রোগের নামটি খটমটে—অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা। এটি একটি খাওয়াদাওয়া-সংক্রান্ত গুরুতর মানসিক ব্যাধি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি ওজন বেড়ে যাওয়ার তীব্র ভয়ে খাওয়াদাওয়া একেবারেই কমিয়ে দেন। ফলে ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে যায়।

মডেলরাই এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। অবশ্য মডেলদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গনের তারকা, নৃত্যশিল্পী, জিমন্যাস্ট, খেলোয়াড়, অভিনয়শিল্পীসহ যে পেশাদারদের সঙ্গে ‘বডি ইমেজ’-এর ধারণা গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত, তাঁরাও আক্রান্ত হন এই রোগে।
অ্যানোরেক্সিয়া সাধারণত কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে পুরুষ, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—সবারই হতে পারে।
অ্যানোরেক্সিয়ার কোনো একক কারণ নেই। সাধারণত বিভিন্ন জৈবিক, মানসিক, জিনগত ও সামাজিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে।
১. মানসিক কারণ
পরিপূর্ণতাবাদী (পারফেকশনিস্ট) স্বভাব, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধ কম থাকা, উদ্বেগ বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা, নিজের শরীর নিয়ে অসন্তোষ ইত্যাদি।
২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ
রোগা শরীরকে সৌন্দর্যের আদর্শ হিসেবে প্রচার; ফ্যাশন, মডেলিং, অভিনয় বা নাচের জগতে ওজন নিয়ে চাপ; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘পারফেক্ট’ শরীরের ছবি দেখে প্রভাবিত হওয়া; বন্ধু বা পরিবারের কাছ থেকে ওজন নিয়ে সমালোচনা ইত্যাদি।
৩. জৈবিক ও পারিবারিক কারণ
পরিবারে খাওয়াদাওয়া-সংক্রান্ত ব্যাধি বা মানসিক রোগের ইতিহাস, মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক উপাদানের (যেমন সেরোটোনিন) ভারসাম্যের পরিবর্তন ইত্যাদি।
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আছে ওজন বাড়ার প্রতি তীব্র ভয়; খুব কম খাওয়া বা খাবার এড়িয়ে চলা; নিজের শরীরকে বাস্তবের তুলনায় মোটা মনে হওয়া; ওজন কমাতে অতিরিক্ত ব্যায়াম; না খেয়ে থাকা বা অন্যান্য কঠোর পদ্ধতি অনুসরণ করা ইত্যাদি।
এই রোগ হলে—
বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) খুব কমে যায়
দ্রুত ওজন কমে যায়
দুর্বলতা ও ক্লান্তিভাব দেখা দেয়
সব সময় ঠান্ডা-কাশি লেগেই থাকে
অস্বাভাবিকভাবে চুল পড়ে
মাথা ঘোরে
নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের অনিয়ম হয়
মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয়
খাওয়া নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ দেখা দেয়
অরুচি, খাবারের প্রতি ভীতি জাগে
মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়
এসব ছাড়াও নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, কিডনির ক্ষতি, হাড়ক্ষয়, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি থেকে গুরুতর অপুষ্টিজনিত সমস্যা হতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
চিকিৎসায় সাধারণত কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে করা হয়—
পুষ্টিবিদের সহায়তায় স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফেরা।
পুষ্টি পুনরুদ্ধার (স্বাভাবিক ওজন ফিরিয়ে আনা)।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর কাউন্সেলিং।
পরিবারভিত্তিক থেরাপি।
প্রয়োজনে বিষণ্নতা বা উদ্বেগের চিকিৎসা।
অ্যানোরেক্সিয়া শুধু ওজন কমাতে চাওয়া বা শুকাতে চাওয়া নয়। এটি এমন একটি রোগ, যেখানে শরীর, খাদ্য ও আত্মপরিচয় সম্পর্কে মানুষের ধারণা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। তাই এটি পেশাদার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, এমন একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
সূত্র: হেলথলাইন