
হাম বা মিজলস একধরনের ভাইরাসজনিত রোগ। কিন্তু এই রোগ শিশুদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একটি আপাত সুস্থ শিশুও হাম হওয়ার পর অন্যান্য জটিলতা, যেমন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের সংক্রমণ, কান পাকা রোগ ইত্যাদিতে ভুগতে পারে। চোখের নানা সমস্যা হতে পারে হামের পর, হতে পারে মুখে ঘা। আর যদি কোনো শিশু আগে থেকেই অপুষ্টি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগে, তবে বিপদের আশঙ্কা আরও বেশি।
যেসব শিশু আগে থেকে অপুষ্টিতে ভুগছে
জন্মগত রক্ত রোগ, যেমন থ্যালাসেমিয়া ও রক্তশূন্যতায় ভুগছে
হাঁপানি, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার কারণে স্টেরয়েড–জাতীয় ওষুধ নিতে হয় যাদের
ক্যানসার আক্রান্ত, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিয়েছে, এমন শিশু
কিডনির রোগে আক্রান্ত
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত
যেসব শিশু হামের টিকাসহ অন্যান্য টিকা পায়নি
ওপরের রোগবালাইয়ে আক্রান্ত শিশু, বিশেষ করে যদি এক বছরের নিচে বয়স হয়, তবে হাম তাদের জন্য নানা ঝুঁকি ও জটিলতা বয়ে আনে। হামের ভাইরাস শিশুর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আক্রমণ করে এবং ইমিউন সিস্টেমের বি সেল, টি সেল, প্লাজমা সেল, মেমোরি সেল ও এলএলপিসি সেলকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শিশু অন্যান্য মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। এসব হলো—
নিউমোনিয়া: গবেষণা বলছে, প্রতি ২০ জনের একজন হাম আক্রান্ত শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। হাম আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ এটি।
এনকেফেলাইটিস: এক হাজার হাম আক্রান্ত শিশুর মধ্যে একজনের এনকেফেলাইটিস বা মস্তিষ্কে সংক্রমণ হতে পারে। এটি একটি মারাত্মক পরিস্থিতি। এতে শিশুর খিঁচুনি, মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, অচেতন হয়ে পড়া, বধিরতাসহ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
ডায়রিয়া: হাম আক্রান্ত শিশু জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না বলে প্রায়ই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। ফলে পানিশূন্যতা, লবণশূন্যতা হতে পারে এবং শিশুর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
কান পাকা ও মুখে ঘা: কানের সংক্রমণ, কান দিয়ে পুঁজ পড়া আরেক জটিলতা। এটি জটিল আকার ধারণ করলে বধিরতা, এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা হতে পারে। হামে আক্রান্ত শিশুর প্রায়ই মুখে ঘা দেখা দেয়। ফলে শিশু খেতে পারে না, যা অপুষ্টির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
চোখে সংক্রমণ: হাম থেকে শিশুর চোখে সংক্রমণ হতে পারে, কনজাংটিভাইটিস হয়, এমনকি রেটিনা বা কর্নিয়ার ক্ষতি হয়। চোখ থেকে পুঁজমিশ্রিত পানি পড়তে পারে। আবার ভিটামিন এ–র অভাব দেখা দেয়, যা থেকে চোখের শুষ্কতা, রাতকানা রোগ ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
অপুষ্টি: হাম হওয়ার কারণে বেশির ভাগ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হয়। ভিটামিন এ, আমিষ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। ওজন কমে যায়। এই ঘাটতি পূরণে দীর্ঘদিন লেগে যেতে পারে।
ইমিউন অ্যামনেশিয়া: হামের কারণে শিশুদের ইমিউন সিস্টেমের অর্জিত মেমোরি বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে ইতিপূর্বে যেসব রোগের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় ছিল, তা রীতিমতো ধসে পড়ে। একে বলে ইমিউন অ্যামনেশিয়া। এ কারণে পরবর্তী মাস বা বছরজুড়ে তাদের নানা রকম সংক্রমণ হতে থাকে এবং শিশুটি দীর্ঘদিন ভোগে।
ঝুঁকিতে আছে, এমন শিশুর জন্য বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।
নিউমোনিয়া: শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, পেট–বুক দ্রুত ওঠানামা করলে বুঝতে হবে নিউমোনিয়া হয়েছে। এসব শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করে অক্সিজেন এবং অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
চোখের সংক্রমণ: চোখ দিয়ে পুঁজমিশ্রিত পানি পড়লে পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত তুলা বা কাপড় ফোটানো পানিতে ভিজিয়ে চোখ পরিষ্কার করে দিতে হবে। জীবাণু প্রতিরোধী আই প্যাড ব্যবহার করা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে দৈনিক তিনবার টেট্রাসাইক্লিন অয়েন্টমেন্ট সাত দিন দেওয়া যেতে পারে। চোখ ভালো রাখতে দুই ডোজ ভিটামিন এ দিতে হবে। ছয় মাসের কম বয়সীদের ৫০ হাজার ইউনিট, ৬-১১ মাসে এক লাখ ইউনিট এবং ১২ মাস থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত দুই লাখ ইউনিট। প্রয়োজনে ২-৪ সপ্তাহ পর তৃতীয় ডোজ দেওয়া যাবে।
মুখে ঘা: পরিষ্কার লবণপানিতে মুখ ও জিব দিনে কয়েকবার পরিষ্কার করে দিতে হবে। এক কাপ ফোটানো পানিতে এক চিমটি লবণ দিয়ে এই দ্রবণ তৈরি করা যায়। মুখের ক্ষতে ২ শতাংশ জেনেসেন ভায়োলেট দিতে পারেন। দরকার হলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন।
ডায়রিয়া: ডায়রিয়া হলে মুখে বারবার স্যালাইন দিতে হবে, যাতে পানিশূন্যতা না হয়। বারবার বুকের দুধ পান করাতে হবে। চোখ কোটরে গেলে বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হবে।
এনকেফেলাইটিস: খিঁচুনি, নিস্তেজ হয়ে পড়া, ঘাড় শক্ত হয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা দিতে হবে।
অপুষ্টি: হাম আক্রান্ত শিশুর অপুষ্টি প্রতিহত করা খুব জরুরি। বয়স অনুযায়ী শিশুকে বারবার বুকের দুধ দিতে হবে। পুষ্টিমান বাড়াতে প্রয়োজনীয় ক্যালরি, বিশেষ করে আমিষ ও ভিটামিন ঘাটতি পূরণে সাপ্লিমেন্ট ও বিশেষ ব্যবস্থা লাগতে পারে।
কেবল ঝুঁকিপূর্ণ নয়, যেকোনো শিশুকেই এই আউট ব্রেকের সময় অসুস্থ, হাম বা জ্বর-র্যাশ আক্রান্ত অন্যান্য শিশু থেকে আলাদা রাখতে হবে। কমপক্ষে চার দিন। হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ডে আক্রান্ত শিশুকে রাখতে হবে।
পরিবারে বা বাড়িতে কারও হলে তার কাছ থেকেও শিশুকে আলাদা করে দিতে হবে। এমনকি পরিচর্যাকারীকেও দূরে রাখতে হবে।
আউট ব্রেকের সময় জনাকীর্ণ জায়গায়, ভিড়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিয়ে যাবেন না।
সংস্পর্শে আসা ছয় মাস ও তার বেশি বয়সী সব শিশুকে হামের টিকা দিতে হবে। যারা আগে নিয়েছে, তারাও নিতে পারবে, বিশেষ করে যারা সংস্পর্শে এসেছে।
সরকার ইতিমধ্যে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হামের টিকা দিয়ে দিতে হবে। আগে নিয়ে থাকলেও এটা সাপ্লিমেন্টারি ভ্যাকসিনেশন হিসেবে নিতে হবে। এ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি বা কুসংস্কারের অবকাশ নেই। শিশুর সুরক্ষায় কোনো বিকল্প পথ নেই।
অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ