
লালমাটিয়ার মাফা গ্যালারিতে শুরু হয়েছে চিত্রপ্রদর্শনী ‘আ গ্রেসফুল বিগিনিং’। সমসাময়িক বাংলাদেশের শিল্পচর্চার প্রতিনিধিত্বশীল দলিল হিসেবে এই প্রদর্শনী বিবেচিত হতে পারে। এতে অংশ নিয়েছেন ৪৪ বিশিষ্ট শিল্পী। প্রবীণ ও নবীন—উভয় প্রজন্মের শিল্পীদের সৃজনশীল সংলাপে নির্মিত এ আয়োজন দর্শকদের সামনে শিল্পের বহুমাত্রিক ভাষা ও বৈচিত্র্য তুলে ধরেছে।
প্রত্যেক শিল্পী নিজস্ব শৈলী ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও সমগ্র প্রদর্শনীটি মিলিতভাবে এক সুসংহত ও সুষম নান্দনিক অভিজ্ঞতার রূপ ধারণ করে। এ প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো প্রয়াত শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদের এনগ্রেভিং ও চারকোল মাধ্যমের চিত্রকর্মগুলো।
প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বাস্তবধর্মী চিত্রকর্ম থেকে শুরু করে গবেষণাধর্মী ও বিমূর্ত শিল্পকর্ম। জলরং, অ্যাক্রিলিক ও অয়েল পেইন্টিং—বিভিন্ন মাধ্যমে নির্মিত এসব কাজের বিষয়বস্তুতে রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈসর্গিক ও মানবিক বাস্তবতার গভীর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
প্রত্যেক শিল্পী নিজস্ব শৈলী ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও সমগ্র প্রদর্শনীটি মিলিতভাবে এক সুসংহত ও সুষম নান্দনিক অভিজ্ঞতার রূপ ধারণ করে।
এ প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো প্রয়াত শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদের এনগ্রেভিং ও চারকোল মাধ্যমের চিত্রকর্মগুলো।
এসব কাজে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্মৃতিবাহী ও আবেগঘন শিল্পভাষায় ফুটে উঠেছে। রেখা, ছায়া ও গাঢ় টোনের ব্যবহারে জীবন্ত হয়ে উঠেছে জাতিসত্তার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অন্তর্লীন স্পন্দন।
পাশাপাশি শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর একটি ড্রয়িং, যা দর্শকদের স্মৃতিচারণা ও শিল্প–ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করে।
অন্যদিকে শিল্পী মাহমুদুল হকের কল্পনাপ্রসূত রংবিন্যাসে নির্মিত কাজগুলোতে দেখা যায় রঙের গূঢ় সাযুজ্য ও সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা।
শিল্পী মনিরুল ইসলামের বিমূর্ত রীতির চিত্রে রূপ ও রেখার মধ্যে এক অন্তর্লীন ছন্দ প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কাজগুলোতে নির্দিষ্ট অবয়ব বা সরাসরি বর্ণনার অনুপস্থিতি বরং রং, রেখা ও স্তরবিন্যাসের মধ্য দিয়ে অনুচ্চারিত অনুভূতি এবং না-বলা কথার গভীর ইঙ্গিত বহন করে।
শিল্পী আব্দুস সাত্তারের ভিন্নধর্মী চিত্রকর্মগুলো নিরীক্ষাধর্মী, যেখানে আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ করে। শিল্পী ফরিদা জামানের কাজে রঙের হৃদ্যতায় নারীর চরিত্রে ফুটে উঠেছে শক্তি ও কোমলতার যুগপৎ প্রকাশ।
শিল্পী মোস্তাফিজুল হকের চিত্রকর্মে তুলির স্ট্রোকে ঘোড়ার দেহভঙ্গি, পেশির টান এবং চলমান মুহূর্তের উত্তেজনা এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে দর্শকের সামনে প্রায় জীবন্ত দৃশ্যের আবির্ভাব ঘটে।
দ্রুত, আত্মবিশ্বাসী ও কখনো কখনো আক্রমণাত্মক ব্রাশস্ট্রোকের মাধ্যমে শিল্পী গতিশীলতার ছন্দকে ধারণ করেছেন, যা চিত্রপৃষ্ঠে এক অন্তর্লীন শক্তির সঞ্চার করে। এসব চিত্রকর্মে প্রতিবাদ, অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।
নৈসর্গিক বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে শিল্পী জামাল আহমেদের পানির রঙিন ওয়াশে বহমান নদীর মুগ্ধতা এবং আহমেদ শামসুদ্দোহার হলুদ শর্ষেখেতের দৃশ্য গ্রামীণ বাংলাদেশের আবহকে জীবন্ত করে তুলেছে। শিল্পী রোকেয়া সুলতানার ইউনিক প্রিন্ট গবেষণাধর্মী শিল্পভাষার স্বতন্ত্র উদাহরণ হিসেবে নজর কেড়েছে।
শিল্পী শেখ আফজালের চিত্রকর্মে শিশু এক নিষ্পাপ ও গভীর মানবিক অনুভূতির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা ভালোবাসার কোমল আবরণে স্নিগ্ধভাবে ধরা পড়েছে। তাঁর কাজে শিশু কেবল একটি বিষয়বস্তু নয়, বরং তা হয়ে ওঠে বিশুদ্ধতা, আশা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার রূপক।
এ ছাড়া শিল্পী ড. আজহারুল ইসলাম শেখের বিমূর্ত রীতির চিত্রকর্মে দর্শক একধরনের নীরব আবেগময় ভাষার মুখোমুখি হন। যেখানে প্রতিটি রঙের স্তর, প্রতিটি অমসৃণ টেক্সচার ব্যক্তিগত স্মৃতি, অন্তর্লীন সংকট কিংবা সমকালীন মানবিক টানাপোড়েনের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর চিত্রকর্মে একধরনের অন্তর্মুখী নীরবতা বিরাজমান, যা দর্শককে থমকে দাঁড়াতে এবং ভাবনার গভীরে প্রবেশ করতে আহ্বান জানায়।
অপর দিকে শিল্পী অনুপম হুদার গবেষণাধর্মী টেক্সচারভিত্তিক কাজগুলো কেবল দৃশ্যমান সৌন্দর্যের উপাদান নয়; বরং তা বস্তুগত অনুসন্ধান, উপকরণের সম্ভাবনা ও নির্মাণপ্রক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে হাজির হয়। বহুস্তরবিশিষ্ট টেক্সচারের ভেতর দিয়ে রঙের আভা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, যা দর্শকের দৃষ্টিকে পৃষ্ঠতলের বাইরে নিয়ে গিয়ে শিল্পকর্মের ভৌত ও ধারণাগত গভীরতার সঙ্গে সংযুক্ত করে।
সার্বিকভাবে ‘আ গ্রেসফুল বিগিনিং’ সমসাময়িক বাংলাদেশের শিল্পভাষা, ভাবনা ও প্রজন্মগত ধারাবাহিকতার এক সংবেদনশীল দলিল। এই প্রদর্শনী দর্শককে নান্দনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শিল্পের ভেতর দিয়ে সমাজ, মানুষ ও সময়কে নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়। ৮ মে শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি ২২ মে পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।