
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা দরজিবাড়িগুলোর চাহিদা যে এখনো কমে যায়নি, উৎসবের সময় সেটা ভালোভাবেই বোঝা যায়। পছন্দের নকশায় ঈদের পোশাক বানাচ্ছেন ক্রেতারা
সপ্তাহ দুই হলো দরজিবাড়িতে ভিড় জমা শুরু হয়েছে। সুই-সুতার কাজও শুরু হয়ে গেছে, চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত। সেলাই মেশিনের শব্দ থামবে না, যতক্ষণ না চারদিকের কাপড়ের স্তূপ পোশাক হয়ে ওঠে। ঈদের শেষ পোশাকটি না বানানো পর্যন্ত এ ব্যস্ততা চলতেই থাকবে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা দরজিবাড়িগুলোর চাহিদা যে এখনো কমে যায়নি, উৎসবের সময় সেটা ভালোভাবেই বোঝা যায়।
নিউমার্কেটে পুরুষদের শার্টের চেয়ে প্যান্ট বানানোর তোড়জোড় দেখা গেল বেশি। গাউছিয়া মার্কেটের মডার্ন রেডিমেড অ্যান্ড টেইলার্সের কাটিং মাস্টার মো. সবুজের কাছে জমে গেছে অনেক ফরমাশ। তিনি জানান, ‘আমাদের কাছে কামিজের ফরমাশই বেশি আসছে। পালাজ্জো, সিগারেট প্যান্ট অথবা প্যান্ট অর্ডার দিচ্ছেন নারীরা। পালাজ্জোতে অনেকে কুঁচি দিচ্ছেন এবং প্যান্টের এক পাশে পুঁতি দিয়ে নকশা করিয়ে নিচ্ছেন।’ এ ছাড়া বোট গলা, শেরওয়ানি কলারের পাশাপাশি ছোট গোল গলার ওপরও কাজ করা হচ্ছে। অনেকে বানাচ্ছেন থ্রি–কোয়ার্টার হাতার কামিজ। কেউ কেউ ফুলহাতারও ফরমাশ দিচ্ছেন। ছোট হাতা কামিজের ফরমাশ কম। পুরোনো বছরের ক্যাটালগ থেকেই অনেকে নির্বাচন করছেন নকশা। শাড়ির সঙ্গে ছোট হাতা ও হাতাকাটা ব্লাউজ বানানো হচ্ছে বেশি। বিশেষত এ বছর পিঠখোলা ব্লাউজের স্টাইল চলবে। এ বছর গাউছিয়া মার্কেটে মজুরি ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আসাদুজ্জামান জানান, অনেকে অনলাইনভিত্তিক দোকানের পোশাকের কাটিং দেখিয়ে ফরমাশ দিচ্ছেন। কম্পিউটারভিত্তিক এমব্রয়ডারির জনপ্রিয়তা দরজিবাড়িতে বেড়েছে। ক্রেতারা তাঁদের নিজস্ব নকশা এনে দ্রুত এমব্রয়ডারি করিয়ে নিচ্ছেন।
ধানমন্ডি ও শুক্রাবাদ এলাকার দিকে ঢিলেঢালা পোশাকের চাহিদাই বেশি। অনেকে অতিরিক্ত ঢিলা পোশাকের ধারা অনুসরণ করে বানাচ্ছেন ম্যাক্সি ড্রেস, স্কার্ট, ট্রাউজার, শার্ট। হালকা রঙের সুতি কাপড় দিয়ে কামিজ বেশি বানানো হচ্ছে এ দুই এলাকায়।
মিরপুরের নান্নু মার্কেটে মূলত পুরুষদের প্যান্ট, শার্ট ও গেঞ্জি ফিটিংয়ের কাজই বেশি করা হচ্ছে। অনেকেই নান্নু মার্কেট থেকে জিনসের প্যান্ট কিনে দরজিবাড়ি থেকে ঠিক করিয়ে নিচ্ছেন। মডার্ন ফিটিং অ্যান্ড টেইলার্সের দরজি রেহান ইসলাম জানান, এখন একটু ঢিলেঢালা কাটের প্যান্টের ফিটিংয়ের দিকেই ঝুঁকছেন ক্রেতারা। কাটিং–ফিটিংয়ের খরচ ৬০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যেই নেওয়া হচ্ছে। তবে কাজের চাপ বাড়লে এবং ফরমাশের বৈচিত্র্য বিবেচনায় ২৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি হতে পারে বলে জানা গেছে। স্থানীয় অনেক টেইলার্স ৪০০ টাকার মধ্যে কাজ করে দিচ্ছে। তবে ভালো কাজ করে বলে সুনাম আছে, এমন টেইলার্সগুলো ৬০০ টাকা মজুরি নিচ্ছে। মিরপুরে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের তৃতীয় তলার রানা টেইলার্সের মাস্টার মোহাম্মদ রানা বলেন, এ বছর জর্জেট কাপড় দিয়ে অনেকে জামা তৈরি করাচ্ছেন। সুতির কাপড়ের ফরমাশ একটু কম। সিল্কের কাপড় দিয়েও পোশাক বানাচ্ছেন, তবে কম। ২০-২২ বছর বয়সী তরুণীরা সিল্কের কাপড়ের ক্ষেত্রে পেস্ট ও গোলাপি রঙের শেডের পোশাকের ফরমাশ দিচ্ছেন। গলার ক্ষেত্রে গোল গলার অর্ডারই বেশি। লম্বা কামিজের সঙ্গে কনুই পর্যন্ত হাতার ফরমাশ বেশি। সচরাচর মিরপুর ১–এর দিকে সুতি কাপড়ের সালোয়ার-কামিজের মজুরি দোকানভেদে ৬০০-৯০০ টাকা, জর্জেটের ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা।
গুলশান, বনানী, নতুন বাজার এলাকায় মজুরি দুই হাজার পর্যন্ত পৌঁছাবে বলে ধারণা করছেন ক্রেতারা। এমনকি চাহিদা বিবেচনা করে টেইলার্সকর্মীরাও ভাবছেন মজুরি বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে বনানী সুপার মার্কেটের স্টার টেইলার্সের বাচ্চু মিয়া জানান, ‘এবার আমরা কাপড়ভেদে মজুরি ধরেছি ৫০০-৯০০ টাকা।’ রাজধানীর মৌচাক কিংবা গুলিস্তানে কামিজের ক্ষেত্রে কিছুটা ঢিলেঢালা কাটের দিকেই মনোযোগ বেশি। গলার ধারে চায়নিজ লেস যুক্ত করে কামিজকে ভিন্ন রূপ দেওয়ার দিকে আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। কামিজ ও সালোয়ারের ফরমাশই বেশি। মৌচাকে ৪০০-৬০০ টাকার ভেতরে মজুরি নির্ধারিত হলেও সামনে ৮০০-১ হাজার ২০০ টাকাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
গুলশানের পিংক সিটিতেও ব্যস্ততা বেড়েছে। গুলশান ২–এ অবস্থিত পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্সের বর্ণালি টেইলার্স অ্যান্ড ফেব্রিকসের কর্মী জহিরের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেল, অনলাইনে অনেকেই পাশ্চাত্য ধাঁচের পোশাকের ফরমাশ দিচ্ছেন। সবাই অনলাইনেই নকশা এবং কাপড় নির্বাচন করে নিচ্ছেন। গরমে সুতি কাপড়ের ঢিলেঢালা কামিজ বা ফতুয়া বানিয়ে নেওয়ার দিকে মনোযোগ অনেকের।
দরজিবাড়ির গল্প করতে গেলে আরও বড় হবে। এলাকাভেদে ফ্যাশনের বৈচিত্র্য, কাপড় নির্বাচন আর চলতি ধারায় কিছুটা হলেও ভিন্নতা চোখে পড়ে। পোশাকের কাট, নকশার কাজ আলাদা হলেও সব জায়গাতেই দরজিবাড়ির ভূমিকা এক। ঈদের আগে গ্রাহকের হাতে নতুন পোশাকটি পৌঁছে দেওয়া।উত্তরার আজমপুরে স্কাই টাচ টেইলার্সের মাস্টার বাবুলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর জর্জেটের বিক্রি বেড়েছে। ডিজাইনের ক্ষেত্রে কাটওয়ার্ক ও প্যাচওয়ার্কের প্রতি সবার আগ্রহ বেশি। অনেকেই গলার কাছে হালকা কাটওয়ার্কের ডিজাইন বসাচ্ছেন। ফ্রক, কামিজ, পালাজ্জোর ক্ষেত্রে ৬০০-৭০০ টাকা মজুরি। তবে যাঁরা জমকালো ইনারসহ জামার ফরমাশ দিচ্ছেন বা পাশ্চাত্য ধাঁচের পোশাক বেছে নিচ্ছেন, তাঁদের মজুরি ১০০০-১ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে।