
৬৩ বছর বয়সে এসে হিমালয়ের প্রেমে পড়েন ইফতেখারুল ইসলাম। এভারেস্ট বেসক্যাম্প ভ্রমণ নিয়ে ২০২১ সালে লিখেছেন বই—‘যেখানে এভারেস্ট’। হিমালয়ের ডাকে এ বছরও গিয়েছেন গোকিও। গোকিও রির শীর্ষ থেকে দেখেছেন এভারেস্টসহ বিখ্যাত সব পর্বতশিখর। সে অভিযাত্রার অষ্টম পর্ব পড়ুন আজ।
গোকিওতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে ফিটজরয়ে। এই উঁচুতে এত চমৎকার একটা হোটেল পাব, আশাই করিনি। লেক থেকে সামান্য দূরে, বেশ কয়েকটি লজের পেছনে এই জায়গাটা উঁচু বলে ফিটজরয়ের ডাইনিং এবং অন্য ঘরের জানালা দিয়ে লেক ও পাহাড় দেখা যায়। ৪ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতায় সোলার প্যানেল থেকে সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যায় বলে বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা এখানে বেশ ভালো। বিছানায় ইলেকট্রিক ব্ল্যাংকেট রয়েছে। জানালার কাছে বসে এসব খুব স্পষ্ট দেখি, আবার একটু পরেই মেঘ এসে সবকিছু ঢেকে দেয়।
দুপুরের পর থেকেই চারদিক মেঘলা। দূরের পর্বতশিখর তো দূরের কথা, কাছের পাহাড়, লেক কিছুই দেখা যায় না। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। সঙ্গে প্রবল বাতাস। তারই মধ্যে গাইড তেজ বাহাদুর করকি আর আমি বেরিয়ে পড়ি। হোটেলের পাশে একটা ছোট পাহাড়ে উঠে গোজাম্পা হিমবাহ দেখব। প্রথমে কিছুই দেখতে পাই না, কারণ আমরা মেঘের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। প্রবল বাতাসে মাঝে মাঝে সেই মেঘ সরে যায়। তখন হিমবাহের কোনো কোনো অংশ দেখতে পাই। হিমশীতল বাতাস বইছে, সেই বাতাসে ভেসে আসে আরও মেঘ। আবার মেঘের আড়ালে ঢেকে যায় পুরো চরাচর।
আজ আর এর চেয়ে ভালো করে হিমবাহ দেখা হলো না। কাল ভোরে গোকিও রির চূড়ায় উঠে পর্বতশিখর দেখার সময় এই হিমবাহের অনেকখানি দেখা যাবে। তখন রোদ উঠবে, এই আশা নিয়ে ফিরে আসি। গোকিও রির পর্বতশিখর এখান থেকে দেখা যায় না। দেখা যায় লেকের ওপারে ছোট একটা পাহাড়। ডাকঘরের অমলের মতো ‘আমার ভারি ইচ্ছে করে ঐ পাহাড়টা পার হয়ে চলে যাই।’ তেজ বলে, ওই পাহাড় তো পেরিয়ে যেতেই হবে তার ওপারে এর ঠিক তিন গুণ উঁচু গোকিও রি। তার শিখরে পৌঁছাতে হবে আমাদের।
ফিটজরয় হোটেলে রীতিমতো ভিড়। অনেক ট্রেকার এসেছেন। কেউ এখান থেকেই ফিরে যাবেন। কেউ যাবেন চোলা পাস। কেউ চোলা পাস হয়ে এভারেস্ট বেজক্যাম্পের দিকে যাবেন। সবাইই এখানে একদিন অথবা বড়জোর দুদিন থাকবেন। আমি তেজের সঙ্গে আলোচনা করে এখানকার সবকিছু ভালোভাবে দেখতে চাই। পরদিন গোকিও রির শীর্ষে উঠব। তৃতীয় দিন হাঁটতে চাই আরও অনেক দূরের পথে, পাথরে, পাহাড়ে ও হিমবাহে। এত উঁচুতে তিন দিন থাকাটা কি আমার ঠিক হবে?
নিউইয়র্ক থেকে এসেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত সংগীতশিক্ষক। ডোলের লজে তাঁকে একঝলক দেখেছিলাম, অবসর নিলেও বয়স মোটেই বেশি না। সন্ধ্যায় এখানে দেখি ফিটজরয় হোটেলের লাউঞ্জে তাঁর গাইড ও পোর্টারকে নিয়ে সংগীতশিক্ষার আসর বসিয়েছেন। হিমালয়ের কোলে এই উঁচুতে গিটার কোথা থেকে এল, কে জানে। পাহাড়ের কাছে বসে সুরের মূর্ছনা কান পেতে শুনি।
রাতে ডালভাত খাওয়া শেষে আমার গাইড বলে রাখে, যদি গভীর রাতে মেঘ কেটে যায়, আকাশে তারা দেখা যায়, তাহলে আমাকে সে সাড়ে তিনটায় ডেকে দেবে। রাতের অন্ধকারেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। পাহাড়ের গা বেয়ে, পাথর ডিঙিয়ে ওপরে উঠতে আমার সময় লাগবে বেশি। তাই একটু আগে রওনা হলে সূর্যোদয়ের আগেই অনেকটা ওপরে উঠে যেতে পারব। ভোরের প্রথম আলোয় দেখতে পারব মাউন্ট এভারেস্টসহ অন্য সব পর্বতশিখর। তেজ মনে করিয়ে দেয়, সকালে সূর্য উঠলেও পরে মেঘ এসে সবকিছু ঢেকে দিতে পারে। যেমন আজ সকালটা মেঘমুক্ত ও রৌদ্রোজ্জ্বল ছিল, দুপুর হতেই চারপাশে মেঘ জমেছে।
প্রতিদিন রাত নয়টার মধ্যে আমরা ঘুমাতে যাই। কয়েকবার ঘুম ভাঙলেও সকাল ছয়টার আগে পর্যাপ্ত ঘুম হয়ে যায়। আজও তেমনি রাত ৯টায় শুয়ে পড়ি। রাত একটু গভীর হওয়ার পর ঘুম ভেঙে গেলে পর্দা সরিয়ে জানালার সামনে দাঁড়াই। কী অপরূপ উজ্জ্বল রাতের আকাশ। তারার আলোয় ছেয়ে আছে সারা আকাশ। আকাশে এত তারা আমি আর কোথাও দেখিনি। মেঘের কোনো চিহ্ন নেই। তাহলে কী চমৎকার একটা সূর্যোদয় দেখতে পাব? রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে নীল আকাশ আর শুভ্র তুষারঢাকা পর্বতশিখর দেখতে পাব? ঘড়ি দেখে বুঝি এখনো অনেক সময় বাকি, আবার শুয়ে পড়ি। উত্তেজনায় ঘুম আসে না।
তেজ আমাকে ডেকে তোলার অনেক আগেই উঠে তৈরি হয়ে নিই। পৌনে চারটায় আমি আর তেজ বেরিয়ে আসি। যার যার কপালে বাঁধা হেডল্যাম্পের আলোয় পথ দেখে পাথর ও জলাভূমি ছাড়িয়ে পাহাড়ের পায়ের কাছে পৌঁছে যাই। অভিযাত্রীর মতো পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকি। রাতের অন্ধকারে পাথর ডিঙিয়ে, ছোট ছোট পা ফেলে খাড়া চড়াই ধরে এঁকেবেঁকে উঠতে থাকি। ঘণ্টাখানেক ওঠার পর তেজ আমাকে ডেকে নিচের দিকে দেখায়। আমাদের হোটেলের সামনে থেকে আরও কয়েকটা হেডল্যাম্প এগিয়ে আসছে। অর্থাৎ অন্যরাও আসছে।
সেদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখার মতো সময় নেই। আকাশে কত তারা জ্বলছে, তা-ও ভালোভাবে দেখা হয় না। আমার পুরো মনোযোগ পায়ের কাছে। মাটি ও পাথরের দিকে দৃষ্টি। ঠিকমতো পা ফেলে খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠি। ওপর দিকে তাকিয়ে পথ শেষ হওয়ার কোনো চিহ্ন দেখতে পাই না। আরও পরে বুঝেছি, আরোহণকালে কখনোই শৃঙ্গের দেখা পাওয়া যায় না, যতক্ষণ না একেবারে শিখরের কাছে পৌঁছানো যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফরসা হয়ে আসে আকাশ, ভোরের নরম আলো আমাদের পথ দেখায়। আমাদের পরে যাত্রা শুরু করেও বেন, রিচার্ড, মাইকেল ও আরও কয়েকজন তরুণ আমাকে পাশ কাটিয়ে ওপরের দিকে এগিয়ে যান।
আরও কিছুক্ষণ এভাবে হাঁটার পর সূর্যোদয় দেখি। পর্বতশিখরের পেছন থেকে সূর্য ওঠে বলে প্রথম কয়েক মিনিট সেই আলো দেখা যায় না, পাহাড়গুলোকে অন্ধকার দেখায়। কয়েক মিনিট পরই একসঙ্গে সব ঝলমল করে ওঠে। ওই তো লোৎসে, আর ওই এভারেস্ট, তার থেকে অল্প দূরে ওই যে প্রিয় পুমোরি। এক প্রান্তে থামশের্কু আর একেবারে অন্য প্রান্তে চো ওইউ।
এখন বেশির ভাগ পর্বতশিখরই আমি চিনতে পারি। কেউ বলে না দিলেও অসুবিধা হয় না। কষ্ট হয় বাকিটুকু হেঁটে পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছাতে। শেষ ৩০ মিনিটকে প্রথম এক ঘণ্টার মতো দীর্ঘ লাগে। নিজের ভেতরকার প্রেরণাকে জাগিয়ে রাখতে চেষ্টা করি। চেষ্টা করি মনের জোরকে শরীরের শেষ শক্তিটুকুর সঙ্গে যুক্ত করতে। চারদিকের প্যানোরামিক ভিউ আর সর্বোচ্চ শিখরগুলো আমার ক্লান্তি দূর করে দেয়। আমাকে উৎসাহ দেয় অন্য সবাই। চারদিকের পর্বতশিখরের সম্মোহনী ডাক, অন্যদের উৎসাহ, আর নিজের মনের প্রবল ইচ্ছেশক্তি, সব একত্র হয়ে আমাকে টেনে নেয়। অল্প দূরে পতাকা উড়ছে। ওই দূরত্বটুকু পার হয়ে কখন কীভাবে লক্ষ্যে পৌঁছে গেলাম, বুঝতেই পারিনি।
প্রেয়ার ফ্ল্যাগ আর নানা রঙের কাপড়ে সাজানো গোকিও রির শীর্ষে দাঁড়িয়ে আনন্দ ও উত্তেজনা অনুভব করি। ‘গোকিও রি ৫৩৫৭ মিটার’ লেখাটির সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানায় বেন। আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য দাঁড়ায়। আবার এসেছি হিমালয়ে! সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রোদঝলমলে সকাল দেখি। তুষারঢাকা সুউচ্চ পর্বতশিখর দেখি। পাথর ও বরফ বুকে নিয়ে শুয়ে থাকা বিশাল হিমবাহ দেখি।
পর্বতশিখরের উচ্চতা যেমন আমাকে বিস্মিত করে, তেমনি আমাকে অভিভূত করে এই হিমবাহের নীরব ব্যাপ্তি ও বিশালতা। হিমবাহটির বিস্তারকে মনে হয় আদি ও অন্তহীন। উচ্চতায় তারতম্য আছে, তবু প্রতিটি পর্বতশিখরকে মনে হয় আকাশছোঁয়া। এই বিশালতার পটভূমিতে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা আমার ট্রেকসঙ্গীদের সবাইকে ছোট্ট ছোট্ট পুতুলের মতো দেখায়। নিজেকে ছোট ও অকিঞ্চিৎকর লাগে। এই অপরূপ ও অসীম প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নত ও নীরব হয়ে থাকি।