কাঁঠালের তৈরি বিরিয়ানি, বার্গার, পিঠা ও বিস্কুট
কাঁঠালের তৈরি বিরিয়ানি, বার্গার, পিঠা ও বিস্কুট

কাঁঠালের বিরিয়ানি থেকে বার্গার, কী নেই এই ফল মেলায়

রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে বসেছে জাতীয় ফল মেলা ২০২৬। তিন দিনের মেলাটি শেষ হচ্ছে আজ ২০ জুন রাত আটটায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় এই মেলায় আছে প্রায় ৮০টি স্টল। ফল মেলা ঘুরে এসেছেন এম এ হান্নান

নীল-সাদা বেলুনে ছাওয়া ফটক গলে মেলায় পা রাখতেই চোখে পড়ে পানিতে ভাসমান পদ্মফুলের আদলে বানানো ফলের প্রদর্শনী মঞ্চ, যার নিচের সারিতে বৃত্তাকারে সাজানো হয়েছে পরপর কাঁঠাল, ড্রাগন ফল, ডেউয়া, অগ্নিশ্বর কলা, কামরাঙা, সফেদা, কতবেল, বিলাতি গাব, গোলপাতার ফল, জাম্বুরা, চাপালিশ, তাল, নারকেল ও বেলের মতো ফল দিয়ে।

ওপরের সারি সাজানো হয়েছে আনারস দিয়ে। তারপরই পানিতে ভাসছে ফলের ডালা নিয়ে পদ্মফুল। একেক পাঁপড়িতে ঠাঁই পেয়েছে একেক রকমের ফল। আর ফুলের কেন্দ্রে জায়গা পেয়েছে লেবু, তাল, ড্রাগন আর কাঁঠাল।
দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন, ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন এবং সঙ্গে থাকা শিশুদের পরিচয় করে দিচ্ছেন বিভিন্ন রকমের ফলের সঙ্গে।

আইবি চত্বরে বসেছে জাতীয় ফল মেলা

কত আম

শুরুটা করলাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্টল থেকে। এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে দেশি-বিদেশি হরেক রকম ফলের সংগ্রহ।

এক আমেরই আছে ৫৪ জাতের সংগ্রহ। দেশি আমের মধ্যে আছে আম্রপালি, হিমসাগর, হাঁড়িভাঙা, ল্যাংড়া, ফজলি, নাগ ফজলি, সুরমা ফজলি, গোপালভোগ, জাদুভোগ, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, সীতাভোগ, মায়াভোগ, কল্যাণভোগ, বঙ্গভোগ, আশ্বিনা, ঝিনুক আশ্বিনা, গুটি আম, জর্দাগুটি, ভাদুরীগুটি, সেলেগুটি, কালীগুটি, দারিকা, টিক্কাফরাস, দুধসর, ডালভাঙা, আরাজাল, পোল্লাদাগি, রাঙ্গুরাই, গৌরমতী, বাবলা, কোহিতুর, মল্লিকা, ইলামতি, বারি ৪, বারি ৮, বারি ১৩, বারি ১৪।
বিদেশি রঙিন ও বৈচিত্র্যময় আমের মধ্যে আছে আমেরিকান রেড পালমার, জাপানের মিয়াজাকি, থাই কাটিমন, তাইওয়ান গ্রিন, মহাচানক, লেডিজেন, আরটুইটু, পুষা উর্নিমা, আলফানসো, কিউইজাই, ব্যানানা ম্যাংগো, ব্রুনাই কিং, নামডকমাই, মুর্শিদাবাদ, হানি ডিউ, কিং অব চাকাপাত ও চিয়ারং মাই।

নানা জাতের আম আছে মেলায়

আরও ফল

অন্যান্য ফলের মধ্যে আছে গোলপাতার ফল, সৌদি খেজুর, খুদিজাম, পেঁপে, লিচু, সফেদা, কাগজি লেবু, তরমুজ, করমচা, পেয়ারা, কাউফল, চাপালিশ, সিলেটি জারালেবু, সাতকরা, বাতাবি লেবু, মাল্টা, আলুবোখারা, রামবুটান, লটকন, জামরুল, গাব, তৈকর, পার্সিমন শরিফা, আমলকী, লুকলুকি, করোসল, কোকো, বেল, আঙুর ও ড্রাগন ফল।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) স্টলের সামনে বানানো বাংলাদেশের মানচিত্র, তাতে শোভা পাচ্ছে কোন কোন অঞ্চলে কী কী ফল জন্মে তার উপস্থাপনা।

টেবিলে মিষ্টি, তেঁতুল, আঙুর, কতবেল, টিস্যু কালচারের আনারসের চারাসহ আছে চারটি ভিন্ন ভিন্ন জাতের থোকা থোকা সৌদি খেজুর-ডিগলেট নূর, সুক্কারি, আজওয়া, বারহি। সঙ্গে আছে কোন খেজুর গাছ দেখতে কেমন, তার ছবি।

আরও আছে নানা জাতের ফল

আছে মাকাল ফলও

পাশে উপস্থাপন করা হয়েছে দেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের ফল—কেওড়া, সুন্দরী, পশুর, বাইন, কানাইডিঙ্গা, হাড়গোজা ইত্যাদির ফল।
ভেতরে দেশি-বিদেশি নানা রকম আমের সঙ্গে পাবেন পাঁচ রকমের লিচুর দেখা—বোম্বাই, বেদানা, চায়না থ্রি, সীতাপাটি ও কাঁঠালি লিচু। আছে বিশাল আকৃতির মাকাল ফল, সবুজ আপেল, অগ্নিশ্বর কলা, ঢাউস আকৃতির দেশি বেলসহ আরও অনেক ফল। আছে সৌরশক্তিচালিত সেচযন্ত্রের প্রদর্শনীও।

পাশের স্টলটি বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের। এখানে শোভা পাচ্ছে ফল নয়, বরং ফল কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করা যায়, বিক্রি করা যায়, তার ধারণা।

কাঁঠাল দিয়ে কত কিছু

জাতীয় ফল কাঁঠালেরই আছে অনেক রকম প্রক্রিয়াজাত খাবার। দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। আছে কাঁঠালের বিরিয়ানি, বার্গার, রুটি, নকশি পিঠা, জালি কাবাব, কাঠি কাবাব, ললিপপ, চিপস, শিঙাড়া, সমুচা, পাকোড়া, চিপস, সাশলিক, পাটিসাপটা পিঠা, কাটলেট, কাপ কেক ও পেস্ট্রি।

কাঁঠালের বীজের বরফি, বীজের চিপস, কাঁঠালের হালুয়া, কাঁঠালের পুডিং, আচারসহ আরও অনেক কিছু। কয়েকটা পদ চেখে দেখার সুযোগও আছে। আমিও ১০ টাকায় একটা জালি কাবাবের স্বাদ নিলাম।
আছে আমের পুডিং, ডাবের পুডিং, তরমুজের পুডিং। তালের বড়া, তালের পিঠা, তালের পায়েস, আমের আমসত্ত্ব, ম্যাঙ্গো ক্যান্ডি, আমের ঝুড়ি পিঠাসহ কত কী!

কাঁঠালের নানা পদ

আছে ‘গোলাপি’ কাঁঠাল

পাশের হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের স্টল প্রদর্শন করছে কীভাবে দেশের বাইরে বিভিন্ন ধরনের ফল রপ্তানি করছে, সেই প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) স্টলে প্রদর্শিত হচ্ছে তাদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের ফল। প্রায় আধা কেজি ওজনের বিনা সফেদা-১ থেকে বিনা লেবু ১ ও ২, আমড়া, গাব, জাম, অ্যাভোকাডো। কাঁঠালের মধ্যে আছে লাল, গোলাপি কোষের কাঁঠাল ও আঠাবিহীন কাঁঠাল।

পাবেন কাঁঠালের শিঙাড়াও

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) স্টলে দেখা পাবেন বারির উদ্ভাবিত ফলের। ফলের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য হিসেবে এখানেও প্রদর্শিত হচ্ছে কলা ও কাঁঠালের চিপস, রেডি টু কুক কাঁচা কাঁঠালের স্লাইস, কাঁঠালের ভেজিটেবল মিট। আছে আম, কাঁঠাল, বরই, তেঁতুল ও আলু বোখারার আচার।

প্রদর্শনীর স্টল শেষে মেলার অন্য অংশে পা বাড়াতেই চোখে পড়ে প্রসপারেটি স্টলে শিঙাড়া ভাজছেন এক নারী, নাম আসমা সরকার। এ আবার যেনতেন শিঙাড়া নয়, বরং কাঁঠালে বানানো শিঙাড়া!

কাঁঠাল দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে সমুচা, পাকোড়া, চিজবল, কাটলেট, চাটনি ও আচার। চাটনি ও আচার ১২০ থেকে ২২০ টাকা, শিঙাড়া ও সমুচা প্রতিটি ও পাকোড়া তিনটি ২০ টাকা করে, চিজবল ৩০ টাকা ও কাটলেট ৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

ফল দেখা শেষে পাবেন ফল কেনার সুযোগও

ফলের মেলায় ফল কেনা

ঘুরে ঘুরে স্টলের প্রদর্শনীতে থাকা ফল দেখা শেষে পাবেন ফল কেনার সুযোগও। সারি সারি দোকানের সিংহভাগই আমের দখলে। বিভিন্ন জাতের আমের মধ্যে প্রতি কেজি আম্রপালি মিলছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, ল্যাংড়া ৬০ থেকে ১০০ টাকা, ব্যানানা ম্যাঙ্গো ৯০ থেকে ১১০ টাকা, তোতাপুরি আম ১১০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা ও বারি ৪ আম ৮০ থেকে ২০০ টাকায়। কোহিতুর আমের দাম ৭০ টাকা।

হিমসাগর হাঁড়িভাঙা, লক্ষ্মণভোগ, মল্লিকা ও ফজলি আম প্রতি কেজির দাম ৮০ টাকা। কাটিমন ও নাগ ফজলি ৯০ টাকা প্রতি কেজি। ব্রুনাই কিং ১৫০ টাকা, কিং অব চাকাপাত ২৫০ টাকা, আমেরিকান রেড পালমার ৩৫০ টাকা।
অন্যান্য ফলের মধ্যে কাঁঠাল মিলছে ৫০০ টাকার ভেতরে, ১০০ বোম্বাই লিচু ৬০০ টাকা, কাঁঠালি লিচু ৯০০ টাকা, বেদানা লিচু ১ হাজার ১০০ টাকা ও চায়না থ্রি লিচু ১ হাজার ৪০০ টাকা।

ড্রাগন ফ্রুট ৬৫ থেকে ১৫০ টাকা কেজি, জামরুল ১৫০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি, করমচা ১৫০ টাকা কেজি, জাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা প্রতি কেজি।
নরসিংদীর সাগর কলা ২৪০ টাকা প্রতি ডজন। মাশরুম বিক্রির স্টলে ২৫০ গ্রাম মাশরুম ৩৫০ টাকা, ৫ কেজি ওজনের মাশরুমের সার ১৫০ টাকা, ৫ পিসের মাশরুমের প্যাকেট ১০০ টাকা ও মাশরুমের চিপস ৩০ টাকা।