনাম, সামাজিক মাধ্যমের লাইক-কমেন্ট—সব মিলিয়ে আমরা একধরনের ‘ডোপামিন বুফে’তে ডুবে যাই। ডোপামিন বুফে বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে আমরা একসঙ্গে অনেক ছোট ছোট আনন্দদায়ক কাজ করি, যেগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বারবার ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়।
কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার সময় মস্তিষ্ক আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। গভীর ঘুমের ডেলটা ও থিটা তরঙ্গ থেকে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে আলফা তরঙ্গে প্রবেশ করে। এটি একটি শান্ত, স্বচ্ছ ও সৃজনশীল মানসিক অবস্থা। অনেক সময় নতুন আইডিয়া, সমস্যার সমাধান বা পরিষ্কার চিন্তা এই সময়েই আসে। একে অনেকেই ‘আলফা ব্রিজ’ বলেন। আলফা ব্রিজ হলো ঘুম ও জাগরণের মাঝখানের সৃজনশীল সেতু। সমস্যা হলো, আমরা যখন ঘুম থেকে উঠেই ফোন দেখি, তখন এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি ভেঙে যায়। মস্তিষ্ক হঠাৎ করে তথ্য, শব্দ, প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনার মধ্যে পড়ে যায়। তখন মস্তিষ্ক শান্ত আলফা অবস্থা থেকে সরাসরি হাই-বেটা অবস্থায় চলে যায়। এই হাই-বেটা অবস্থা চাপ, উদ্বেগ ও তাড়াহুড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, সকালে নোটিফিকেশন সামলাতে গিয়ে একসঙ্গে অনেক কিছু করার চেষ্টা করলে সাময়িকভাবে মানুষের আইকিউ কমে যেতে পারে, যা এক রাত না ঘুমানোর মতো প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ দিনের শুরুতেই আমরা আমাদের মনোযোগের শক্তি কমিয়ে ফেলি।
আরও বড় সমস্যা হলো, দিনের শুরুতেই আমরা নিজের পরিকল্পনা দিয়ে দিন শুরু করি না, অন্যের চাহিদা দিয়ে শুরু করি। এ জন্য অনেকেই এখন দিনের প্রথম এক ঘণ্টা ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল থেকে দূরে থাকেন। একে অনেকে ‘৬০ মিনিট বাফার’ বলেন। এ সময় মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, চিন্তা পরিষ্কার হয়, মন শান্ত থাকে।
অনেকের সকালটা শুরু হয় কফি দিয়ে। অনেকের বিশ্বাস, ক্যাফেইন ছাড়া শরীর চালু হয় না। কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞান ও ঘুমবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, ঘুম থেকে উঠেই কফি খাওয়া আসলে শরীরের স্বাভাবিক জাগ্রত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে স্বাভাবিকভাবে কর্টিসল হরমোন নিঃসৃত হয়, যাকে অনেক সময় ‘অ্যালার্টনেস হরমোন’ বলে। এই কর্টিসলই আমাদের ঘুম ভাঙাতে, শরীরকে সক্রিয় এবং মনকে সতর্ক করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ শরীরের নিজস্ব একটি প্রাকৃতিক অ্যালার্ম সিস্টেম আছে।
এ সময় যদি আমরা কফি খাই, তাহলে ক্যাফেইন শরীরের এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে। ক্যাফেইন মূলত অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিকের কাজ বন্ধ করে দেয়। এই অ্যাডেনোসিনই আমাদের ক্লান্তির সংকেত দেয়। কিন্তু খুব সকালে ক্যাফেইন খেলে ক্লান্তি দূর হয় না, বরং শুধু কিছু সময়ের জন্য চাপা পড়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরে যখন ক্যাফেইনের প্রভাব কমে যায়, তখন জমে থাকা ক্লান্তি একসঙ্গে ফিরে আসে। অনেকেরই দুপুরে হঠাৎ ক্লান্তি লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে, সেটার একটি বড় কারণ এই খুব সকালে কফি খাওয়া।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা এখন পরামর্শ দেন যে ঘুম থেকে ওঠার অন্তত ৬০ থেকে ৯০ মিনিট পরে প্রথম কফি খাওয়া ভালো। এতে শরীরের স্বাভাবিক কর্টিসল চক্র ঠিকভাবে কাজ করতে পারে, শক্তি ধীরে ধীরে বাড়ে এবং দিনের মাঝামাঝি হঠাৎ ক্লান্তি নেমে আসে না।
একটি জনপ্রিয় ধারণা আছে, ‘ইট দ্য ফ্রগ’, অর্থাৎ দিনের শুরুতেই সবচেয়ে কঠিন কাজটা আগে শেষ করলে বাকি দিন সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু মস্তিষ্ক যেভাবে কাজ করে, বাস্তবতা সব সময় এত সরল নয়।
সময় সরলরেখায় চলে, কিন্তু শক্তি চক্রাকারে চলে। সকাল ৮টার সময় আপনার যে মানসিক শক্তি থাকবে, বেলা ২টার সময় সেটা থাকবে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের প্রথম সময়টায় মস্তিষ্ক বিশ্লেষণধর্মী বা চাপপূর্ণ কাজের জন্য নয়, বরং সৃজনশীল চিন্তা, নতুন আইডিয়া, পরিকল্পনা এবং সমস্যার নতুন সমাধান ভাবার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এ সময় মাথা তুলনামূলক পরিষ্কার থাকে, বাইরের চাপ কম থাকে, অবচেতন মনও তখন সক্রিয় থাকে। কিন্তু আমরা যদি দিন শুরু করি কঠিন কোনো কাজ বা হিসাব, সমস্যা, ঝামেলার কাজ দিয়ে, তবে মস্তিষ্কের ওপর শুরুতেই একধরনের মানসিক সংঘর্ষ বা ‘কগনিটিভ ফ্রিকশন’ তৈরি হয়। এতে মন দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় এবং দিনের বাকি সময় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্যই অনেকে দিনের প্রথম ২০ থেকে ৩০ মিনিট একটু ধীরে শুরু করেন। কেউ লেখালেখি করেন, কেউ ধ্যান করেন, কেউ দিনের পরিকল্পনা করেন যে আজ কী গুরুত্বপূর্ণ, কী করলে সত্যিই অগ্রগতি হবে।
সকালে মুঠোফোনে অ্যালার্ম বাজার পর অনেকেই চোখ বন্ধ রেখেই বলি—‘আর ৫ মিনিট বা ১০ মিনিট ঘুমাই।’ মনে করি, এতে শরীরটা আরও সতেজ হবে। কিন্তু বাস্তবে এই ছোট্ট অভ্যাসটিই দিনের শুরুটাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
স্নুজ বাটন চাপার পর আমরা আবার হালকা ঘুমে ঢুকে পড়ি। এতে শরীর নতুন একটি ঘুমের চক্র শুরু করতে চায়, যার স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ মিনিট। কিন্তু আমরা সেই চক্র সম্পূর্ণ করার আগেই আবার অ্যালার্মে জেগে উঠি। ফলে আগের চেয়েও গভীর ঘুমের স্তর থেকে হঠাৎ জেগে উঠতে হয়। এ অবস্থাটাকেই বলা হয় ‘স্লিপ ইনর্শিয়া (নিদ্রাজড়তা)’। স্লিপ ইনর্শিয়া হলো একধরনের ভারী ঝিমুনি, মাথা ঝাপসা ভাব, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া, কাজের গতি কমে যাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রভাব কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। অর্থাৎ দিনের শুরুতেই মস্তিষ্ক যেন পুরোপুরি জেগে উঠতে পারে না। ফলে আমরা ভাবি, আমরা একটু বেশি বিশ্রাম নিয়েছি, কিন্তু আসলে উল্টো—আমরা মস্তিষ্ককে আরও বিভ্রান্ত করে ফেলেছি।
এ জন্য অনেকেই এখন ‘ওয়ান-টাচ রুল’ মেনে চলেন। অর্থাৎ অ্যালার্ম বাজলে একবারেই উঠে পড়া। যদি স্নুজ বাটনে হাত দেওয়ার মতো জেগে থাকি, তাহলে বিছানা ছাড়ার মতোও জেগে আছি—এই মানসিকতাই ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। সকালের শুরুটা যদি স্থিরভাবে করা যায়, তাহলে সারা দিনের শক্তি ও মনোযোগও অনেকটাই বদলে যেতে পারে।
সাধারণত ব্রেড টোস্ট, সিরিয়াল বা কমলার জুসকে বলা হয় ‘সুষম নাশতা’। কিন্তু সকালে ব্রেন ফগ তৈরি করতে পারে এগুলো। আপনি যখন খালি পেটে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট ও তরল চিনি খাবেন, তখন রক্তে গ্লুকোজের বড় ধরনের উত্থান ঘটে। এই চিনি সরিয়ে ফেলতে আপনার শরীর সমপরিমাণ ইনসুলিন নিঃসরণ করে।
যেহেতু মস্তিষ্ক শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করে, তাই রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা এটি খুব দ্রুত অনুভব করে। রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে গেলে অর্থাৎ ‘সুগার ক্র্যাশ’ করলে আপনার মস্তিষ্ক আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই ‘হাইপোগ্লাইসেমিক স্ট্রেস’ তখন কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণ বাড়ায়, যাতে শরীর দ্রুত আরও জ্বালানি খুঁজে পায়। এর ফলে বিরক্তি, অস্থিরতা এবং মাথায় একধরনের ঝাপসা ভাব তৈরি হয়। এ রকমটা হলে একটি চিন্তাও ঠিকভাবে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকেই ব্রেন ফগ বলে।
এ কারণে এখন সকালে প্রোটিন ও ভালো ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার কথা বলা হয়—যেমন ডিম ও অ্যাভোকাডো। কারণ, রক্তে শর্করা যত স্থিতিশীল থাকবে, ততই মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল করটেক্স ভালোভাবে কাজ করবে।
শেষ কথা
আমরা অনেক সময় মনে করি, সকালে যত তাড়াতাড়ি এবং যত বেশি কাজ শুরু করা যায়, ততই আমরা এগিয়ে থাকব। কিন্তু বাস্তবে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে জাগিয়ে তোলা, তাকে প্রস্তুত করা।
সূত্র: মিডিয়াম