বিষয় নির্বাচনের সময় গুরুত্ব দিবে হবে আগ্রহকে
বিষয় নির্বাচনের সময় গুরুত্ব দিবে হবে আগ্রহকে

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় নির্বাচনের আগে নিজেকে করো তিনটি প্রশ্ন

লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক খালেদ মাহমুদ

উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল আঙিনায় পা রাখার সময়টি একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের খুব কাছ থেকে দেখে আমি অনুভব করেছি, অধিকাংশ শিক্ষার্থী, এমনকি অনেক অভিভাবকও বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক বৃত্তে বন্দী থাকেন। এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে কিছু আলোচনা করা দরকার।

বিজ্ঞান মানেই কি ডাক্তার বা প্রকৌশলী

আমাদের সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা চালু আছে, যে শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছে, তাকে অবশ্যই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। অভিভাবকেরা মনে করেন, এর বাইরে অন্য কিছু পড়া মানেই মেধার অপচয়। কিন্তু বিজ্ঞানে পড়ার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যৌক্তিক চিন্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা অর্জন।

তুমি যদি বিজ্ঞান ভালোবেসে থাকো, কিন্তু তোমার আগ্রহ যদি মানুষের মনস্তত্ত্ব বা আইন নিয়ে হয়, তবে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে সেখানে তোমার সফল হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণের চেয়ে বেশি। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারডিসিপ্লিনারি বা বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ছে। একজন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যখন আইন পড়ে, তখন তার প্রমাণের যৌক্তিকতা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে ভিন্ন হয়। তাই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সামাজিক চাপের চেয়ে নিজের মেধা কোন দিকে সায় দিচ্ছে, সেটি আগে খুঁজে বের করো।

ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকের বিভাজন

ব্যবসায় শিক্ষার অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, তাদের জন্য কেবল বিবিএ বা অ্যাকাউন্টিংই একমাত্র পথ। সামাজিক বিজ্ঞান বা মানবিকে পড়া মানেই ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়া, এমন একটি ভ্রান্ত ধারণাও আমাদের সমাজে বিরাজমান। অথচ নৃবিজ্ঞান, অর্থনীতি বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয় বর্তমান বিশ্বের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। ব্যবসায়িক পরিবেশ বুঝতে গেলেও মানুষের আচরণ বা সমাজকে বোঝা জরুরি। একজন শিক্ষার্থী যদি ব্যবসায় শিক্ষায় পড়ে অর্থনীতি বা সমাজবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নেয়, তবে সে বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক পটভূমিও দারুণভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবে। বিষয়কে বিভাগ দিয়ে সীমাবদ্ধ না করে জ্ঞান হিসেবে দেখতে শিখতে হবে।

নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতার মূল্যায়ন

অনেক শিক্ষার্থী বন্ধুদের দেখে বা ট্রেন্ড অনুসরণে বিষয় নির্বাচন করে। এটি সবচেয়ে বড় ভুল। বিষয় নির্বাচনের আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করা জরুরি:

কোন বিষয়টি পড়তে গেলে আমি ক্লান্ত বোধ করি না?

আগামী ১০ বা ২০ বছর নিজেকে কোন পেশায় দেখতে চাই?

আমার ব্যক্তিগত দক্ষতা (যেমন গণিত, সৃজনশীল লেখা বা কথা বলার দক্ষতা) কোন বিষয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই?

যদি তুমি বিজ্ঞানে পড়ার পর অনুভব করো যে তোমার আগ্রহ করপোরেট ম্যানেজমেন্টে বা সাংবাদিকতায়, তবে দ্বিধাহীনভাবে সেই পথে হাঁটো। মনে রাখবে, অপছন্দের বিষয়ে প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চেয়ে নিজের পছন্দের বিষয়ে সাধারণ মানের কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

অভিভাবকদের প্রতি

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনাদের উদ্বেগ আমি বুঝি। কিন্তু মনে রাখবেন, জিপিএ–৫.০০ পাওয়া বা ডাক্তার–ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবী প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। এমন অনেক পেশা এখন তৈরি হচ্ছে, যা আজ থেকে ১০ বছর আগে ছিল না।

আপনার সন্তান যদি বিজ্ঞানে পড়েও অন্য বিষয়ে পড়তে চায়, তবে তাকে নিরুৎসাহিত করবেন না। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া পড়াশোনা তাকে হয়তো একটি ডিগ্রি এনে দেবে, কিন্তু একজন সৃজনশীল ও সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে না; বরং তার রুচি ও আগ্রহকে সম্মান দিন। সে যদি তার পছন্দের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে, তবে সফলতা এমনিতেই ধরা দেবে।

পরিবর্তনের ভয় কাটিয়ে ওঠা

অনেকে মনে করেন, ১২ বছর এক ধারায় (যেমন বিজ্ঞান বা ব্যবসায় শিক্ষা) পড়ার পর হঠাৎ ধারা পরিবর্তন করলে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। এটি একটি অমূলক ভয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা স্কুল–কলেজের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শেখার সুযোগ থাকে। একজন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যখন বিবিএ বা আইনে আসে, তখন তার গাণিতিক ও যৌক্তিক ভিত্তি তাকে অন্য অনেকের চেয়ে এগিয়ে দেয়। একে বলা হয়, ‘ট্রান্সফারেবল স্কিল’ বা স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা।

বিশ্ববিদ্যালয় মানে কেবল একটি চাকরি পাওয়ার সনদ অর্জনের জায়গা নয়, নিজেকে আবিষ্কারের জায়গা। তুমি যে বিভাগ থেকেই আসো না কেন, আগ্রহের বিষয়টিতে যদি পরিশ্রম করো, কর্মক্ষেত্রে তোমার জন্য অভাবনীয় সুযোগ অপেক্ষা করবে। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ও মানবিকবিদ্যার সমন্বয়কারী মানুষের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই বিভ্রান্ত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো। নিজের সক্ষমতা ও আগামী দিনের স্বপ্নের মধ্যে সমন্বয়ই হলো বিষয় নির্বাচনের মূল মন্ত্র। প্রথাগত চিন্তার শিকল ভেঙে নিজের প্যাশনকে গুরুত্ব দাও, বিজয় তোমার হবেই।