জয়নুল আবেদিন (২৯ ডিসেম্বর ১৯১৪—২৮ মে ১৯৭৬)
জয়নুল আবেদিন (২৯ ডিসেম্বর ১৯১৪—২৮ মে ১৯৭৬)

সাম্প্রতিক

জয়নুলের বিশ্বায়ন

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত নিলামে বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্ম বিপুল দামে বিক্রি হয়েছে। নিলামকারী প্রতিষ্ঠান সদবি’স আয়োজিত এই নিলামের মধ্য দিয়ে বর্তমান চিত্রবিশ্বে আবার নতুনভাবে আলোচিত হলেন জয়নুল

পূর্ববঙ্গের চাল উৎপাদনকারী জেলা ময়মনসিংহের সন্তান জয়নুল আবেদিন ১৯৩২ সালে কলকাতায় শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তত দিনে চিত্র নির্মাণের নব্য বঙ্গীয় ধারা প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষাক্ষেত্রেও আলাদা ‘স্কুল’ বা ধারা হিসেবে তা শেখানো হচ্ছে। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই জয়নুলকে প্রাচ্য রীতি, যা নব্য বঙ্গীয় ধারার বিকল্প নামমাত্র, আর কিছু নয় এবং পাশ্চাত্য বাস্তবানুগ ধারার শিক্ষার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়। শিক্ষক মুকুল চন্দ্র দের অনুরোধ ছিল, জয়নুল যেন প্রাচ্য ধারায় শিক্ষা নিয়ে বঙ্গীয় আদর্শবাদীদের কাতারে যুক্ত হন। অথচ ‘স্বাদেশিক চেতনা’ বলে যে ভাববস্তু ভারতে তখন রাজনৈতিক চেহারা পেয়েছে, তার বিপরীতে বাস্তববাদ শিক্ষা নেওয়াই যুবক জয়নুল তাঁর ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেন। হলফ করে বলা যায়, বাঙালির বাঙালিত্ব সন্ধান একটি ‘নতুন “এলিট” গোষ্ঠীর মধ্যে জগৎ সমীক্ষা এবং জীবন বিষয়ে প্রত্যাশার যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছিল’ (তপন রায় চৌধুরী, ১৯৯৪), তারই ফলমাত্র। ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় ইউরোপের জাতীয়তার জ্ঞান বিলাতি শাসনের সূত্রে বুদ্ধিজীবীরা আয়ত্ত করেন। নতুন উচ্চবর্গ তৈরি যদি ব্রিটিশ শাসনের অবদান হয়ে থাকে, তবে উচ্চবর্গীয় বুদ্ধিজীবীর বাঙালি বা ভারতীয় পরিচয়ের রূপটিও ব্রিটিশ শাসনের আওতায় জ্ঞানচর্চার মধ্যেই জন্ম লয়। ইউরোপীয়দের দুঃশাসনের বিরোধিতার সূত্রে রাজনীতিতে যে জাতীয়তাবাদী মানসিকতা জন্ম নিল, তা উনিশ শতকের শেষ দিকে তীব্র আকার ধারণ করল। সাংস্কৃতিক জগতেও তার প্রভাব পড়ল। ফলে ‘ভার্নাকুলার’ বা দেশজ শিল্পভাষার সন্ধান প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল। অথচ শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নন্দলাল বসুর শিল্পচর্চা অনুসরণে যে বঙ্গীয় রীতির প্রবর্তন হলো, তা ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্পীদের প্রভাবিত করলেও অধিকাংশ অনুগামী শিল্পী এই শৈলীকে ‘অন্তঃসারশূন্য অনুকরণে পর্যবসিত করেছিল’ (আবুল মনসুর আহমদ, ২০১৬)। এই স্রোতের বিপরীতে জয়নুলের ইউরোপীয় বাস্তববাদ শিখে নেওয়ার অর্থ দাঁড়াল—শৈলীর অনুকারক না হয়ে নিজস্ব পথ তৈরির প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ। অর্থাৎ পরকীয় পদ্ধতি ধরে জয়নুল স্বকীয় ভাষায় গড়ার পথে হাঁটলেন। চল্লিশের দশকের শুরুতেই তাঁর কাজে স্বকীয়তা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় তাঁর আঁকা ‘দুর্ভিক্ষ’ চিত্রমালার মধ্য দিয়ে।

এখানে মনে রাখা জরুরি, জয়নুল একদিকে যেমন ইউরোপীয় বাস্তবানুগ শিল্পরীতির বৈশ্বিক প্রভাব মেনে নিয়ে নিজে তাঁর চর্চা শুরু করলেন, অন্যদিকে জাতীয় আদর্শবাদী ধারা, যা মূলত উচ্চবর্গীয় বুদ্ধিজীবিতার ফসল, সেই বঙ্গীয় শিল্পশৈলী থেকে দূরে থাকলেন জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার তাগিদে। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ভাষায় ‘প্রান্তিক মানুষের’ বা ‘আশরাফের’ বিপরীতে ‘আতরাফের’ পক্ষে নিজেকে দাঁড় করিয়ে শিল্পচর্চার নতুন পথ তৈরি করাই ছিল তাঁর শিল্পজ রাজনীতি। আন্দাজ করা চলে যে শিল্পশিক্ষা গ্রহণকালেই জয়নুল আবেদিন তাঁর শিল্পচর্চার ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

পাশ্চাত্য রীতি, অর্থাৎ বাস্তববাদের চর্চাও ঔপনিবেশিক শহর কলকাতা ও ভারতের অন্য আরও অনেক শহরে একপ্রকার এলিট চর্চা ছাড়া আর কিছু ছিল না। বিশেষ কিছু বিষয়বস্তু উচ্চবর্গের রুচির নিশানা অনুসরণে সৃষ্টি করা হতো। হেমেন মজুমদারের ‘নারী’-কেন্দ্রিক তেলচিত্র এখানে উল্লেখযোগ্য, যা সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠপোষকশ্রেণির চাহিদানির্ভর ছিল বললে সত্যের অপলাপ হয় না। অন্যদিকে জয়নুল ছিলেন ‘স্বভাব শিল্পী’—কামরুল হাসানের এই তকমা মেনে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, মুকুল চন্দ্র দের কথা অনুযায়ী প্রাচ্যকলার শিক্ষায় রাজি না হলেও জয়নুল ছিলেন তাঁর ‘প্রিয় পাত্র’, যা হওয়া ‘সহজ ব্যাপার ছিল না’। অর্থাৎ জয়নুল ছিলেন ছবি আঁকায় পটু। আর এই পটুত্বই তাঁর নিজ ভাষা নির্মাণের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

যাঁর মুখের বয়ান ময়মনসিংহের স্থানীয় ভাষার দ্বারা চিরনিয়ন্ত্রিত, সেই শিল্পীর স্থানিক মাত্রা অর্জনে কোনো বাড়তি চেষ্টার প্রয়োজন হয়নি। আতরাফের জীবনই ছিল তাঁর সারা জীবনের আরাধ্য। স্টাইল বা ভাষাভঙ্গির ওপর বাস্তবের পাঠকে তিনি তাঁর শিল্পের নিয়ন্তা হিসেবে গ্রহণ করে ঋজু তুলির আঁচড়ে গড়ে তুলেছেন সহজ এক শিল্পভাষা। পাশ্চাত্য বাস্তববাদী ছবির আলোছায়ার প্রয়োগকুশলতা বাদ দিয়ে শুধু রেখার শক্তির মাধ্যমে তিনি গড়ে তুললেন শক্তিশালী এক চিত্রভাষা। শৈলীর চেয়ে ‘সত্য’ হয়ে উঠল তাঁর পাথেয়। ছবি হয়ে উঠল মেদহীন ও বৈপ্লবিক।

দুটি দিক বিচারে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন শিল্পীজীবনের শুরুতেই এক বিপ্লবী ভাষার জন্ম দিলেন। সেই ভাষা কেমন?

 এক. তিনি আদর্শ শৈলীর ঘেরাজালে ধরা দিলেন না। দুই. এমন এক বাস্তববাদের জন্ম দিলেন যে ভাষায় উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর সত্য তুলে ধরা গেল। চিত্রকে তিনি গড়ে তুললেন রেখার রচনা হিসেবে। এর মধ্যে গড়ে তুললেন স্থান-জাতি-ধর্মনিরপেক্ষ এক বিশ্বজনীন ভাষা। অন্যদিকে বিষয়বস্তুর মধ্য দিয়ে তিনি স্থানিক বাস্তবতার মধ্যেই থেকে গেলেন। এমত দ্বৈততানির্ভর শিল্পী যে বিশ্বের দরবারে একটু দেরিতে আদৃত হবেন, সে বিষয়ে আন্দাজ করা গেছে আরও আগেই। তবে জয়নুল যে তাঁর শক্তিমত্তার স্বীকৃতি বিশ্ববাজারে কোনো একদিন পাবেন, এমনটা আশা করা গেছে।

‘বাজার’ শব্দটা এখানে জরুরি। কারণ, পুঁজিশাসিত বিশ্বে বাজারে স্থান করে নিতে পারার অর্থ দাঁড়ায়, বৈশ্বিক শিল্পানুরাগীদের নজরে আসা। প্রথম যে ছবিগুলো জয়নুলকে বর্তমান বিশ্ববাজারে পরিচিত করে তোলে, তার মধ্যে দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলোই ছিল প্রধান। আবুল মনসুর আহমদ জয়নুলের নকল ছবি নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ লেখায় মেহরিন রিজভি নামের এক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নিউইয়র্কবাসীর বরাত দিয়ে জানাচ্ছেন, তিনি (ওই নারী) দেখেছেন বেশ ভালো সংখ্যায় জয়নুল আবেদিনের (পাকিস্তানি শিল্পী হিসেবে) দুর্ভিক্ষের স্কেচের সাপ্লাই ওখানে (সথবিজ নামের নিলামকারী প্রতিষ্ঠানে) আসছে। তখন ৫-৭ থেকে ১২ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যে এগুলো বিক্রি হচ্ছিল, যা মহিলার মতে ছিল ‘নগণ্য মূল্য’।

বিশ্ববাজারে জয়নুলের মূল্য বাড়ার আগেই ‘দুর্ভিক্ষ’ চিত্রমালার ছবিগুলোর নকল দেশে ও বিশ্বদরবারে হাজির হয়েছে। জয়নুলের কাজ কলকাতা থেকে বাংলাদেশে এসেছে; এর মধ্যেও নকল দেখা গেছে। আবার পাকিস্তানি সংগ্রাহকদের সূত্রে পাওয়া শিল্পকর্মের মধ্যেও কয়েকটি ছবিকে নকল বলে ছবি–বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন। গত ২৫ বছরে এমন প্রতিলিপির খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে জয়নুলের ছবির বৈশ্বিক চাহিদা বেড়েছে।

বাংলাদেশের শিল্পজগতের প্রধান কারিগর এবং তাঁর সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ের আধুনিক শিল্পের অগ্রদূতদের পাশ্চাত্যের দরবারে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ তেমনভাবে দেখা যায়নি। সরকারি ও বেসরকারি—এই দুইয়ের কোনো একটি পর্যায়েও বাংলাদেশের প্রধান শিল্পীদের বড় কোনো প্রদর্শনী বৈশ্বিক শিল্পের কেন্দ্রে আয়োজন করা হয়নি। তাই সার্বিক বিচারে জয়নুলের বিশ্ববাজারে উপস্থিতি কেবল তাঁর একক প্রতিভার ফল বলে গণ্য করা চলে।

নতুন শতাব্দীর শুরুতে জয়নুলের মূল্যের দিকটি নিয়ে নিরাশ হতে হয়েছে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের শিল্পীদের কাজের পাশে বাংলাদেশের শিল্পীরা স্থান করে নিতে পারেননি। বাজারমূল্য দিয়ে যদিও শিল্পের উৎকর্ষ যাচাই মূঢ়তা, তবু আঞ্চলিকভাবে যে শিল্পীদের কাজ সমাদৃত, তাঁদেরই অবশেষে নিলামে মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়। সম্প্রতি সবশেষে যে তিনটি ছবির মধ্য দিয়ে ছবির বাজারে জয়নুলের পুনর্মূল্যায়ন হলো, সেগুলো কিন্তু তাঁর ‘মাস্টারপিস’ নয়। বরং মাস্টারপিস আঁকার প্রস্তুতিস্বরূপ যে স্কেচগুলো আঁকা হয়, অমন ছবি। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ যে তিনটি ছবি বা স্কেচের মালিকানার হাতবদল হয়, তা বাংলাদেশের শিল্পের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো মাস্টার শিল্পীর কাজ ছয় ডিজিটের মূল্যে বিক্রি হয়। ‘মডার্ন অ্যান্ড কনটেমপোরারি সাউথ এশিয়ান আর্ট’ শিরোনামের অধীন জয়নুলের ‘শিরোনামহীন’একটি কালি-তুলিতে আঁকা স্কেচ ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪৮ মার্কিন ডলারের সমমূল্যে বিক্রি হয়, বাংলায় যা ৮ কোটি ২৯ লাখ ৮ হাজার ৩১৯ টাকার সমান। ১৯৭৩ সালে আঁকা ‘মনপুরা ৭০’-এর পাশাপাশি একই শিরোনামে বেশ কয়েকটি স্কেচ আঁকেন জয়নুল, যার একটি হলো এই ‘শিরোনামহীন’ ছবিটি। শিল্পীর কনিষ্ঠ সন্তান মাইনুল আবেদিনের বরাত দিয়ে বলা যায়, জয়নুল ১৯৭৩ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি-লিট উপাধি গ্রহণের অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে যে ছবি উপহার দিয়েছিলেন, সেই সিরিজের ছবি এটি। এতে শক্ত হাতে এক মা তাঁর সন্তানকে ধরে রেখেছেন। যে ঋজু রেখার জন্য তিনি পরিচিত, সেই স্বভাবসুলভ রেখা এখানে মোমের আঁচড়, তুলির টান ও ওয়াশের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

দ্বিতীয় কাজটি স্কেচ হলেও তেলচিত্রে আঁকা স্কেচ। তৃতীয়টি জর্ডানে ফিলিস্তিনের শরণার্থীদের স্কেচগুলোর একটি। এই দুটি ছবির দাম যথাক্রমে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৬৩ মার্কিন ডলার (বাংলায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ দুই হাজার ৩২ টাকা) ও ৩ লাখ ৮১ হাজার মার্কিন ডলার (৪ কোটি ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৩ টাকা)।

পাশ্চাত্যে শিল্পের বাজার একটি ধাঁধায় ভরা ক্ষেত্র। এখানে পুঁজির সহজ কোনো সমীকরণ কাজে লাগে না। অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও চড়া দামে শিল্পের কেনাবেচা হতে দেখা গেছে। শিল্পাচার্যের ছবি যে এমন চড়া দামে বিক্রি হলো, বাংলাদেশের জন্য সেটি আরও সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয়। শিল্পীদের শিল্প যদি কোনো রকম সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ছাড়াই বাজারেও তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পারে, একই পথে আরও আরও পথিকৃতের কাজ নানা দেশের নানা প্রতিষ্ঠানে ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে জায়গা করে নিতে পারবে বলে আশা করা যায়। জয়নুলের ক্ষেত্রে ডলারের মূল্য এ কারণে আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক।