
এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে সেই দিনের কথা। খুব ছেলেবেলায় সন্জীদা আপার হাত ধরে একবার বেড়াতে গিয়ে শুনলাম তাঁর গান। সেই অপূর্ব সুন্দর, নিটোল গলা, ওপরে-নিচে কী সহজ ভঙ্গিতে ছুঁয়ে যাচ্ছে সুরগুলো, পুরো ঘর যেন সেই সুরের মূর্ছনায় ভরে গেল। ওই বয়সে তো গানের ব্যাপারে তেমন কিছু বুঝি না, তবে সেই মুহূর্তেই মনস্থির করে ফেলেছি যে যদি গান শিখি তবে ওঁর কাছেই শিখব, অন্য কারও কাছে নয়। কলিম ভাই সম্ভবত তখনো চট্টগ্রামে থাকতেন, পরে যখন ঢাকায় এসে বাফায় সংগীতশিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন, আমি তক্ষুনি ভর্তি হয়ে গেলাম বাফাতে।
কত যত্ন করে গান শেখাতেন কলিম ভাই—কত-কী না শিখেছি তাঁর কাছে! হারমোনিয়ামের ওপর নির্ভর করে গান গাওয়া মোটেই পছন্দ করতেন না। তিনি আমাকে হারমোনিয়াম ধরতেই দেননি, বলতেন, ‘দরাজ, খালি গলায় গান গাইবে। গলা দিলে হারমোনিয়াম বাজাবে না। তাহলেই গলাটা তোমার নিজের বশে থাকবে। যেকোনো গান এতবার গাইবে যেন মুখস্থ হয়ে যায়। ফলে লোকের সামনে গাইতে গেলেও যেন গলা দিয়ে আপনা থেকে গানটা বেরিয়ে আসে, যতই নার্ভাস হও না কেন। মঞ্চে গান গাওয়ার আগে গুনে গুনে এক শ বার গানটা গাইবে, তখন দেখবে, কোনোমতেই ভুল হবে না।’ প্রাণপণ চেষ্টা করতাম ওঁর কথামতো চলতে। তাই এখনো দেখি, কলিম ভাইয়ের শেখানো সব গান আমি বই না দেখেই গাইতে পারি—এত দিনেও কিছুই ভুলিনি!
গান গাইবার সময়, স্পষ্ট-উচ্চারণে প্রতিটি শব্দ কীভাবে বলতে হবে সে ব্যাপারে খুব যত্নশীল ছিলেন তিনি। বলতেন, ‘যেন গানের কথাগুলো সহজেই শ্রোতার মনে দাগ কাটে, তেমনিভাবে গানটাকে উপস্থাপন করতে হবে। গানটা নিজের করে নিয়ে অর্থাৎ এ যেন আমারই কথা, শ্রোতাকে সঙ্গে নিয়ে গাইতে হবে এমনভাবে।’
অল্পদিন পরই তিনি বাফায় গান শেখানো বন্ধ করে দিলেন। আমিও সঙ্গে সঙ্গে ছাড়লাম বাফায় গান শেখা। ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি কোথায় গান শিখব?’ কলিম ভাই সেই সময় শান্তিনগরে থাকতেন। তিনি বললেন, ‘তুমি আমার বাসায় এসে গান শিখবে।’ আমরা তখন সেগুনবাগানে (সেগুনবাগিচা) থাকতাম। মেজদিকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটেই যেতাম ছুটির দিনে সকালে গান শিখতে।
সেই সময় বেশ অনেকগুলো পূজাপর্যায়ের ভোরবেলার সুরের গান শিখেছি। যেমন ‘মোর প্রভাতের এই প্রথমক্ষণের কুসুমখানি’, ‘যতক্ষণ তুমি আমায় বসিয়ে রাখো বাহির বাটে’, ‘তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথা তারি পারে’, ‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে’ ইত্যাদি আরও বহু গান। এ সময় রেডিওতে শুধু সকাল সাতটার সময় রবীন্দ্রসংগীত প্রচার হতো। সকালে গান এত বেশি শোনা হয়েছিল যে একই গান বছরে দুবার গাইতে হয়নি।
আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি, তখন প্রথম একক গান গেয়েছি কার্জন হলের মঞ্চে—কলিম ভাইয়ের নির্দেশনায়, ‘প্রভু আমার, প্রিয় আমার পরম ধন হে/ চির পথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে।’ গানটিতে মিড়গুলো এমন সুন্দর করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে সেবারই প্রথম গান গেয়ে কলিম ভাইকে খুশি করতে পেরেছি, ওঁর প্রশংসা পেয়েছি।
সেই সময়ে উনি ‘হযবরল’ নামে একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন, যার মাধ্যমে নানা রকম সংগীতানুষ্ঠান, পয়লা বৈশাখে নানা রকম গান ইত্যাদি আসরের জমজমাট আয়োজন করে মানুষকে মাতিয়ে রাখতেন। ড. আনিসুর রহমান, সংগীতশিল্পী আবদুল লতিফ, কামেলা শরাফীসহ আরও বহু লোক নিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশ মঞ্চায়িত করেছিলেন খুব অভিনবভাবে। মঞ্চে এঁরা সবাই গান গেয়ে অভিনয় করেছেন, যেটা ঢাকার দর্শক আগে কখনো দেখেনি। কলিম ভাইয়ের নিজের বাসা এবং আনিসুর রহমান সাহেবের বাবার বাড়ির ছাদেও গান শেখানো চলত। আমি সেখানে শিখেছিলাম, ‘মহারাজ, এ কী সাজে/ এলে হৃদয়পুর মাঝে’। এই গোষ্ঠীর একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নাসিরুল হক সাহেব। তাঁর বাড়িতেও গানের আসর বসত। সংগীতশিল্পী ফজলে নিজামী, জাহিদুর রহিম, চৌধুরী আবদুর রহিম—এঁরা সবাই এসব আসরে গান গেয়েছেন। আমিও গেয়েছি, তবে অনিয়মিতভাবে, কারণ যাতায়াতের অসুবিধা ছিল আমার।
আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তখন কলিম ভাই আমাকে দিয়ে ধারাপাত নামের চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীত গাইয়েছিলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে/ তুমি জান নাই, আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে’। সে সময়ে রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডিংয়ের ব্যাপারে অনেক বিধি-নিষেধ ছিল। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের ছাড়পত্র নিয়ে তবেই রেকর্ড করতে হতো। সময়টা খুব সম্ভবত ১৯৬৩ হবে। এ সত্ত্বেও কলিম ভাই গানটি রেকর্ড করেছিলেন, একটু কৌশল করে। গানটির শেষ দুই লাইন গাওয়ানো হয়নি—আংশিক গানের জন্য ওই নিয়ম প্রযোজ্য নয়, এই ধরে নিয়ে।
আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঠিক আগে, দেশ যখন বিক্ষোভ-আন্দোলনে উত্তাল, সেই সময় আফসারী খানম, বিলকিস নাসিরুদ্দিন, কলিম ভাই, সন্জীদা খাতুন, রাখী চক্রবর্তী এবং আমার—সবার দুটো করে গান করাচিতে গিয়ে রেকর্ডিং করে একখানি অ্যালবাম প্রকাশ করা হয় ইএমআইয়ের মাধ্যমে। কলিম ভাই তখন ইএমআইয়ের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। এই গানগুলো পরে পশ্চিমবঙ্গেও প্রকাশিত হয়েছিল, তিনটি এক্সটেনডেড প্লে-র অ্যালবামরূপে।
এই যে আজ আমি গান গাইছি, তা তো শুধু অন্যদের শোনানোর জন্য নয়, এর অনেকখানিই নিজের জন্যও। এমন অনেক সময় আসে যখন কোনো গানের হয়তো দুটো লাইন মনের মধ্যে বাজতে থাকে সারা দিন ধরে, ঘুরেফিরে গুনগুন করে। পুরো মনটা ডুবে থাকে সেই সুরে—সে এক অদ্ভুত অনুভূতি! এভাবে যে গানকে ভালোবাসতে শিখেছি, তার জন্য আমি অনেকাংশেই ঋণী সেই মানুষটির কাছে, যাঁর গাওয়া গানকে ভালোবেসে আমি গান শিখেছি; তিনি আমার সংগীতগুরু কলিম শরাফী। গতমাসে চলে গেল তাঁর প্রয়াণ-দিবস। তাঁকে জানাই আমার অশেষ শ্রদ্ধা।