
কেবল ক্যানসার হলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশ পিছিয়েই থাকবে। সামাজিক পরিসরে ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে চলেছেন অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার। তিনি শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশনের সভাপতি। বিশ্ব ক্যানসার দিবসে প্রতিষ্ঠানটির নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন রাফিয়া আলম
শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশন কীভাবে শুরু হলো?
১৯৮৬ সাল থেকে ক্যানসার রোগীদের নিয়ে কাজ করছি। মানুষের কষ্টটা খুব কাছ থেকে দেখতাম। অনেক মানুষেরই ক্যানসারের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। নেই ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা। ক্যানসার অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে ক্যানসার সেরে যায়। এ দেশের মানুষকে এসব বিষয়ে সচেতন করে তোলার তাগিদ অনুভব করতাম। ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব বিষয়ে বলতে ও লিখতে শুরু করি। ২০০৮ সাল থেকে সামাজিক পরিসরে নানা সচেতনতামূলক আয়োজন শুরু করি। ক্যানসার-বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং সমাজকর্মীরা এই উদ্যোগের সঙ্গে ছিলেন। ক্যানসারজয়ী রোগী এবং তাঁদের স্বজনেরাও যুক্ত হন। পরে উদ্যোগটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এ জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল, অনুদান হিসেবে তা দিয়েছিলেন ক্যানসারজয়ী একজন নারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আখতারুন্নেসা চৌধুরী। তাঁকেই করা হলো সভাপতি। ২০১৫ সালে সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন পেলাম আমরা। সে বছরই এর নাম দেওয়া হয় শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশন। ২০১৭ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুরের হুমায়ূন রোডে একটি বাসায় শুরু হয় এর কার্যক্রম।
ফাউন্ডেশনটি কোন ধরনের কাজ করছে?
সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যের নানা দিক নিয়ে সচেতন করে তোলার কাজ করে শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশন। বিভিন্ন ক্যানসারের স্ক্রিনিং করা হয় এখানে। স্ক্রিনিং করতে এলে উচ্চতা, ওজন, কোমরের মাপ এবং পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাসের ভিত্তিতে তার ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কেও জানানো হয়। ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেওয়া হয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ওষুধের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে হলে আমরা সেখানে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হই যে রোগীর প্রয়োজন আদতেই সেখানে মিটবে কি না। ক্যানসার রোগীর একটু কথা শুনতে চাওয়া, হাতটা ধরে একটু সাহস জোগানো, একটু আন্তরিকভাবে সময় দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। চোখে চোখ রেখে কথা বললেও রোগী তাঁর শরীরের কষ্ট ভুলে একটু শান্তি পান। এই সেবাটুকু দিতে চেষ্টা করি আমরা। চিকিৎসা শেষে নিয়মিত ফলোআপেও আসেন আমাদের ৭০-৮০ শতাংশ রোগী। আমাদের অধিকাংশ রোগীই সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।
ফাউন্ডেশনের সঙ্গে এখন কারা যুক্ত আছেন?
ক্যানসার-বিশেষজ্ঞ, শল্যচিকিৎসক, দন্তরোগবিশেষজ্ঞ, সনোলজিস্ট, মেডিক্যাল অফিসার, নার্স—সবার সম্মিলিত প্রয়াসে চলছে আমাদের এই প্রতিষ্ঠান। ক্যানসারজয়ী মানুষ এবং তাঁদের স্বজনেরাও যুক্ত আছেন। ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে এখন প্রতিষ্ঠানটির মূল অফিস। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় আমাদের আরেকটি সেন্টার রয়েছে। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের আয়োজনও করা হয়।
কেউ কি চাইলে ফাউন্ডেশনের অসহায় রোগীদের আর্থিক সহায়তা করতে পারেন?
অনেকেই আর্থিক সহায়তা করে থাকেন। ক্যানসারজয়ী মানুষেরাও অন্য রোগীর জন্য আর্থিক সহায়তা দেন। কাপাসিয়ায় ক্যানসার হাসপাতাল এবং গবেষণাকেন্দ্র করার জন্য সাড়ে তিন বিঘা জমি নামজারি করে দিয়েছে মেঘুপ্রধান পরিবার। আর্থিক সহায়তা পেলে সেখানে এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব।
এবারের ক্যানসার দিবসে শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশনের আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাই।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল স্টুডেন্টস সোসাইটির সহযোগিতায় হচ্ছে এবারের আয়োজন। মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের পোস্টার ও ফটোগ্রাফির প্রতিযোগিতা থাকছে। আমাদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের স্তন ক্যানসার, জরায়ুমুখের ক্যানসার, কোলোরেক্টাল ক্যানসার ও মুখগহ্বরের ক্যানসার স্ক্রিনিং ও সচেতনতা বিষয়ে জানানো হবে। তাঁদের জন্য আরও থাকবে কুইজ। তথ্যচিত্রও প্রদর্শন করবেন তাঁরা।
একজন সুস্থ মানুষের জন্য ক্যানসার স্ক্রিনিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রাথমিক অবস্থায় অনেক ক্যানসারেরই তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু দেহের ভেতর নীরবে বাড়তে থাকে ক্যানসার। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসাপদ্ধতি অনেকটা সহজ হয়ে যায়। রোগীর শারীরিক জটিলতা কম হয়, চিকিৎসায় সাফল্যের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। তাই সুস্থ অবস্থাতেই নিয়মিত এসব পরীক্ষা করানো খুব জরুরি।