
শামসুল হকের বড় মেয়ের বয়সই এখন প্রায় ৯০ বছর। তাহলে শামসুল হকের বয়স কত? এ কথা জিজ্ঞাসা করলে ঘুরেফিরে একটি বয়ানই দেন শামসুল হক, ‘যে বছর রেললাইন বসানো হয়, সেই বছর আমার বয়স ছিল ১৭ বছর। আমার এক জায়গায় এক বিঘা, এক জায়গায় ৬ কাঠা, আরেক জায়গায় ১০ কাঠা জমি রেললাইনের ভেতরে চলে গেছে।’ শুধু বয়স নয়, অতীতের যে প্রশ্নই তাঁকে করা হয়, ঘুরেফিরে এটুকুর ভেতরেই থাকেন তিনি। সব স্মৃতিই প্রায় ‘নাই’ হয়ে গেছে, মনে স্থায়ী হয়ে রয়ে গেছে শুধু জমি হারানোর বেদনা।
কয়েক বছর ধরে বসানোর পর ১৯৩০ সালে চালু হয় রাজশাহীর রেললাইন। শামসুল হকের দাবি অনুযায়ী, উদ্বোধনের বছরও যদি তাঁর বয়স হয় ১৭ বছর, তাহলে এখন তাঁর বয়স ১১২ বছরের বেশি। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর জন্ম সাল দেওয়া আছে ১৯১৭, সে অনুযায়ী তাঁর বয়স এখন ১০৯ বছর। বাংলাদেশে এ–সংক্রান্ত রেকর্ড অপর্যাপ্ত ও অনির্ভরযোগ্য না হলেও এ কথা বলাই যেত, শামসুল হক আমাদের অন্যতম প্রবীণ নাগরিক।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার জামিরা গ্রামে শামসুল হকের বাড়ি। তাঁর বাবার নাম আবদুল্লাহ মণ্ডল। পেশায় শামসুল হক ছিলেন পল্লিচিকিৎসক। অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি রোগীদের হোমিও চিকিৎসাও দিতেন। ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি থেকে বোর্ড অব হোমিওপ্যাথিক সিস্টেম অব মেডিসিনের নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হন তিনি। তাঁর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ে রেজিয়া বেগম হোমিও চিকিৎসক। রেজিয়ার মেয়ে হোসনে আরাও হোমিও নিয়ে পড়াশোনা করে গ্রামেই ফার্মেসি খুলেছেন।
শামসুল হকের বড় ছেলে আবুল মহাজন পল্লিচিকিৎসক আর ছোট ছেলে নেফাউর রহমান প্রাণিচিকিৎসক। বংশের ধারা অনুসরণ করে নাতিরাও কেউ প্রাণিচিকিৎসক, কেউ পল্লিচিকিৎসক।
জামিরা গ্রামে শামসুল হকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম গত ২৮ নভেম্বর। বিছানায় বসে ছিলেন। গলায় এখনো বেশ দাপট। অতিথিদের বসতে দেওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ঘরে চেয়ারের ওপর কাপড়চোপড় রাখা দেখে বারবার বলতে লাগলেন, ‘চেয়ারের উপরে কী সব রাকিচে! বসেন, আপনারা বসেন, এই দিকে বসেন।’
রাজশাহী থেকে আমার সঙ্গে গেছেন কবি ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মোস্তাক রহমান। ওই গ্রামে তাঁর নানা আবদুর রহমানের বাড়ি। নাম বলতেই শামসুল হক চিনতে পারলেন। উপস্থিত ছিলেন গ্রামের পোস্টমাস্টার আবদুল জলিল। তাঁর বয়সও প্রায় ৭০ বছর। তাঁর কাছ থেকেই শামসুল হকের অনেক কথা জানা গেল। তিনি বললেন, বছর দেড়েক আগেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দিয়েছেন শামসুল ডাক্তার। তিনি পল্লিচিকিৎসক হলেও ভালো রোগ নির্ণয় করতে পারতেন। তিনি নিজেও তাঁর কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। পাশের পাশান্ডিয়া গ্রামের আমচরণ ডাক্তার ও কালী ডাক্তারের কাছে শামসুল হক তালিম নিয়েছিলেন। নাড়ি ধরেই রোগ বলে দিতে পারতেন।
শামসুল হক এখন আর হাঁটাচলা করতে পারেন না। চোখে কম দেখার কারণে কাউকে চিনতেও পারছেন না। শামসুল হক বললেন, ডাক্তার দেখিয়ে একটা চশমা নিলে হয়তো দেখতে পেতেন। এই বলে আবদুল জলিলকে বললেন, ‘তুমার চশমাডা দেও তো দেকি দেকা যায় কি না।’ আবদুল জলিলের চশমা নিয়ে শামসুল হক নিজের চোখে পরলেন। কাছে-দূরে নিয়ে দেখলেন, কোন অবস্থায় ভালো দেখা যায়।
শতবর্ষী মানুষ বলে তাঁর কথা শুনতে সঙ্গে আরও গিয়েছিলেন নওগাঁ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ওহিদুল ইসলাম। সবার আগ্রহ ছিল শামসুল হকের কাছ থেকে এই অঞ্চলের চোখে দেখা ইতিহাস জানা; কিন্তু অতীত নিয়ে প্রশ্ন করতেই শামসুল হক গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন মুখস্থ একটাই ইতিহাস, ‘যে বছর রেললাইন বসানো হয়, সেই বছর আমার বয়স ছিল ১৭ বছর।’ তারপর কোন মাঠে কতটুকু জমি ছিল, সেই জমির কতটুকু রেললাইনের মধ্যে চলে গেছে, সেসব মুখস্থ কথা। যতবার জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল, ওই একই উত্তর। তাঁর মুখ থেকে অতীতের আর কোনো কথা বের করা গেল না।
বড় ছেলে আবুল মহাজন এসে বলেন, ‘বাবা এখন আর কানে শুনতে পান না। এ জন্য তাঁর কাছে প্রশ্ন করে সহজে কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন কোনো লোক এলেই তাঁর কাছে ওই রেললাইন বসানোর ইতিহাস তিনি বলেন, জমির কথা বলেন আর ওই সময়ের বয়সের কথা বলেন।’