
চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠব; মা বললেন, সরকারি স্কুলে ভর্তি এবার হতেই হবে। তুমুল প্রতিযোগিতা, হলের বাইরে মলিন মুখে অপেক্ষায় প্রায় শ খানেক অভিভাবক। পরীক্ষা খারাপ হওয়ায় বেশ খানিকটা দেরিতে বের হয়েছি। মা আমাকে দেখেই তড়িঘড়ি প্রশ্নপত্রটা হাত থেকে কেড়ে নিলেন। সারা রাস্তা চলল প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণ, পরীক্ষার হলের চেয়ে বেশি ভয় তো ছিল এ নিয়েই। বাসায় পৌঁছানোর আগেই মায়ের তদন্ত রিপোর্ট পেয়ে গেলাম, তিনটা অঙ্ক ভুল করে এসেছি। দিলেন কষিয়ে দুটো চড়। সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রতিযোগিতামূলক কোনো পরীক্ষায় মাকে নিয়ে আর না, বাবাই এখন থেকে আমার একমাত্র আশ্রয়।
পরের বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে মৌখিক পরীক্ষা দিতে গেছি। স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী দুজন অভিভাবককেই উপস্থিত থাকতে হবে। ভাইভা বোর্ডে দু–চারটা একাডেমিক প্রশ্নের পর ম্যাডাম প্রশ্ন করলেন, ‘পড়ালেখা ছাড়া আর কী কী করা হয়?’
বাবা উত্তর দিয়ে বসলেন, ‘আমার মেয়ে নাচ পারে বেশ ভালো।’
শুনে তো আমার আক্কেলগুড়ুম, মা–ও বেশ বিব্রত। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা বাবার এই মিথ্যা কোন বিপদ না জানি ডেকে আনে, ভাবতে ভাবতেই বিপদ এসে উপস্থিত। ম্যাডাম মুচকি হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, তবে নেচে দেখাও।’
আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, ‘ম্যাডাম, গান ছাড়া...’
ম্যাডাম বললেন, ‘তোমার বাবা গাইবেন গান।’
একমূহূর্ত দেরি না করে আমার বিপদ দ্বিগুণ করে দিয়ে বেসুরো গলায় গান ধরলেন বাবা। মনে মনে বললাম, ‘ধরণি দ্বিধা হও।’ নাচের ‘ন’ও না জানা ১১ বছর বয়সী আমি বাবার কথাকে সত্য প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালালাম। এক মিনিটের মাথায় আমার নাচ (কিংবা বেসুরো গলায় গাওয়া বাবার গান) সহ্য না করতে পেরে ম্যাডাম আমাকে চেয়ারে বসতে বললেন।
পরদিন জানতে পারলাম, আমি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের ছাত্রী হওয়ার সুযোগ অর্জন করেছি। এ কৃতিত্ব কার, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেল।
আট বছর পরের কথা। এইচএসসিতে আশানুরূপ ফল না হওয়ায় ভর্তিযুদ্ধে আগে থেকেই বেশ পিছিয়ে আছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরীক্ষায় বসার পালা। সঙ্গী হলেন বাবা। দক্ষিণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তরে হাজী দানেশ—প্রতি পরীক্ষার শেষে বেরিয়ে দেখি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বাবা। পরীক্ষা–সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার ভয় নেই। আমিই বরং অতি–উৎসাহী হয়ে দু–চার লাইন বলি। পরীক্ষা শেষে গন্তব্যে ফিরে যাই। নোয়াখালীতে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়েই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে ফেলি, ‘বাবা, এবার হবেই।’
ফলাফল প্রকাশের পর দেখি অকৃতকার্য হয়েছি। ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। কারণ, এ লড়াই তো আমার একার নয়; ছুটছি আমি, ছুটছেন বাবাও।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে কুয়াশাচ্ছন্ন এক ভোরে নামলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলা অনুষদের পরীক্ষা শেষে বেরিয়ে আশায় বুক বাঁধলাম। দুই দিন পর ফলাফল বেরোলো। অবশেষে ভর্তিযুদ্ধ নামক কঠিন লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটেছে, আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছি। হল গেটে রুপালি রঙের একটা ছোট ট্রাংক আর তোশক–বালিশসমেত আমাকে বিদায় দিচ্ছেন বাবা। গলার মাঝামাঝি অদৃশ্য এক বস্তু দলা পাকিয়ে কান্নার পূর্বাভাস হয়ে হাজির হয়েছে। চোখের পলক না ফেলেই সোজা হেঁটে হলে ঢুকে যাচ্ছি। জানি, পেছনে তাকালেই দেখতে পাব, হাসিমুখের আড়ালে কান্না লুকিয়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন বাবা।
পরের বছর ঠিক একই জায়গায় একজন বাবাকে দেখলাম তাঁর কন্যাকে বিদায় দিতে। সম্পূর্ণ অপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের অনুভূতি আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, চোখ ভিজে আসছে।
অদ্ভুত এ মায়ার বন্ধন অটুট থাকুক চিরকাল।