আসল আম কেনার উপায়, জেনে নিন আম ক্যালেন্ডার

বাজারে নানা আমের মেলা বসেছে। কিন্তু এ মেলায় ক্রেতাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ভেজাল, রাসায়নিক দিয়ে পাকানো কিংবা সময়ের আগে বাজারে আসা স্বাদহীন অপরিপক্ব আম। একটু অসচেতন হলেই সুন্দর চকচকে রূপ দেখে আম কিনে বাড়িতে এনে ঠকতে হয়। আমের বাজারে এই ধোঁকা থেকে বাঁচতে এবং নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভালো মানের আম চেনার কিছু কার্যকর ও বাস্তব উপায় নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ভালো মানের আম চেনার সাধারণ ‘থাম্ব রুল’

খাঁটি, সুস্বাদু ও প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের আসল স্বাদ পেতে সময়সীমা অনুসরণ করে আম কেনা উচিত
ছবি: সুপ্রিয় চাকমা

বাজারে গিয়ে চটজলদি আমের মান ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য প্রধানত পাঁচটি বিষয়ের ওপর ভরসা রাখতে পারেন। এ বিষয়ে পরামর্শ দিলেন রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানি সাইফুর রহমান ইমন।

ঘ্রাণ বা সুবাস (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য): আম কেনার সময় প্রথমেই এর বোঁটার চারপাশ থেকে ঘ্রাণ নিন। প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের বোঁটা থেকে একটি মিষ্টি, চেনা সুবাস বের হবে। কেমিক্যাল দিয়ে জোর করে পাকানো আমে এই চিরচেনা সুবাস থাকে না, অনেক সময় পুরোপুরি গন্ধহীন বা একটা কৃত্রিম ঝাঁজালো গন্ধ পাওয়া যায়।

ত্বকের ভাঁজ: আমের চামড়া যদি টানটান থাকে, তাহলে তা পরিপক্ব আম। বিপরীতে আমের চামড়া ঢিলা থাকলে, বিশেষ করে আমের নিচের দিকে, তাহলে তা অপরিপক্ব আম। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চামড়ায় যেমন ভাঁজ পড়ে, অপরিপক্ব আমের বেলায়ও এমন ভাঁজ দেখা যায়।

ত্বকের অবয়ব ও চেহারা: অতি চকচকে, নিখুঁত ও একদম দাগহীন হলুদ আম দেখলেই প্রলুব্ধ হবেন না। প্রাকৃতিকভাবে গাছপাকা আমের গায়ে ছোট ছোট কালো বা বাদামি ছোপ বা দাগ থাকা স্বাভাবিক। ত্বক সম্পূর্ণ মসৃণ ও কৃত্রিমভাবে উজ্জ্বল হলে তা রাসায়নিক প্রয়োগের লক্ষণ হতে পারে।

স্পর্শ ও নরম ভাব: আমের গায়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে দেখুন। আমটি সবদিকে সমানভাবে সামান্য স্পঞ্জি বা নরম মনে হলে তা স্বাভাবিক উপায়ে পেকেছে। কিন্তু আমের কোনো অংশ যদি খুব শক্ত আর কোনো অংশ অতিরিক্ত দেবে যাওয়া নরম হয়, তবে সেসব আম কিনবেন না।

রঙের ফাঁদ এড়ানো: জাতভেদে বহু আম পাকার পরও সম্পূর্ণ সবুজ থাকে, যেমন ল্যাংড়া, আম্রপালি। ক্রেতারা ভাবেন, সবুজ মানেই কাঁচা বা টক, যা একদম ভুল ধারণা। রঙের চেয়ে আমের পরিপক্বতা ও সুবাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২. জনপ্রিয় জাত এবং এসবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য

প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের বোঁটা থেকে একটি মিষ্টি, চেনা সুবাস বের হবে।

সব আমকে একপাল্লায় মাপা ভুল। কারণ, একেক জাতের আম কেনার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য খেয়াল করার বিষয় আছে—

হাঁড়িভাঙা আম: হাঁড়িভাঙা আম বেশি পাকলে স্বাদটাই মাটি। হাঁড়িভাঙা আম পুরোপুরি পাকার আগে বা কিছুটা ডাঁসা (শক্ত ও কাঁচা-পাকা) অবস্থায় কিনতে হয়। এই আম পেকে বেশি নরম হয়ে গেলে ভেতরের শাঁস পানসে হয়ে যায় এবং এর আসল ক্রাঞ্চি টেক্সচার নষ্ট হয়। তাই গায়ের রং কিছুটা সবুজাভ এবং হাত দিলে শক্ত মনে হলে তবেই কিনুন। অন্য সব আমের মতো পাকা ভেবে নরম হাঁড়িভাঙা আম কখনোই কেনা উচিত নয়।

ল্যাংড়া আম: পাকার পরও ল্যাংড়া আমের খোসা সবুজ বা হালকা শর্ষে রঙের ছোপযুক্ত থাকে। বাজারে যদি একদম টকটকে নিখুঁত হলুদ ল্যাংড়া আম দেখেন, তবে ধরে নিতে পারেন, তা প্রাকৃতিকভাবে পাকেনি। পাকা ল্যাংড়ার বোঁটার অংশটি ভেতরের দিকে একটু দেবে যায় এবং সেখান থেকে সুবাস ছড়ায়।

হিমসাগর/ক্ষীরসাপাতি: গাছপাকা হিমসাগর আমের গায়ে ছোট ছোট বাদামি ডট বা ফ্রিকলস দেখা যায়। এর খোসা কিছুটা মসৃণ ও সামান্য তৈলাক্ত হয়। হাত দিয়ে পুরো আমটি সমান নরম বা একই রকম শক্ত গড়নের মনে হলে তবেই কিনবেন।

আম্রপালি: আসল আম্রপালি আম আকারে মাঝারি থেকে কিছুটা ছোট হয় এবং এর নিচের দিকটা সামান্য সুচালো বা বাঁকানো থাকে। বাজারে অতিরিক্ত বড় আকারের যে আম্রপালি দেখা যায়, সেসবে রাসায়নিক বা অতিরিক্ত সারের প্রভাব থাকার ঝুঁকি বেশি। এ আমও পাকার পর সবুজ থেকে যায়।

প্রাকৃতিকভাবে গাছপাকা আমের গায়ে ছোট ছোট কালো বা বাদামি ছোপ বা দাগ থাকা স্বাভাবিক।

৩. কেমিক্যালে পাকানো আম বর্জনের কৌশল

একই রকম রং বা ইউনিফরমিটি: ঝুড়ির মধ্যে থাকা সব কটি আম যদি একদম নিখুঁত একই রকম হলুদ রঙের হয়, তবে তা কেমিক্যালের ‘কামাল’ বলে ধরে নেওয়া যায়। প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের ঝুড়িতে রঙের তারতম্য থাকবেই—কোনোটি একটু বেশি হলুদ, কোনোটি আংশিক সবুজ। কোনটি হলুদ-সবুজের মিশেল।

পানির পরীক্ষা: আম কিনে বাড়িতে এনে বালতিভর্তি পানিতে ছেড়ে দিন। গাছপাকা রসালো আম ওজনে ভারী হওয়ায় পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে যাবে। কিন্তু রাসায়নিক দিয়ে জোর করে পাকানো অপরিপক্ব আম সাধারণত পানির ওপর ভেসে থাকে।

স্বাদেই পরীক্ষা: কেমিক্যালযুক্ত আম মুখে দিলে প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের মতো দীর্ঘস্থায়ী কড়া মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায় না। বরং মুখে হালকা তিতকুটে বা ঝাঁজালো অনুভূতি হতে পারে এবং খাওয়ার পর গলায় সামান্য অস্বস্তি বা চুলকানি হতে পারে।

৪. অঞ্চলভিত্তিক ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ বা আম পাড়ার সময়সূচি মেনে আম কেনা

বাড়তি লাভের আশায় নির্ধারিত সময়ের আগেই গাছ থেকে আম পেড়ে কৃত্রিম উপায়ে পাকানো হয়

আম কেনার ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক অফিশিয়াল সময়সূচি বা আম ক্যালেন্ডার মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ক্যালেন্ডারে উল্লেখিত নির্দিষ্ট দিন-তারিখের আগে বাজারে আসা আমগুলো অপরিপক্ব বা কাঁচা থাকার আশঙ্কা আছে। অনেক সময় বাড়তি লাভের আশায় নির্ধারিত সময়ের আগেই গাছ থেকে আম পেড়ে কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর চেষ্টা করা হতে পারে, যা আমের স্বাভাবিক স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নষ্ট করে। তাই খাঁটি, সুস্বাদু ও প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের আসল স্বাদ পেতে এই সময়সীমা অনুসরণ করে আম কেনা উচিত।

আমের জাত ও জেলাভিত্তিক সঠিক সময়সূচি

একটু অসচেতন হলেই আম কিনে বাড়িতে এনে ঠকতে হয়

গুটি বা স্থানীয় আম ও গোপালভোগ: মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আসে স্থানীয় গুটি আম ও গোপালভোগ আম। চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী ও নওগাঁয় এই আম মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই নামানো শুরু হয়।

ক্ষীরসাপাতি বা হিমসাগর: আমপ্রেমীদের পছন্দের জাতটি চুয়াডাঙ্গায় সবচেয়ে আগে পাবে। চুয়াডাঙ্গায় ১৩ মে, রাজশাহীতে ৩০ মে এবং নওগাঁয় ২ জুন থেকে ক্ষীরসাপাতি/হিমসাগর আম বাজারে আসতে শুরু করে।

ল্যাংড়া ও আম্রপালি: জনপ্রিয় জাত ল্যাংড়া চুয়াডাঙ্গায় ২৮ মে, নওগাঁ ও রাজশাহীতে ১০ জুন থেকে বাজারে আসে। অন্যদিকে আম্রপালি আম চুয়াডাঙ্গায় ৫ জুন, নওগাঁ ও রাজশাহীতে ১৫ জুন থেকে পাড়া শুরু হয়। এ সময়ের আগে বাজারে ল্যাংড়া বা আম্রপালি পাওয়া গেলে তা পরিপক্ব না-ও হতে পারে।

ফজলি, হাঁড়িভাঙা ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো: ফজলি আম চুয়াডাঙ্গা ও রাজশাহীতে ১৫ জুন এবং নওগাঁয় ২৫ জুন থেকে বাজারে আসে। হাঁড়িভাঙ্গা আম চুয়াডাঙ্গায় ২০ জুন, নওগাঁ ও রাজশাহীতে ১০ জুন থেকে পাওয়া যাচ্ছে। ব্যানানা ম্যাঙ্গো রাজশাহীতে ১০ জুন, চুয়াডাঙ্গায় ২২ জুন এবং নওগাঁয় ২৫ জুন থেকে পাকতে শুরু করবে। প্রাকৃতিক নিয়মে পাকা আম পাওয়ার জন্য এই তারিখগুলো মেনে চলা জরুরি।

আশ্বিনা ও বারি-৪: নাবি বা লেট প্রজাতির এই আমগুলো জুনের শেষে ও জুলাইয়ে বাজারে আসে। চুয়াডাঙ্গায় এই জাত ৩০ জুন, নওগাঁয় ৫ জুলাই থেকে আশ্বিনা/বারি-৪ বাজারে আসবে। রাজশাহীতে বারি-৪ আম ৫ জুলাই ও আশ্বিনা আম ১০ জুলাই থেকে পাড়া শুরু হবে। ভালো মানের আম পেতে তত দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভালো।

গৌড়মতি: গৌড়মতি আম নওগাঁয় ৫ জুলাই, রাজশাহীতে ১৫ জুলাই ও চুয়াডাঙ্গায় সবচেয়ে দেরিতে, অর্থাৎ ৩১ জুলাই থেকে বাজারে আসবে। অন্যদিকে কাটিমন ও বারি ১১ বারোমাসি আম বলে সারা বছরই পাওয়া যায়।

আম কেনার সময় বিক্রেতাকে আমের উৎস বা অঞ্চল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন

বাংলাদেশের প্রধান ৩টি আম উৎপাদনকারী অঞ্চলের আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে একই আম ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পাড়া হয়। জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া এই সময়সূচির আগে বাজারে আসা আম কেনা থেকে বিরত থাকুন। আম কেনার সময় একটু সময় নিয়ে বিক্রেতাকে আমের উৎস বা অঞ্চল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন এবং ওপরের ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। তাড়াহুড়া না করে সঠিক সময়ে সঠিক আমটি কেনাই ঠকে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়।