রাস্তায় যে পরিচিত ছেলেকেই দেখছি, তাকেই মনে হচ্ছে চিঠির লেখক

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।

সন্ধ্যায় হ্যারিকেন জ্বালিয়ে মাদুরে গোল হয়ে বসে তিন ভাইবোন পড়তে বসেছি। আমি সবার বড়, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি।

ইংরেজি বইটা খুলতেই ঝুপ করে ভাঁজ করা একটা কাগজ পড়ল, সঙ্গে একটা লাল গোলাপ। খুলে পড়তে গিয়ে দেখি, প্রেম নিবেদনের চিঠি। নামহীন লেখক ইনিয়ে-বিনিয়ে লিখেছে, ‘কুসুম, তুমি খুব সুন্দরী, তোমাকে আমার ভালো লাগে, তোমায় ভালোবাসি।’

চট করে আশপাশটা দেখে নিলাম, কেউ আবার দেখে ফেলল কি না।

বাড়ির পরিবেশ খুব রক্ষণশীল। প্রেমের বিষয়ে বড্ড কড়াকড়ি। মাথায় আর পড়াশোনা ঢুকছে না। শুধু ভাবছি কে লিখতে পারে এই চিঠি?

কিশোরী বেলায় বড্ড দস্যি টাইপ ছিলাম। গাছে উঠে আম, জাম, পেয়ার, কুল পেড়ে খেতাম, বান্ধবীদেরও দিতাম। নাচ-গান কবিতা আবৃত্তি সবকিছুতেই ছিল সাবলীল অংশগ্রহণ। এমনকি সেই সময় ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলাও করতাম। একপাড়ায় একসঙ্গে যাদের সঙ্গে বড় হয়েছি, ভাবছি তাদের কেউ কি এই চিঠি লিখেছে? ইদানীং খেয়াল করছি, ফিরু নামের লম্বা ফরসা, কোঁকড়ানো চুলের ছেলেটি কেমন যেন অন্য রকম করে তাকিয়ে থাকে!

আবার সেদিন আলমগীর তো বলেই ফেলল, ‘কুসুম, তুই কিন্তু দিনে দিনে অসাধারণ সুন্দরী হয়ে উঠছিস।’

সে কথা শুনে আমাদের মেয়েদের লিডার বেদানা আচ্ছামতো ধমক দিয়ে সাবধান করেছে, ‘এই কথা দ্বিতীয়বার কেউ কোনো মেয়েকে বললে সঙ্গে সঙ্গে বাসায় গার্জিয়ানদের কাছে বিচার দেওয়া হবে।’

বেদানা আমাদের থেকে একটু বড়, বিপদ–আপদ সে–ই সামলায়। বেদানার কাছেই ছুটে গেলাম। চিঠিটা পড়ে ওর মুখটা খুব গম্ভীর হয়ে গেল। আমাকে অভয় দিয়ে বলল, ‘চিঠির কথা কাউরে বলিস না। নিশ্চিন্ত থাক। কাল বিকেলেই লেখককে খুঁজে বের করব।’

রাতে কিছুতেই আর ঘুম এল না। পরদিন ভয় আর শঙ্কা নিয়ে স্কুলে যাচ্ছি, রাস্তায় যে পরিচিত ছেলেকেই দেখছি, তাকেই মনে হচ্ছে চিঠির লেখক!

প্রতীক্ষিত বিকেলে সব ছেলেমেয়ে মাঠে এল। বেদানার হাতে একটা খাতা ও কলম। সে বলল, ‘আজ আমরা একটা নতুন খেলা খেলব।’

সবাইকে একটি কবিতার দুই লাইন লিখতে বলল। একই কবিতা যারা লিখবে, তারা আউট হয়ে যাবে। প্রথমে ছেলেরা লিখবে। ছেলেদের লেখা শেষ হলে বেদানা বলল, ‘আজকের মতো খেলা শেষ। মেয়েরা আগামীকাল খেলবে।’

বুঝতে পারছি, ছেলেদের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ করাই ছিল এই খেলার মূল উদ্দেশ্য, পরে চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

ছেলেদের কারও হাতের লেখার সঙ্গেই চিঠির লেখা মিলল না!

২.

পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। আমি নাচে অংশ নিচ্ছি। মেকআপম্যান সব নৃত্যশিল্পীকে সাজিয়ে দিচ্ছেন। নাচের মেয়েদের চুল চূড়াখোঁপা করে কাগজের সাদা ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। শুধু আমাকে একটি স্পেশাল বেলি ফুলের মালা দিলেন। সেটা নিয়ে অন্য মেয়েরা খুব মন খারাপ করল, কথাও শুনিয়ে দিল।

আমার মনে একটা সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল। মেকআপম্যানকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আঙ্কেল, বেলি ফুলের মালা কে দিয়েছে?’

তিনি জানেন না, একটা খামে বেলি ফুলের মালা ভরা ছিল, আর তাতে লেখা ছিল, ‘এই মালাটা কুসুমের খোঁপায় পরানোর জন্য।’

একটা সূত্র পেলাম, বেলি ফুলের মালা যে দিয়েছে, সেই হয়তো পত্রলেখক।

৩.

একদিন এক প্রতিবেশীর বাসায় আমাকে দিয়ে তরকারি পাঠিয়েছেন দাদিমা। সেই বাসার মেয়ে আবার আমার ফুফুর বান্ধবী, ছেলেটি ছোট চাচার বন্ধু। নিত্য বাসায় আসা-যাওয়া। হঠাৎ খেয়াল করলাম, ছেলেটি বেলি ফুলের মালা গাঁথছে। পাশে বেশ কয়েকটি লালা গোলাপ। আমি গিয়ে বললাম, ‘বাহ, আপনি তো সুন্দর মালা গাঁথেন।’

ছেলেটি চোখ তুলে তাকাচ্ছে না।

‘শুনুন, বেলি ফুলের মালার মধ্যে একটা লালা গোলাপ দিন, আরও সুন্দর লাগবে!’

যথারীতি সন্ধ্যায় নৃত্য অনুষ্ঠানে বেলি ফুলের মালার মধ্যে একটা লাল গোলাপ!

প্রেমের সেই শুরু।