কারও সাইকেল কেনার ইচ্ছা হলেই বলে, চল দোস্ত, পুরান ঢাকার বংশালে সাইকেল কিনতে যাই। কিন্তু কথা হলো মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, ৬০ ফিট ও ৩০০ ফিটসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় সাইকেলের অনেক দোকান আছে। তবু কেন কেনার সময় সবার বংশালের কথাই মাথায় আসে প্রথম? এখানে কি আসলেই তুলনামূলক কম দামে সাইকেল মেলে? উত্তর খুঁজতে একদিন বংশালের দিকে পা বাড়াই।
নাজিরাবাজারের কাজী আলাউদ্দিন রোড থেকে শুরু করে বংশাল চৌরাস্তা পর্যন্ত দুই শতাধিক দোকান নিয়ে সাইকেলের এই বিশাল বাজার। খুচরা ও পাইকারি দরে এখান থেকেই ঢাকার অন্যান্য অংশসহ সারা দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায় সাইকেল।
শুরুতেই এহসান সাইকেল স্টোরের পরিচালক এহসান রহমানের সঙ্গে কথা হলো। বংশাল থেকে কি আসলেই কম দামে সাইকেল পাওয়া যায়?
জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্যান্য জায়গার তুলনায় কম দামে কেনা যায় বলেই তো এত দূর থেকে ক্রেতারা আসেন। মাত্রই যেমন ঢাকার মান্ডা থেকে একজন এসে সাইকেল নিয়ে গেলেন তাঁর স্কুলপড়ুয়া ছোট মেয়ের জন্য।
৪৫ বছর ধরে সাইকেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মাস্টার হুইলস প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. জামিল খান যোগ করলেন, দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি সাইকেলের বাজার এই বংশাল থেকে যে সাইকেল ১০ হাজার টাকায় কেনা সম্ভব, তা ঢাকার অন্য কোথাও থেকে একই দামে কেনা একপ্রকার অসম্ভব।
কারণ, সেই ১০ হাজার টাকার সঙ্গে যোগ হয় স্থানীয় বিক্রেতার পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও লাভ করার জন্য বাড়তি অংশ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একই সাইকেল বংশাল থেকে না কিনে অন্য জায়গা থেকে কিনলে তুলনামূলকভাবে দাম অনেকটাই বেশি পড়ে।
দেশের প্রায় ৬৪ জেলা থেকেই আসে ফরমাশ। কুরিয়ারে দেশের নানা প্রান্তে যাবে বলে বাক্সবন্দী সাইকেল চোখে পড়ল।
প্রতিটি দোকানেই সামনের রাস্তা থেকে শুরু করে ভেতরের মেঝে, দেয়াল ঘেঁষে তাকে থরে থরে সাজানো সাইকেল আর সাইকেল। অনেকেই সরাসরি শোরুমে এসে দেখেশুনে সাইকেল কেনেন। এখানে এসেই জানলাম, দোকানগুলো অনলাইনেও এখন অর্ডার নিচ্ছে।
দেশীয় ব্র্যান্ড মেঘনা, আকিজ ও দুরন্তের সাইকেলের বাইরে চীন থেকে বেশির ভাগ সাইকেল আসে। জামিল খান জানান, অনলাইনে সাইকেল কেনার সময় যাঁদের শোরুম আছে, তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া ভালো।
তিনি জানান, ক্রেতারা যোগাযোগ করলে তাঁরা হোয়াটসঅ্যাপে ছবি ও ভিডিও পাঠান। প্রয়োজনে ভিডিও কলেও সাইকেল দেখেশুনে বুঝে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
এহসান সাইকেল স্টোরের পরিচালক এহসান রহমান জানান বয়স অনুযায়ী সাইকেলের রকমফেরের কথা। সাইকেলের চাকার ব্যাসের ওপর নির্ভর করে সাইকেলের প্রকারভেদ। তিন বছরের ছোট শিশুদের জন্য আছে ট্রাই সাইকেল। তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য আছে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের সাইকেল।
৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আছে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের সাইকেল। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আছে ২০ ইঞ্চি ব্যাসের সাইকেল। যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২০ বছর আর উচ্চতা ৫ ফুটের নিচে, তাঁদের জন্য আছে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের সাইকেল।
আর ২১ বছরের ঊর্ধ্বে ও যাঁদের উচ্চতা ৫ ফুটের ওপর, তাঁদের জন্য আছে ২৬ ইঞ্চি ব্যাসের সাইকেল। এখানে সাইকেলের সর্বনিম্ন দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এখানে হেলমেট, হ্যান্ড গ্লাভস, নিরাপত্তা লক, মিউজিক্যাল হর্ন লাইট, বাস্কেট ও সিট কাভার পাওয়া যায়। হেলমেট ২০০ থেকে ৬০০ টাকা। ফোমের সিট কাভার ১০০ থেকে ২০০ টাকা। প্রতি জোড়া হ্যান্ড গ্লাভস ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
নিরাপত্তা লক নিতে পারবেন ২০০ থেকে ৭০০ টাকায়। মিউজিক্যাল হর্ন লাইট সেট করতে পারবেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। আর লেডিস সাইকেলের ক্ষেত্রে সামনে বাস্কেট যোগ করতে লাগবে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
বর্ষায় কাঁচা রাস্তায় সাইকেল চালাতে গেলে পেছনের চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে কাদাপানি উঠে এসে পোশাক নোংরা করে। এ জন্য আছে প্লাস্টিকের তৈরি নিরাপত্তা গার্ড, যাকে বলা হয় ‘মাড গার্ড’।
আবার চলার পথে পানি পানের জন্য সাইকেলেই থাকে বোতল রাখার ওয়াটার কেস। এই পানির বোতল রাখার ওয়াটার কেস ও মাড গার্ড কেনার সময়ই সাইকেলে সেট করে দেন বিক্রেতারা। এ জন্য বাড়তি খরচের প্রয়োজন হয় না।
বয়স অনুযায়ী সাইকেল কিনলেও বয়সের সঙ্গে শারীরিক উচ্চতাটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। দেখা যায় একই বয়সের কারও উচ্চতা কম, কেউ আবার খুব লম্বা। তাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতাকে প্রাধান্য দিয়েও সাইকেল নির্বাচন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে শোরুমে থাকা বিক্রয়কর্মীর সাহায্য নিন।
রাস্তার ধরন বুঝে সাইকেলের টায়ার নির্বাচন করুন। রেস কিংবা পিচঢালা মসৃণ পথে চালানোর জন্য চিকন ও তুলনামূলক মসৃণ টায়ারের সাইকেল মানানসই। গ্রামের উঁচু–নিচু মেঠো রাস্তায় চালানোর জন্য নয়। অন্যদিকে তুলনামূলক বেশি খাঁজকাটা মোটা টায়ারের সাইকেল সব রকমের রাস্তায় নির্বিঘ্নে চলার জন্য উপযোগী।
সাইকেল চেকআপ করে নেওয়া ভালো। কেনার ১৫ থেকে ২০ দিন পর আরেকবার চেকআপ করুন। নাট–বোল্ট থেকে শুরু করে কোনো যান্ত্রিক অসংগতি থাকলে সারিয়ে নেওয়া ভালো।
একসময় সাইকেলের যান্ত্রিক অংশে, বিশেষ করে চেইনে মরিচা পড়া ঠেকাতে তেল দিতে হতো। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, সাধারণ তেল দেওয়াটা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মেশিন অয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে।
যাঁরা গিয়ারের সাইকেল কেনেন, তাঁদের ক্ষেত্রে চেইন বেঁধে যাওয়া বা ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিকটস্থ সাইকেল মেরামতখানায় মেরামত করে নিতে পারেন।