১০টি ছবিতে অজানা গ্রিনল্যান্ডকে চিনে নিন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মন্তব্যেই বিশ্বরাজনীতিতে গ্রিনল্যান্ড এখন আলোচিত। বরফে ঢাকা এই বিশাল দ্বীপকে ঘিরে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকেরই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড লুকিয়ে রেখেছে সাড়ে চার হাজার বছরের মানব ইতিহাস, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি, আলাদা জীবনযাপন আর এমন সব বাস্তবতা, যা আমাদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মেলে না। গ্রিনল্যান্ডকে নতুন করে চিনতে, বরফের আড়ালের এ দেশের অজানা ১০টি দিক তুলে ধরা হলো ছবির গল্পে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ

গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ
১০টি ছবিতে অজানা গ্রিনল্যান্ডকে চিনে নিন

মৌলিক তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক। গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। আয়তন প্রায় ২১ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর প্রায় ৮০ শতাংশই বরফে ঢাকা। তবে যে অংশে বরফ নেই, সেটার আয়তনও কম নয়, সুইডেনের কাছাকাছি। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজারের মতো। তাই এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম জনঘনত্বের জায়গাগুলোর একটি।

একসময় সত্যিই সবুজ ছিল গ্রিনল্যান্ড

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে গ্রিনল্যান্ড সত্যিই সবুজ ছিল

আজকের গ্রিনল্যান্ড বরফে মোড়া। তাহলে নামের মধ্যে ‘গ্রিন’ বা সবুজ এল কোথা থেকে? নামকরণের কৃতিত্ব ভাইকিং নেতা এরিক দ্য রেডের। আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত হয়ে এসে তিনি জায়গাটির নাম দেন ‘গ্রিনল্যান্ড’; নতুন বসতি গড়তে মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্যই মূলত নামটি দিয়েছিলেন। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে গ্রিনল্যান্ড সত্যিই সবুজ ছিল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে লাখ লাখ বছরের প্রাচীন মাটি।

গ্রিনল্যান্ড স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র

গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ

গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ। ভৌগোলিকভাবে এটি উত্তর আমেরিকার অংশ হলেও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত প্রায় এক হাজার বছর ধরে। ১৭২১ সাল থেকে ডেনমার্ক এখানে উপনিবেশ স্থাপন করে। ১৯৫৩ সালে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হয়। পরে ১৯৭৯ সালে পায় ‘হোম রুল’ এবং ২০০৯ সালে আরও বিস্তৃত ‘সেলফ রুল’। ধীরে ধীরে আরও বেশি দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিচ্ছে গ্রিনল্যান্ড সরকার।

সাড়ে চার হাজার বছরের মানব ইতিহাস

ইতিহাসবিদদের মতে, গ্রিনল্যান্ডে মানুষের বসতি শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিকে

ইতিহাসবিদদের মতে, গ্রিনল্যান্ডে মানুষের বসতি শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিকে। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এখানে এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। দশম শতকে আইসল্যান্ড থেকে আসা নর্সরা দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে বসতি গড়লেও ১৫ শতকের শেষ দিকে তারা বিলুপ্ত হয়। ১৩ শতকে এশিয়া থেকে আসা ইনুইটরা এখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। আজকের গ্রিনল্যান্ডের ইনুইটরা তাঁদেরই সরাসরি বংশধর। অর্থাৎ গ্রিনল্যান্ডে মানুষের বসবাস সাড়ে চার হাজার বছরের বেশি সময় ধরে।

‘এস্কিমো’ নয়, ইনুইট

আজ গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ ইনুইট, অধিকাংশই কালাল্লিত বা ডেনিশ-ইনুইট মিশ্র বংশোদ্ভূত

আজ গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ ইনুইট, অধিকাংশই কালাল্লিত বা ডেনিশ-ইনুইট মিশ্র বংশোদ্ভূত। বাকি ১২ শতাংশ মূলত ইউরোপীয়, বেশির ভাগই ডেনিশ। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গ্রিনল্যান্ডবাসীরা ‘এস্কিমো’ শব্দটি পছন্দ করেন না। সঠিক নাম ইনুইট বা কালাল্লিত। ‘কালাল্লিত’ শব্দের অর্থই হলো গ্রিনল্যান্ডের মানুষ।

বহু ভাষার দেশ

গ্রিনল্যান্ডে মানুষ সাধারণত গ্রিনল্যান্ডিক (কালাল্লিসুত) ও ডেনিশ—দুই ভাষাতেই কথা বলেন

গ্রিনল্যান্ডে মানুষ সাধারণত গ্রিনল্যান্ডিক (কালাল্লিসুত) ও ডেনিশ—দুই ভাষাতেই কথা বলেন। ১৯৭৯ সালে স্বায়ত্তশাসন চালুর পর থেকেই এই দুটি ভাষা সরকারি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম স্কুলে ইংরেজিও শেখে। মজার তথ্য হলো, ‘কায়াক’ আর ‘ইগলু’ শব্দ দুটি গ্রিনল্যান্ডিক ভাষা থেকেই বিশ্বের অন্য ভাষায় ছড়িয়ে গেছে।

শহর থেকে শহরে যাওয়ার রাস্তা নেই

গ্রিনল্যান্ডের এত বড় ভূখণ্ড, কিন্তু এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার কোনো সড়ক বা রেললাইন নেই

এত বড় ভূখণ্ড, কিন্তু এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার কোনো সড়ক বা রেললাইন নেই। শহরের ভেতরে কিছু রাস্তা থাকলেও সেসব শহরের সীমানা পেরোয় না। শহর থেকে শহরে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হয় প্লেন, নৌকা, হেলিকপ্টার, স্নোমোবাইল বা কুকুরের টানা স্লেজ। গ্রীষ্মে নৌকাই সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন।

মাছ ধরা ও তিমি শিকার

গ্রিনল্যান্ডের প্রধান আয়ের উৎস মৎস্যশিল্প

গ্রিনল্যান্ডের প্রধান আয়ের উৎস মৎস্যশিল্প। মাছ, সামুদ্রিক খাবার আর স্থানীয়ভাবে শিকার করা প্রাণী (যেমন তিমি ও সিল) ছাড়া প্রায় সবকিছুই আমদানি করতে হয়। অতিরিক্ত শিকার ঠেকাতে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট কোটা আছে। নীল তিমির মতো কিছু প্রজাতি পুরোপুরি সুরক্ষিত। তিমি ও সিলের মাংস রপ্তানি করা যায় না, শুধু স্থানীয়ভাবেই খাওয়া হয়।

প্রাণবন্ত রাজধানী নুক

গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক আকারে ছোট হলেও বেশ প্রাণবন্ত শহর

গ্রিনল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ বাস করে রাজধানী নুকে। আকারে ছোট হলেও শহরটি বেশ প্রাণবন্ত। এখানে আছে জাদুঘর, আধুনিক ক্যাফে, ফ্যাশন বুটিক। গ্রিনল্যান্ডকে বুঝতে চাইলে ঘুরে দেখা যায় ন্যাশনাল মিউজিয়াম, কাটুয়াক কালচারাল হাউস আর নুক আর্ট মিউজিয়াম। পাহাড় আর হিমবাহ দ্বারা গঠিত সমুদ্র খাঁড়ি বা বিশাল ফিয়র্ডে ঘেরা শহরটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যও দারুণ।

মধ্যরাতের সূর্য

গ্রিনল্যান্ডে প্রতিবছর ২৫ মে থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না

গ্রিনল্যান্ডে প্রতিবছর ২৫ মে থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না। দিন-রাত মিলিয়ে সূর্য আকাশেই থাকে, এটাই ‘মিডনাইট সান’। বছরের সবচেয়ে বড় দিন ২১ জুন এখানে জাতীয় ছুটি। এ সময় মানুষজন রোদ পোহায়, প্রকৃতির মাঝে বারবিকিউ করে, সূর্য যেন তখন আর তাড়াহুড়া করে বিদায় নেয় না।

সূত্র: ভিজিট গ্রিনল্যান্ড