
মানুষ সব সময়ই তাঁর নিজের ছোটখাটো বসতকে রং, নকশা আর নান্দনিকতা দিয়ে করতে চান অনন্য। আর সেই চাওয়া থেকেই বসতভিটার অন্দরসজ্জায় চোখে পড়ে নানান শৈলী। স্থাপত্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যেই অন্দরসজ্জার মান ও জীবনদর্শন নিহিত। এ ছাড়া স্থাপত্য নির্মাণের উদ্দেশ্য ও তার পটভূমি অন্তঃসজ্জার গঠনমূলক আকৃতিকে মুক্ত করে তোলে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন স্থপতি ও অন্দরসজ্জাবিদ মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমাদের অঞ্চলে অন্দরসজ্জায় মূলত ইউরোপীয় ধারা অনুকরণ করা হতো। যাকে আমরা ভিক্টোরিয়ান ও ক্ল্যাসিক্যাল ধারা হিসেবে জানি। আসবাব থেকে শুরু করে রং ও অন্যান্য উপকরণে সেই শৈলীর ছাপ দেখা যেত। আধুনিক এ সময়ে মানুষ সারল্য, মিনিমালিজম আর পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশবান্ধব জীবনধারাকে বেছে নিচ্ছেন। তাই এখন নিজের বসত বা অফিসের অন্দরসজ্জায় শোভা পায় মিনিমালিস্ট ও বিবিধ ব্যবহারোপযোগী আসবাব, প্রাকৃতিক আলোয় রঙিন হালকা নকশা, কিছুটা খোলা জায়গা এবং শিল্পদক্ষতার নিখুঁত কোনো সমন্বয়। সবচেয়ে আধুনিক অন্দরসজ্জা কার্যকর ও অনবদ্য হয় তখনই, যখন তা স্থাপত্য নির্মাণের সঙ্গে মানিয়ে যায়। অনেকেই মনে করেন, ভবনের নকশা করা, মৌলিক কাঠামোর বিন্যাস, কাঠামোগত অখণ্ডতা এবং বিল্ডিং কোড বা নিয়মকানুন বিবেচনায় নিয়ে কাজ শেষ করাই একজন স্থপতির কাজ; কিন্তু আমার স্থাপত্য নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতায় দেখছি, স্থাপত্যের বাহির ও অন্দরের সম্পর্ক যদি সূক্ষ্মভাবে একজন স্থপতি মিলিয়ে দেখেন, তাহলে অন্দরসজ্জার জন্য আলাদা করে ভাবতে হয় না।
স্থাপত্যকে দাঁড় করানোই শুধু স্থপতির কাজ নয়, ভবনের দর্শন আর অন্তঃসজ্জা নিয়েও সমানভাবে ভাবতে হয়। এতে ভবন আরও জীবন্ত, টেকসই ও নান্দনিক হয়। অন্দরসজ্জার মৌলিক বিষয়গুলো নকশার শুরু থেকেই স্থপতির ভাবনায় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
স্থানিক ভাবনা: কোনো ভবনের নকশা তৈরির সময়ই কক্ষের আকার-আকৃতি, অবস্থানগত দিকনির্দেশনা ও প্রাকৃতিক আলো–বাতাস সঞ্চালনের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ স্থানগুলো নির্ধারিত হয়। কোন জায়গায় আসবাব থাকবে, কোন জায়গা ফাঁকা থাকবে, এমনকি সেই ফাঁকা স্থানকেও কীভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়—শুরুতেই এসব ভাবনায় রাখেন স্থপতি। শুধুই অন্দরের কক্ষ নয়, বারান্দার সামনের দৃশ্যপট, বাগান, ছাদ, খোলা জায়গা—সবকিছুই বিবেচনা করতে হয়। কোনো বিশেষ স্থাপনায় যদি দ্বিতীয় কোনো ডিজাইনার অন্দরসজ্জার নকশায় যুক্ত হন, তবে তাদের ভাবনার সমন্বয়ও ঠিক এই পর্যায়ে শুরু হয়।
স্তরবিন্যাস: কোনো বাসা বা অফিসের অন্দরসজ্জার নকশায় লেআউটে বিভিন্ন স্তরের বিন্যাস করা একজন স্থপতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের আলাদা ভাগ থাকলে তা বসবাসকারীদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে। একইভাবে অফিসের ক্ষেত্রেও নকশায় যদি সর্বজনীন এলাকা এবং কাজের জায়গার আলাদা স্তর তৈরি করা হয়, তবে কাজের ক্ষেত্র আরও সুবিধাজনক ও কার্যকর হয়ে ওঠে।
টেক্সচার ও উপকরণ: ভবনের বসবাসযোগ্যতা বাড়াতে স্থপতি বিভিন্ন ধরনের টেক্সচার নিয়ে কাজ করেন। ঘরের যেকোনো স্থান যেমন মেঝে, দেয়াল ও ছাদ তৈরি করার ক্ষেত্রে অভিব্যক্তি ও স্পর্শের অনুভূতি স্থপতির নকশায় জায়গা পায়। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ও সহজলভ্য উপকরণ মৌলিক টেক্সচারে সব সময় প্রাধান্য পাওয়া উচিত। আমাদের দেশের উষ্ণ জলবায়ুতে প্রাকৃতিক আলো–বাতাস ঘরের ভেতরে আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধুনিকায়নের নামে অপ্রাসঙ্গিক অনুকরণ করা উচিত নয়। পাশ্চাত্যের পুরোনো ধাঁচ অনুকরণ করার প্রবণতা আমাদের আছে। ব্যবহারিক দিক চিন্তা না করে বেঠিকভাবে কাচের ব্যবহার ঘরের উষ্ণতা বাড়ায়। অতিরিক্ত প্যানেলিং মূলত প্রাকৃতিক সম্পর্কহীন স্থাপত্য। তাই এসব থেকে বের হয়ে আমাদের টেকসই পন্থায় আসতে হবে।
আলো: ভবনের ভেতর প্রাকৃতিক আলোর বিকল্প নেই। অন্দরসজ্জার মধ্যে প্রাকৃতিক আলোর আসা-যাওয়া স্থাপত্যের আসল সৌন্দর্যকে বিকশিত ও প্রাণবন্ত করে। ভলিউমজিরো লিমিটেড এবং সিম্পলট্রির সঙ্গে কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেসব থেকে মনে করি—ঢাকার তাপ, আর্দ্রতা, সূর্যের আলোর স্বল্পতা, কুয়াশা ও ধোঁয়ার মিশেল ভবনের অন্দরকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবে, তা নির্মাণের শুরু থেকেই মাথায় রাখা দরকার। আমরা অন্দরসজ্জাকেও আর্কিটেকচারের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করি।
রং: কোনো স্থাপনার নকশা ও অন্দরসজ্জায় রং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এটি কেবল অন্দরকে আকর্ষণীয় ও মনোরম করে না; বরং কার্যকারিতাও বৃদ্ধি করে। রং ভবনের গঠন, আলো-ছায়া ও পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে; একটি মনোমুগ্ধকর আবহ সৃষ্টি করে। তবে শুধু সজ্জার জন্যই নয়; রং ভবনের সুরক্ষা ও টেকসই হওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়ক। তাপনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সাদা রং বিশেষভাবে কার্যকর। আমাদের দেশে বিভিন্ন ঋতুর আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সংবেদনশীল ও প্রাসঙ্গিক রং ব্যবহার করার সচেতনতা লক্ষণীয়। পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য এটি এক প্রেরণাদায়ক উদাহরণ।
অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও নতুন প্রযুক্তি ভবনকে করে তোলে স্মার্ট। আর এই স্মার্ট ভবনগুলো পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের দিকে আমাদের আকৃষ্ট করছে। একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ প্রকৃতির আলো, বাতাস ও প্রাকৃতিক উপাদানকে নিজের বসবাসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চাইছে।
আমাদের দেশের সব ধরনের স্থাপনায় এখন পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্দরসজ্জায় দেশের জলবায়ুসহনশীল উপাদানগুলোর ব্যবহারকে বিশেষভাবে বিবেচনায় আনা উচিত। প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে এখন অনেক ইঞ্জিনিয়ার্ড উপকরণও সহজলভ্য এবং পরিবেশবান্ধব, যার এম্বেডেড কার্বন ফুটপ্রিন্ট কম। এতে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারও কমে আসে এবং ভবনগুলোও হয় আরও টেকসই।
বায়োফিলিক ডিজাইন বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রাকৃতিক উপাদানগুলো ঘরে অন্তর্ভুক্ত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এতে ভবনের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস, প্রাকৃতিক টেক্সচার এবং গাছপালা ও সবুজায়নকে কাছাকাছি রাখা হয়, যা বাসস্থানের সঙ্গে প্রকৃতির সংযোগকে দৃঢ় করে।
অফিস ও বাসায় আজকাল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। অটোমেশন, সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে ভবনগুলো এখন আরও শক্তিসাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও কর্মক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভবন তৈরির প্রথম ধাপ থেকেই অন্দরসজ্জাকে স্থাপত্যের সঙ্গে সমন্বিত করা হলে ঘটা করে বাড়তি অন্দরসজ্জার দরকার হয় না। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের জন্য বাহুল্য বর্জন জরুরি। যেমনটা স্ক্যান্ডিনেভীয় বা জাপানিজ স্থাপত্যশিল্পে চোখে পড়ে। আধুনিক প্রজন্মও তাই মিনিমাল ও বহুমাত্রিক ব্যবহারকেই প্রাধান্য দেয় বেশি। আসবাবের ক্ষেত্রেও এটাই লক্ষণীয়।
বাংলাদেশের আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশা ও নির্মাণকাজে যুক্ত থাকার সুযোগ আমার হয়েছে। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের স্থাপত্যশিল্পের পরিবর্তন ও বিকাশকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। স্মার্ট প্রযুক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পে আমি সব সময় প্রাকৃতিক উপাদানের গুরুত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। আমাদের অফিস ভলিউমজিরো আধুনিকতা ও পরিবেশবান্ধবতার সমন্বয়ে কাজ করে। এখানে আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করেও অন্দরকে প্রাকৃতিক উপাদান, সবুজায়ন ও গাছপালার সঙ্গে জুড়ে দিই। ফলে বসবাসস্থল বা কর্মপরিবেশটি হয় স্বাস্থ্যকর, প্রফুল্ল ও সৃজনশীল। নকশায় প্রাকৃতিক আলো, গাছপালা ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ রেখে অফিসে প্রাকৃতিক-স্মার্ট কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করেছি।
স্থাপত্যের অন্দর ও বাহিরে সজ্জার বিষয়ে আধুনিক প্রজন্ম বেশ সচেতন। বিশ্বায়নের যুগে কোথায় কী ট্রেন্ড চলছে, এখনকার প্রজন্ম তা জানে। তবে অতিবস্তুবাদী এসব অন্দরসজ্জাকে অনেকাংশে এড়িয়ে যেতে চায় তারা। মিনিমাল ধারায় বিশ্বাসী এই প্রজন্ম দৃশ্যমান নান্দনিকতা নিয়ে ভাবে। প্রাণ, পরিবেশ, গাছপালা আর বাগান নিয়েও তাদের সত্যিকারের আবেগ রয়েছে। যে বিষয়টা আমাকেও অনুপ্রাণিত করে সব সময়। এখনকার প্রজন্ম রং বা কৃত্রিম আলোর ফলে ডিজাইনে যে দূষণ হয়, তা–ও জানে। সরলতা, প্রকৃতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, মিনিমালিস্ট চিন্তাভাবনা এবং উপকরণ বাছাইয়ে সততার মতো বিষয়কে তারা সাদরে গ্রহণ করছে।
স্থাপত্য ও অন্দরসজ্জা একে অপরের পরিপূরক। তাই ভবন নির্মাণকাজের শুরুতেই অন্দরসজ্জাকে অঙ্গীভূত করে নিতে হয়৷ স্থপতি হিসেবে আমার মনে হয়, নির্মাণকাজের আগে জায়গাটির চারদিকের পরিবেশ সম্পর্কে জানা যেমন জরুরি, তেমনি গ্রাহকের মূল্যবোধ আর দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করাও জরুরি।