ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে ট্রাভেল ভ্লগার সালাউদ্দীন সুমনের সঙ্গে লেখক
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে ট্রাভেল ভ্লগার সালাউদ্দীন সুমনের সঙ্গে লেখক

ভ্লগ বানাতে সালাউদ্দীন সুমন ভাইয়ের সঙ্গে অ্যান্টার্কটিকায় যাচ্ছি

বাংলাদেশ থেকে আগেও অনেক ভ্রমণপ্রেমী অ্যান্টার্কটিকায় গেছেন। তাঁদের কেউ গবেষণায়, কেউ অ্যাডভেঞ্চারে, কেউ নিছক স্বপ্নপূরণে। তাঁদের অনেকে দুর্দান্ত ছবি তুলেছেন, ভিডিও করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তবু আমাদের যাত্রাটা আলাদা। আমরা যাচ্ছি শুধুই ভ্রমণ করতে নয়, ভ্রমণটা বলার জন্য। আর সেই গল্প বলার সঙ্গী বাংলাদেশের সবচেয়ে অনুসরণ করা ট্রাভেল ভ্লগার সালাউদ্দীন সুমন ভাই। আমাদের লক্ষ্য অ্যান্টার্কটিকার অভিজ্ঞতাকে ক্যামেরার ভাষায় ধরে রাখা, যেন বাংলাদেশের মানুষ ঘরে বসেই বরফের মহাদেশটা অনুভব করতে পারেন।

সেই লক্ষ্যেই গত ২৮ জানুয়ারি আমরা যাত্রা শুরু করি আর্জেন্টিনার সর্বদক্ষিণের শহর উশুইয়া থেকে। এই শহরকে বলা হয় ‘পৃথিবীর শেষ শহর’। এখান থেকেই পৃথিবীর বেশির ভাগ অ্যান্টার্কটিকা অভিযান শুরু হয়।

আমরা উঠেছি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনের জাহাজে। যাত্রার প্রথম দুই দিন কাটে বিগল চ্যানেল পাড়ি দিয়ে। এই চ্যানেলে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর একে অন্যকে ছুঁয়ে যায়। ঢেউয়ের তালে তালে ক্যামেরা হাতে আমরা বারবার চেষ্টা করেছি সমুদ্রের রূপ ধরতে।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে পেঙ্গুইনদের আস্তানা ঘুরে দেখা

দুই দিন সমুদ্রযাত্রার পর আমাদের প্রথম ল্যান্ডিং হয় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে। আর্জেন্টিনার খুব কাছাকাছি হলেও এই দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে। ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার বিরোধও বেশ পুরোনো। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ডে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ফকল্যান্ড যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে আর্জেন্টিনা।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে সবচেয়ে বড় দুটি দ্বীপ পশ্চিম ফকল্যান্ড ও পূর্ব ফকল্যান্ড। সঙ্গে আছে আরও অন্তত ২০০ দ্বীপ। লাতিন আমেরিকায় ফকল্যান্ড দ্বীপ পরিচিত মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ নামে। ১৯৮২ সালের যুদ্ধের ক্ষত এখনো ইতিহাসে টাটকা।

কিন্তু ফকল্যান্ড আমাদের মনে গেঁথে গেছে তার বন্য প্রাণীর জন্য। প্রথমেই গেলাম পেঙ্গুইন কলোনিতে। কিং, জেনটু, ম্যাগেলানিক প্রজাতির পেঙ্গুইন আছে এখানে। সব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য। তবে সবচেয়ে মোহিত করেছে কিং পেঙ্গুইন, যেন বরফের রাজ্যের রাজকীয় বাসিন্দা।

এরপর দেখলাম বিশাল ডানার সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রস। এ যেন আকাশে ভেসে থাকা এক জীবন্ত বিস্ময়। শেষে ঘুরলাম রাজধানী স্ট্যানলি। ছোট্ট, শান্ত, রঙিন এক শহর স্ট্যানলি। এখানে আর্জেন্টিনীয় মুদ্রা চলে না, লেনদেন হয় পাউন্ড, ডলার, ইউরো বা কার্ডে।

সাউথ জর্জিয়া সিলদের আস্তানায়

সিলদের আস্তানায়

ফকল্যান্ড থেকে সাউথ জর্জিয়া পৌঁছাতে লাগল আড়াই দিন। সেখানে নামতেই চোখে পড়ল লাখ লাখ কিং পেঙ্গুইন। এমন বিশাল কলোনি আগে কল্পনাতেও দেখিনি।

আর চারদিকে শুধু ফার সিল ও এলিফ্যান্ট সিল। বিশ্বের ৯৫ শতাংশ অ্যান্টার্কটিক ফার সিলের বসতি সাউথ জর্জিয়ায়। আমরা নৌকায় করে ঘুরে ঘুরে এই বন্য প্রাণীর জীবন ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।

অ্যান্টার্কটিকা পেনিনসুলার পথে

আজ আমাদের অভিযানের এগারোতম দিন। অ্যান্টার্কটিকা পেনিনসুলার পথে আছি। এই ট্রিপে অংশ নিয়েছেন ২১টি দেশের ভ্রমণকারী। উশুইয়া থেকে অ্যান্টার্কটিকা ঘুরে আবার উশুইয়ায় ফিরে আসার এই প্যাকেজের খরচ প্রতিজন ১২ হাজার ৬৫০ ডলার (চারজনের কেবিন)। এর সঙ্গে ঢাকা–বুয়েনস আইরেস–উশুইয়া বিমানভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে একজনের মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ টাকা। অ্যান্টার্কটিকায় যাওয়ার মৌসুম সাধারণত অক্টোবরের শেষ থেকে মার্চ পর্যন্ত। এ সময় দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল। অন্য সময় তীব্র ঠান্ডা ও বরফের কারণে জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব। পুরো অভিযানটি ২০ দিনের। শেষ হবে ১৬ ফেব্রুয়ারি।