সাম্প্রতিক

বইমেলায় মেলা বই

কেমন ছিল পুরোনো দিনের বইমেলা? কেমন হওয়া উচিত আগামী দিনের বইমেলা? বইমেলার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতে একটি চক্কর।

জমে উঠেছে বইমেলা, ভিড় বাড়ছে মানুষের
ছবি: খালেদ সরকার

মেলা পণ্যসম্ভার, মেলা মানুষ আর খোলামেলা আবহে বিকিকিনি মানেই তো মেলা। ক্রেতা-বিক্রেতা আর মানুষে মানুষে মেলামেশার কেন্দ্রও মেলা—বইমেলায় গেলেও এমন ধারণাই মেলে। তবে এই মেলায় হরেক পণ্যসম্ভার মেলে না, মেলে কেবল হরেক রকম বই। আমাদের এই বইমেলার একটা পোশাকি নাম আছে, ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। পাঠকের চিত্তকে রঞ্জিত করার জন্য ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে মুক্তধারা প্রকাশনীর কর্ণধার ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে গোটা ত্রিশেক বই নিয়ে চটজলদি মেলা শুরু করেছিলেন বর্ধমান হাউসের বটতলায়।

আজ বইমেলার ক্রমবর্ধমান কলেবর দেখে বর্তমান প্রজন্মের কেউ সহজে বিশ্বাস করতে পারবেন না, ত্রিশ বছর আগে বইমেলা কেমন ছিল। যে কটি বইয়ের পসরা সাজিয়ে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার দুই মাসের কম সময়ের মাথায় আজকের বইমেলার বীজ বপন করা হয়েছিল, তার সবই ছিল কলকাতায় প্রকাশিত বাংলাদেশের শরণার্থী লেখকদের বই। তারপর বছর পাঁচেক মুক্তধারাসহ গোটা দুই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান টিমটিম করে টিকে ছিল বাংলা একাডেমির চত্বরে। বাংলা একাডেমি সক্রিয়ভাবে মেলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এগিয়ে আসে পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র নামের একটা সরকারি সংস্থা একসময় বইমেলার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু শীতঘুমে থাকা এই প্রতিষ্ঠানের স্বভাবসুলভ নীরব অবস্থানের কারণে এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা নামে নিরুত্তাপ জনহীন একটা বইমেলার আয়োজন করে আসছিল সংস্থাটি, বিগত বছরগুলোয় সেটিও বন্ধ আছে। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি গঠিত হওয়ার পর উভয় সমিতির মিলিত উদ্যোগে মেলার ক্রমবর্ধনশীল কলেবর বর্ধমান হাউস থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে, পরিণত হয়েছ বাঙালির প্রাণের মেলায়।

আশির দশকের প্রথম থেকে বইমেলাটি যখন সত্যিকার মেলার রূপ পায়, তখনো এটিতে ছিল কেবল পাঠক ও লেখকের পদচারণ, ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে লেখকদের প্রাত্যহিক বৈকালিক যোগাযোগের ঠিকানা হয়ে উঠত বাংলা একাডেমির চত্বর, মুঠোফোনবিহীন সেই সময়ে মেলার মধ্যে কাউকে খুঁজে বের করা কঠিন কিছু ছিল না। ভিড়ভাট্টাহীন মেলাপ্রাঙ্গণে বসন্তের বিকেল ও সন্ধ্যাগুলো ছিল বইপ্রেমীদের পরম আরাধ্য একটা জায়গা। এখনকার মতো জৌলুশ তখন ছিল না ঠিকই, কিন্তু ছিল পারস্পরিক পরিচিতির নিবিড় আকর্ষণ। এখন যেমন বুম বাগিয়ে এগিয়ে আসে টেলিভিশনের রিপোর্টার, তখন নতুন বই কিংবা বইমেলার কড়চা লেখার মসলার খোঁজে নোটবই নিয়ে গোয়েন্দাদের মতো নীরবে ঘুরে বেড়াত সংবাদকর্মীরা। এখন মেলায় ঢোকার পর যখন পথ গুলিয়ে যায়, তখন মাথা তুলে থাকা স্বাধীনতা স্তম্ভটি কিংবা রমনা কালীবাড়ির চূড়া যেন বাতিঘরের কাজ করে। এটি যে সবার ক্ষেত্রে ঘটে তা হয়তো নয়, কারও কারও এ রকম হয়। যেমন সিঙ্গাপুরের কিনুকুনাইয়া নামের বুকস্টোরটিতে ঢুকে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়তে হয়।

বইমেলার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ খুব নীরবে একটি নতুন প্রবণতার জন্ম দিয়েছে আমাদের প্রকাশনায়। এখন বই প্রকাশ মানেই একুশে মেলায় বের হওয়া বই এবং মৌসুমি ক্রেতা মানেই বইমেলার ক্রেতা। এদের অনেকে আবার মেলা থেকে কেনা বইয়ের সচিত্র প্রমাণ মেলে ধরেন ফেসবুকে। লেখকেরা তাঁদের বই প্রকাশ সম্পর্কে প্রায়ই দুটো পরিচিত প্রশ্নের মুখোমুখি হন। প্রকাশকের কাছ থেকে শোনেন, ‘এবার একুশে মেলায় আমাদের কী বই দেবেন?’ আর পাঠকের কাছ থেকে শোনেন, ‘এবার বইমেলায় আপনার কী বই আসবে?’ কিংবা ‘কী বই এসেছে?’ যেন একুশের গ্রন্থমেলা ছাড়া বই প্রকাশ করা যায় না কিংবা কেনারও সুযোগ নেই। স্বল্পসংখ্যক প্রকাশক অবশ্য বছরজুড়েই বই প্রকাশ করেন। এই প্রবণতা যে লেখকদেরও কিছুটা আলস্যপ্রবণ করেনি—সেটি জোর দিয়ে বলা যায় না, তাঁদেরও লক্ষ্য থাকে ফেব্রুয়ারির মেলা ধরা, ফলে এই ধরাধরিতে প্রিন্টার আর বাইন্ডারদের হয় একেবারে ধরাশায়ী অবস্থা। একুশের মেলাকে ঘিরে বই প্রকাশের বাপারে বেশি আগ্রহ দেখা যায় নবীন লেখক কিংবা কবিযশপ্রার্থীদের। মুদ্রণশিল্পের উৎকর্ষের সঙ্গে সহজতর হয়েছে বই প্রকাশ, সুতরাং নবীন লেখকদের আত্মপ্রকাশে দূরীভূত হয়েছে বাধা। তাঁদের অপরিচিতিও এই প্রকাশে বাদ সাধতে পারেনি।

বইমেলায় দুই ধরনের মানুষের সমাগম হয়—পাঠক ও ক্রেতা, অন্যপক্ষে নিছক দর্শক কিংবা পরিদর্শক। দ্বিতীয়পক্ষের দর্শন বিনোদনধর্মী, যেহেতু বিনোদনই তাদের ধর্ম, বই কেনার মতো কর্মে মতি নেই তাদের। এই শ্রেণির আবার একটি হিতৈষী মহল আছে, তারা যে তত্ত্বের সমর্থক, সেটির নাম ‘অসীমসংখ্যক বানর তত্ত্ব’। এই গাণিতিক তত্ত্বের তত্ত্বাবধানে অসীমসংখ্যক বানরকে যদি অসীমসংখ্যক টাইপরাইটের ওপর অসীম সময় টাইপ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়, তাহলে একসময় তাঁরা নিশ্চিতভাবে শেকস্‌পিয়ারের হ্যামলেট বা নিদেনপক্ষে একটি সনেট টাইপ করে ফেলবে। বইমেলার দর্শকহিতৈষী শ্রেণির দর্শন এবং এই উপপাদ্য অনুযায়ী অসীমসংখ্যক দর্শকও বইমেলার চিত্তাকর্ষক পরিবেশে ক্রমাগত যেতে থাকলে ঘুরতে ঘুরতে একসময় একখানা বই কিনে ফেলতেও পারে। সুতরাং তাঁদের নিরুৎসাহিত করা ঠিক হবে না।

ভিড়ভাট্টাহীন মেলাপ্রাঙ্গণে বসন্তের বিকেল ও সন্ধ্যাগুলো ছিল বইপ্রেমীদের পরম আরাধ্য একটা জায়গা। এখনকার মতো জৌলুশ তখন ছিল না ঠিকই, কিন্তু ছিল পারস্পরিক পরিচিতির নিবিড় আকর্ষণ।

এই দর্শকশ্রেণির সংখ্যা সম্পর্কে কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান নেই বলেই আমরা তাঁদের অসীমসংখ্যক মনে করতে পারি। বইমেলা প্রাঙ্গণের ‘সীমার মাঝে অসীম’ দর্শকের সংখ্যা নির্ধারণের একটা সহজ সমাধান অবশ্য আছে। মেলায় ঢোকার জন্য যদি কমপক্ষে দশ টাকা প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা যায়, তাহলে অন্তত একটি বই কেনার সম্ভাবনাময় অসীম সংখ্যক দর্শকসহ সব শ্রেণির প্রবেশকারীর একটা হিসাব পাওয়া যাবে। এতে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের সংখ্যা না কমলেও বাংলা একাডেমি তার খরচের কিছুটা তুলে নিতে পারে। প্রস্তাবটিতে অনেকেই খাপ্পা হতে পারেন, প্রস্তাবককে খাপখোলা বাক্যবাণে আক্রমণও করতে পারেন, অথচ তাঁরা কি দেখছেন না যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরও আমাদের জনগণ বাড়তি খরচের সাঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে? তাহলে বইমেলায় দশ টাকা প্রবেশমূল্য বসালে সেটা কি খাপছাড়া মনে হবে? প্রতিবছর মাসজুড়ে যে বাণিজ্যমেলা হয়, যেখানে পাকিস্তানি থ্রিপিস কিংবা থাইল্যান্ডের হাতা-খুন্তি কেনার জন্যও মানুষকে হাতাহাতি করতে হয়, সেখানে ঢুকতে গেলে চল্লিশ টাকার টিকিট কাটতে কি মানুষের হাতটান হয়?

এই বইমেলাকে আমাদের প্রাণের মেলা বলা কি কেবলই আবেগের আতিশয্য? এটি না থাকলে কিংবা বন্ধ হয়ে গেলে প্রকাশনাশিল্পের সঙ্গে জড়িত একটা শ্রেণি কি ধনে–প্রাণে মারা পড়বে না? সুতরাং এটা যে কেবল প্রাণের মেলা তা নয়, ধনেরও মেলা। প্রকাশকদের দেওয়া হিসাবেই ২০২০ সালের মেলায় বিরাশি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি। তবে মেয়েদের বয়সের মতো প্রকাশকেরাও যদি বই বিক্রির অঙ্কটা কমিয়ে ঘোষণা দেয়, তাহলে পরিমাণটা নিশ্চিত আরও বেশি হবে। সুতরাং বইমেলায় মেলা বই আসুক, অসীমসংখ্যক মানুষের ‘চরণধুলায় ধূসর’ হোক পুরো রমণীয় রমনা, তবে কেবল একুশের মেলায় নয়, সর্বত্র যদি মেলে কাঙ্ক্ষিত বই, বইয়ের পাতা যদি মেলে ধরা যায় সারা দেশের মানুষের কাছে—সেটিই হবে আসল মেলা।