গোপন ক্যামেরা নিয়ে একজন ছিলেন সামনে, একজন পেছনে। যাত্রীদের মধ্যেই ছিলেন ৫ জন অভিনয়শিল্পী।
গোপন ক্যামেরা নিয়ে একজন ছিলেন সামনে, একজন পেছনে। যাত্রীদের মধ্যেই ছিলেন ৫ জন অভিনয়শিল্পী।

বাসে সদরঘাট থেকে উত্তরা, হয়ে গেল সিনেমা

হোয়াট ইফ সিনেমায় মূল চরিত্রের কোনো নাম নেই।

‘কেন, নাম নেই কেন?’ জানতে চাই।

‘কারণ, এটা বাংলাদেশের সেই সব নারীর গল্প, যাঁরা জীবনে একবার হলেও পাবলিক বাসে চড়েছেন। আমার সিনেমার মূল চরিত্র তাঁরা সবাই। তাই নির্দিষ্ট করে কোনো নাম নেই,’ বললেন তানহা তাবাসসুম।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীর তৈরি ছবিটিই এবার ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘প্যানোরামা ট্যালেন্ট’ সেকশনে জিতে নিয়েছে সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার।

কোনো বাজেট ছাড়াই বানানো হয়েছে ছয় মিনিটের হোয়াট ইফ। ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের শিক্ষার্থী তানহা জানালেন, ২০২১ সাল থেকে, অর্থাৎ যখন থেকে কলেজে ভর্তি হয়েছেন, তখন থেকেই তিনি পাবলিক বাসে চড়েন। সেই সময় থেকে একটু একটু করে মাথার ভেতরে তৈরি হয়েছে সিনেমাটি।

তানহা বলেন, ‘প্রত্যেক নারীর পাবলিক বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা এক কথায় “বাজে, জঘন্য, ভয়াবহ”। কেউ বাধ্য না হয়ে পাবলিক পাসে চড়েন না। যখনই কোনো বান্ধবী বা অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতাম, তাঁদের কাছ থেকে পাবলিক বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা জেনে নিতাম। সেসব টুকরা টুকরা অভিজ্ঞতা জড়ো করে চিত্রনাট্যটা লেখা।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকল্পের অংশ হিসেবে ছবিটা তানহা তৈরি করেননি। বিশেষ কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের কথাও তাঁর মাথায় ছিল না। সিনেমাটা না বানিয়ে থাকতে পারছিলেন না, তাই বানিয়ে ফেলা।

তানহা বলেন, ‘শুরুতে ভেবেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বাসে শুটিং করব। কিন্তু বাসভর্তি যাত্রী-শিল্পী জোগাড় করা, সবাইকে আলাদা করে চিত্রনাট্য বোঝানো…বিরাট হ্যাপা। সব মিলিয়ে একদিন সকালে ভার্সিটিতে এসে বন্ধুদের নিয়ে গেরিলা শুটিংয়ে চলে গেলাম।’

গেরিলা শুটিং বলতে বোঝায়—কোনো বড় আয়োজন, অনুমতি বা বাজেট ছাড়াই দ্রুত, গোপনে, অল্প সরঞ্জাম নিয়ে শুটিং করে ফেলা। যেই ভাবা সেই কাজ। সদরঘাট থেকে বাসে উঠে পড়েন তাঁরা আটজন। গন্তব্য উত্তরা। গোপন ক্যামেরা নিয়ে একজন ছিলেন সামনে, একজন পেছনে।

যাত্রীদের মধ্যেই ছিলেন ৫ জন অভিনয়শিল্পী। সঙ্গে পরিচালক তানহা। গন্তব্যে পৌঁছে আর ১০ জন যাত্রীর মতোই ভাড়া দিয়ে নেমে গিয়েছেন তানহারা। ব্যাস, এর মধ্যেই হয়ে গেছে শুটিং।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তানহা তাবাসসুম

স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাটির পর্দায় যে যাত্রীদের দেখা যায়, তাঁরা সবাই সাধারণ যাত্রী। তাঁদের অভিব্যক্তি, সংলাপ—সবই আসল! কারণ, তাঁরা তো জানতেনই না শুটিং চলছে! এই সিনেমার চিত্রনাট্য বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত।

কিন্তু বাসে বসে থাকা যাত্রীরা নারীদের হয়রানি প্রসঙ্গে যে মন্তব্যগুলো করেছেন, সেগুলো একেবারে বাস্তব, আমাদের সমাজের সত্যিকারের চিত্র! তাঁর ছবিতে দর্শকদের সেই ধাক্কাটাই দিয়েছেন তানহা।

তানহা বলেন, ‘বাজেট ছিল না। সত্যিকারের অভিনয়শিল্পী জোগাড় করার ঝামেলায় যেতে চাইনি বলেই এভাবে কাজ করা। কিন্তু এখন আমার মনে হয়, কাজটা এভাবেই হওয়ার ছিল। নতুবা এত সত্য এই ছবিটা কোথায় পেত?’

সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, একটি মেয়ে রঙিন জামাকাপড় পরে বাসা থেকে বের হচ্ছে। রাস্তার পাশে বখাটেরা যখন তাঁকে উত্ত্যক্ত করে, তখন থেকেই তাঁর জামার রং ঝাপসা হতে থাকে। বাসে যখন সে হয়রানির শিকার হয়, তখন মেয়েটির পোশাক আর চারপাশ সাদাকালো হয়ে যায়।

এভাবেই রাস্তায় বেরিয়ে পথ চলতে গিয়ে নারীর রঙিন স্বপ্ন আর আশা যেন প্রতিনিয়ত হোঁচট খেতে খেতে রং হারায়। যখন বাসের ভেতর এই নারী চরিত্রটি অযাচিত স্পর্শের শিকার হন, তখন সিনেমায় কোনো শব্দ থাকে না। হঠাৎই যেন থমকে যায় সবকিছু, যেমন হঠাৎ করে ধাক্কা খায় ওই নারীর স্বাভাবিক জীবন।

সেই নীরব স্পর্শের জঘন্য অনুভূতি এতটাই তীব্র যে চারপাশে কোনো কিছুই তখন আর ওই নারীকে স্পর্শ করে না। বাসের চালক ব্রেক কষে গাড়ি থামান আর সহকারী নির্দিষ্ট জায়গায় নামতে বলেন, তখন আবার স্বাভাবিক শব্দ ফিরে আসে।

ঘরে ফেরেন বাসে হেনস্তার শিকার সেই নারী। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত শরীরটা এলিয়ে দেন বিছানায়। কল্পনায় আবার চলে যান বাসের ভেতর। কল্পনাতেই সেই হেনস্তাকারীকে কষে একটা চড় মারেন।

ছবিটা এখানেই শেষ হয় বটে। তবে তানহা তাবাসসুমের এই চলচ্চিত্র নিশ্চয়ই দর্শকের মনে অনেক প্রশ্ন রেখে যায়। একজন পরিচালকের সার্থকতা তো এখানেই।