
প্রথম আলোর অনলাইন-পূর্ব যুগের মূল্যবান লেখাপত্র নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ধারাবাহিক উদ্যোগে আজ তুলে ধরা হলো খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের প্রায় দুই যুগ আগের প্রবন্ধ ‘লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতি’ (প্রথম প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০০২)। এ লেখায় লোকজীবনের শ্রম, ভাষা, স্মৃতি ও সমষ্টি-চৈতন্যের সঙ্গে সংস্কৃতির গভীর যোগসূত্র উন্মোচিত হয়েছে ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও সাহিত্যচিন্তার আলোকে। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক প্রভাব, নয়া সাম্রাজ্যবাদ ও আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতির চাপে লোক–ঐতিহ্যের ক্ষয়ের বাস্তবতাও উঠে এসেছে স্পষ্টভাবে। বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক সংকট ও পরিচয়-অন্বেষণের প্রেক্ষাপটে এ প্রবন্ধ নতুন করে পড়া যেতে পারে। কারণ, নিজেদের শিকড়, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্নে লেখাটি আজও প্রাসঙ্গিক ও দিকনির্দেশক।
লোকজীবন ব্যক্তির তথা সমষ্টির আদি ও অকৃত্রিম জীবন। মানুষের সংঘবদ্ধ সামাজিক জীবনের শুরুই লোকজীবনের শুরু। এই জীবন মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারণের প্রয়োজনে সৃষ্ট বিভিন্ন বিচিত্র বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংস্কার, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধ দিয়ে সমৃদ্ধ। মানুষের সূক্ষ্ম ধ্যানধারণা, বিমূর্ত চিন্তাভাবনা, পরিশীলিত মনস্বিতা, স্বপ্ন ও কল্পনা এবং আত্মপ্রকাশের জন্য ব্যবহৃত ভাষা ইত্যাদি সমস্ত সৃষ্টি তার বাস্তব জীবনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। এবং এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় তারা নিয়ত পরিবর্তনশীল। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতাই মানুষকে পরিবর্তনশীল জীবনধারার সঙ্গে মানিয়ে চলতে এবং কখনো এই জীবনধারায় পরিবর্তন ঘটাতে অনুপ্রেরণা দেয়। এভাবেই গঠিত হয় ব্যক্তির চেতনা এবং সমষ্টির অবদান। একাধিক ব্যক্তির পারস্পরিক যোগাযোগে গঠিত হয় সমষ্টি–চৈতন্য। আবার ব্যক্তিচেতন্যেই সঞ্চরণশীল ‘সমষ্টি-স্মৃতি’। নাইজেরিয়ার লেখক চিনুয়া অ্যাচেবে ব্যক্তির ভেতরের এ সমষ্টি–চৈতন্যকে বর্ণনা করেন অ্যান্টহিল বা উইঢিবির প্রতীকে। বিস্তৃত প্রেইরি অঞ্চল বা সাভান্নাহ যখন দাবানলে পুড়ে যায়, সেখানে অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি নিয়ে স্থানে স্থানে জেগে থাকে উইঢিবি। বছর গড়াতে না গড়াতে বর্ষার প্রথম স্পর্শে এসব ঢিবির আশপাশে প্রবল প্রাণশক্তি নিয়ে গজিয়ে ওঠে নতুন ঘাস। এদের কাছে ঘাসেরা শোনে বিগত দাবানলের কাহিনি। অ্যান্টহিলের এই প্রতীকের মাধ্যমে অ্যাচেবে বলতে চান যে Grlot বা লোককবির ভূমিকা অনেকটা সাভান্নাহর উইঢিবির মতো সমষ্টির স্মৃতিকে ধারণ এবং বংশপরম্পরায় কাহিনির মাধ্যমে প্রবাহিত করা। সমষ্টি-স্মৃতি বা সমষ্টি-চৈতন্য উভয়েই ব্যক্তি ও সমষ্টি জীবনের যোগাযোগ ও কার্যকলাপের ফলে গড়ে ওঠে। লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতি পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। জেলের মাছ ধরা, তাঁতির কাপড় বোনা, কুমারের বাসন তৈরি, চাষির ফসল উৎপাদনের সঙ্গে শিল্পীর শিল্পসাধনা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কারণ, কোনো সমাজের সংস্কৃতি হলো সেই সমাজ কীভাবে নিজেদের ভরণপোষণ করে, কীভাবে অন্ন সংস্থান করে তারই ইতিহাস। মাছ ধরা, তাঁত বোনা, শস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে শিল্পীর সাধনাও অব্যাহত থাকতে পারে না। সত্যি বলতে অন্ন সংস্থানের বাস্তব চাহিদা পূরণ না হলে জীবনই টেকে না। এক সাক্ষাৎকারে এভাবে আলোচনা করে বার্বাডোজের লেখক জর্জ ল্যামিং বলেন, এই নিরেট সত্যটি যদি পরিষ্কার হয়, অর্থাৎ কীভাবে আপনি নিজের ভরণপোষণ করেন তার মধ্যেই আপনার সংস্কৃতির মূল অর্থ নিহিত। এ সত্যটি যদি মনে থাকে তো এ কথাও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে একজন জেলে কিংবা কৃষকও মূলত একজন সংস্কৃতিকর্মী। বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান-গরিমা কিংবা শিক্ষার মান যা–ই হোক না, সচেতন ব্যক্তিমাত্রই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সক্রিয় কর্মী। তাহলে সংস্কৃতি প্রসঙ্গে মূল সত্যটি হলো এই যে ব্যক্তি ও সমষ্টির শ্রমই সমস্ত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূল সংগঠক, সমস্ত ধ্যানধারণার স্রষ্টা।
কোনো সমাজের সংস্কৃতি হলো সেই সমাজ কীভাবে নিজেদের ভরণপোষণ করে, অন্ন সংস্থান করে তারই ইতিহাস। মাছ ধরা, তাঁত বোনা, শস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে শিল্পীর সাধনাও অব্যাহত থাকতে পারে না। এ সত্যটি যদি মনে থাকে তো এ কথাও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে একজন জেলে কিংবা কৃষকও মূলত একজন সংস্কৃতিকর্মী।
মানুষে মানুষে যোগাযোগের ফলেই গড়ে ওঠে সংস্কৃতি। একই পরিস্থিতিতে ও পরিবেশে দীর্ঘদিন একই ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকার ফলে এক ধরনের অভ্যাস, রীতি, দৃষ্টিভঙ্গি, ছন্দ, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মূল্যবোধ গঠিত হয়। মূল্যবোধ সঞ্চিত হয়ে ক্রমে স্বতঃসিদ্ধ সত্যে পরিণত হয় এবং ভালোমন্দ সম্পর্কে, ঠিক-বেঠিক, সুন্দর-অসুন্দর, বদান্যতা-হীনম্মন্যতা, বীরত্ব-কাপুরুষতা ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষের ভাবনাচিন্তা মতামত পরিচালনা করে। এভাবে একটি জনগোষ্ঠী তাদের বিশেষ জীবনধারা, মূল্যবোধ ও সত্য অর্জন করে, যা অন্য পরিস্থিতিতে গড়ে ওঠা অন্য জনগোষ্ঠীর জীবন, ইতিহাস ও মূল্যবোধ থেকে স্বতন্ত্র। জীবনযাত্রার উপায়, ইতিহাস এবং নৈতিক ও সৌন্দর্যিক মূল্যবোধ নিয়েই গঠিত হয় সেই বিশেষ জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবন। এই সব সত্য ও মূল্যবোধের ভেতর দিয়েই তারা আত্মপরিচয় লাভ করে, বিশ্বে তাদের স্থান সম্পর্কে হয় সচেতন। সুতরাং মূল্যবোধ হলো একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও আত্মদর্শনের উপায়। যেহেতু ভাষা ইতিহাসে সমষ্টির অভিজ্ঞতার ধারক এবং প্রকাশের সবচেয়ে সুবিধাজনক মাধ্যম, সে জন্য প্রধানত ভাষার মাধ্যমেই মানুষের অভিজ্ঞান, মূল্যবোধ সঞ্চারিত হয়ে উত্তর-পুরুষের সক্রিয় থাকার নতুন নতুন ভিত্তি প্রস্তুত করে। এভাবে ভাষা মানুষের সাংস্কৃতিক জীবন গঠনে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। বস্তুজীবনে খাদ্য, পানীয় ও সম্পদ উৎপাদন করতে গিয়ে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে তোলে তা মূলত ভাষার মাধ্যমেই। কেনিয়ার লেখক ও বুদ্ধিজীবী নগুগি ওয়া থিওঙ্গ এ প্রসঙ্গে বলেন, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে হাতের ভূমিকা যা, মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা সে রকম। হাতিয়ারের মাধ্যমে হাত মানুষ ও প্রকৃতির ভেতর সম্পর্ক নিরূপণে সাহায্য করে এবং তাতে বাস্তব জীবনের ভাষ্য তৈরি হয়। প্রকৃতি ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ভাষা মানুষের সংগ্রামের ও পারস্পরিক যোগাযোগের প্রতিফলন ঘটায় চিত্রকল্প সৃষ্টির মাধ্যমে। এই সব চিত্রকল্পেই বিম্বিত হয় জনগোষ্ঠীর পরিচয়। ব্যক্তির পক্ষে কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর পক্ষে পারিপার্শ্বিককে সৃজনশীলভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা অর্জন নির্ভর করে ওই সব চিত্রকল্প কীভাবে তাদের সৃষ্টিকালীন বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে এবং কীভাবে তারা সেই জনগোষ্ঠীর বর্তমান বাস্তবতাকে বিকৃত অথবা পরিশুদ্ধ করে, তার ওপর। এভাবে বলা যায়, ভাষা ও সংস্কৃতি আমার এবং আমার সত্তা, আমার সত্তা ও অন্যের সত্তা, আমার এবং প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্ক ঘটায়। লোকজীবন, লোকসংস্কৃতি, লৌকিক মূল্যবোধ ইত্যাদি পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এবং পরস্পরের পরিপূরক। জাদু বিশ্বাসের সময় থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত এরা পরস্পরের শরীর নির্মাণে সাহায্য করছে।
একই পরিস্থিতিতে ও পরিবেশে দীর্ঘদিন একই ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকার ফলে এক ধরনের অভ্যাস, রীতি, দৃষ্টিভঙ্গি, ছন্দ, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মূল্যবোধ গঠিত হয়। এভাবে একটি জনগোষ্ঠী তাদের বিশেষ জীবনধারা, মূল্যবোধ ও সত্য অর্জন করে, যা অন্য পরিস্থিতিতে গড়ে ওঠা অন্য জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও মূল্যবোধ থেকে স্বতন্ত্র।
কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তির প্রভাবে লোকজীবন ও সংস্কৃতি দুই–ই বিপন্ন হয়ে পড়ে। আমাদের লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতি রুগ্ণদশা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয় গত প্রায় দুই শতাব্দী আগে। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের আর্থিক অবকাঠামোর প্রচণ্ড টানাপোড়েনে এই দশা ত্বরান্বিত হওয়ার ফলে আমাদের প্রচলিত লোকসংস্কৃতির নির্দশনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামোর এই বিশৃঙ্খলার জন্য বহুলাংশে দায়ী উপরি কাঠামোর, অর্থাৎ রাজনৈতিক ও উটকো সাংস্কৃতিক জীবনের বিশৃঙ্খলা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আমাদের জীবন যেমন সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তেমনি আমাদের সংস্কৃতিকেও বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করে বহিঃশক্তির ঋণ ও অনুদান। বর্তমান বিশ্বের জাতিগুলো পারস্পরিক লেনদেনের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধও হচ্ছে। কিন্তু যেখানে একতরফা দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক, সেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা ও লেনদেনের প্রসঙ্গটি আত্মপ্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে কোনো সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় না। সে ক্ষেত্রে দাতার তথা যান্ত্রিক সভ্যতার শিরোমণি-দেশের অনেক অবমাননাকর শর্ত গ্রহীতাকে গ্রহণ করতে হয়। আমাদের প্রচারমাধ্যমে, আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন ও জীবনধারণের উপায়গুলোও অনেক সময় আমাদের অজ্ঞাতেই কিংবা কখনো কখনো জ্ঞাতসারে বহিরাগত সংস্কৃতির উপকরণ দ্বারা আচ্ছন্ন, পরিবর্তিত, সমৃদ্ধ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
আমাদের লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক সম্পর্ক একটি বিধ্বংসী শক্তি হিসেবেই কাজ করেছে। ঔপনিবেশিক সম্পর্ক আমাদের জাতির একটি শ্রেণিকে যন্ত্র-সভ্যতায় অভ্যস্ত করলেও এবং এর ফলে তাদের দৈনন্দিন বস্তু-জীবনে আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্য এলেও যন্ত্র-সভ্যতার সুফলগুলো জাতির বিপুল বৃহদাংশের আয়ত্তের বাইরেই থেকে যায়। যান্ত্রিক সভ্যতার উল্লম্ব সংস্কৃতি রোগের মতোই সংক্রামক এবং মেকি দ্রব্যের মতো ফাঁপা ও চটকদার। এ জন্য তা অতি সহজেই আমাদের প্রচলিত লোকসংস্কৃতিকে ম্লান করে দেয়। সারা দিনের কাজের শেষে একজন কৃষক কিংবা শ্রমিক যখন ইউনিয়ন কাউন্সিল বা ওই রকম জমায়েতের জায়গায় গিয়ে টেলিভিশনের সামনে এমন সব জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন, যার সঙ্গে তার দৈনন্দিন বাস্তবতার কোনোই সম্পর্ক নেই, তখন মানতেই হয় যে রাজনীতি অর্থনীতি এবং শাসনযন্ত্রের সার্বিক পরিকল্পনায় বড় রকমের গরমিল আছে। ফল যা হয়েছে, তা হলো এই স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে সংস্কৃতি জীবনের সৃষ্টিশীলতা শিকড়বিহীন গাছের মতোই যাচ্ছে মরে।
ঔপনিবেশিক সম্পর্ক আমাদের জাতির একটি শ্রেণিকে যন্ত্র-সভ্যতায় অভ্যস্ত করলেও এবং এর ফলে তাদের দৈনন্দিন বস্তু-জীবনে আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্য এলেও যন্ত্র-সভ্যতার সুফলগুলো জাতির বিপুল বৃহদাংশের আয়ত্তের বাইরেই থেকে যায়। এ জন্য তা অতি সহজেই আমাদের প্রচলিত লোকসংস্কৃতিকে ম্লান করে দেয়।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, আমাদের লোকজীবনের এ দৈন্যদশা মেনে না নিয়ে উপায় নেই। আমাদের রাজনীতি যেখানে মেরুদণ্ডহীন, শাসকশ্রেণি যেখানে ধূর্ত, নপুংসক এবং প্রকৃত পক্ষে বৃহত্তর জনসমষ্টির শত্রু, সেখানে অবমাননাকর মর্যাদা এবং আমাদের অধঃপাতিত সাংস্কৃতিক জীবন প্রত্যক্ষ করতে হয়। তবু অন্তত দুটি উপায়ে আমরা এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারি। প্রথম, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীলতা হ্রাস করে ক্রমে একটি আত্মমর্যাদাশীল স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শাসকশ্রেণি দ্বারা যদিও এ কাজটি একেবারেই অসম্ভব। দ্বিতীয়, লোকসংস্কৃতি ও লোক–ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া উপাদান ও নিদর্শন ব্যাপক জরিপে গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার, অনুধ্যান ও অনাগত পুরুষের জন্য সংরক্ষণ করে।
আত্মোপলব্ধি, আত্মপরিচয় ও আত্মদর্শন লাভের জন্যই প্রয়োজন লোকজীবন ও সংস্কৃতির ওপর ব্যাপক জরিপ গবেষণার।
আমাদের দেশে এই গবেষণার কাজ মোটামুটি সন্তোষজনকভাবেই হয়েছে। বাংলাদেশের বয়সের সঙ্গে সংগতি রেখে এই গবেষণার বয়সও যথেষ্ট কম, কিন্তু বৃহত্তর বাংলার লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে বিদগ্ধ মহলের চৈতন্যোদয়ের ইতিহাস শতবর্ষের বেশি পুরোনো। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রতি ইংরেজ মিশনারিরাই প্রথম মনোযোগ দেন এবং তারই ফলে তারা গাথা, প্রবচন ইত্যাদি সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। উইলিয়াম মর্টন, জেমস লঙ প্রমুখ মিশনারি প্রধানত ধর্ম প্রচার এবং ইংরেজ কর্মচারীদের এ দেশের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্যই গত শতকের মাঝামাঝি এসব গাথা, প্রবাদ, শ্লোক সংগ্রহ করে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেন। ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত ‘প্রভাকর’ পত্রিকায় লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও লৌকিক গাথা, প্রবচন ইত্যাদি সংগ্রহের জন্য আবেদন জানিয়ে কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ ধরনের আবেদন বিদগ্ধ মহলে লোকজীবন কিংবা সংস্কৃতি বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি কিংবা সংগ্রহের পদ্ধতিগত ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার সূত্রপাত করেনি। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত হয় গোবিন্দ সামন্ত সংগৃহীত সংকলন ‘ফোক টেলস অব বেঙ্গল’। সেই সমসাময়িককালে প্রকাশিত লালবিহারী দে, গোভার সাহেব, গ্রিয়ারসন সাহেব প্রমুখের সংগ্রহও বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু তখনকার সমসাময়িককালে যিনি লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে সবচেয়ে কার্যকর উৎসাহ দেখান এবং ফলপ্রসূ আলোচনায় নিয়োজিত হন, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত সংগীত সংগ্রহ বাউলের গান পুস্তিকাটির সমালোচনায় রচিত ‘বাংলার...ভাব ও ভাবের ভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথই প্রকৃতপক্ষে লোকসংগীতের সাহিত্যমূল্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত করেন। বাংলার গাথা, প্রবচন, মেয়েলি গান, ছেলে ভুলানো ছড়া প্রভৃতির সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং এদের অকৃত্রিম সাহিত্যমূল্য আলোচনা উভয়ের ওপরই তিনি গুরুত্বারোপ করেন। নিজের স্বভাবসুলভ কাব্যরসবোধ দিয়ে তিনি পল্লিজীবনের ছড়া, গান, প্রবাদ, প্রবচন বিশ্লেষণ করেন। এ জন্য এসব লোকরচনার ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত মূল্য তাঁকে তেমন আকৃষ্ট করেনি। অবশ্য লোকগান, ছড়া ইত্যাদি যে একটি জাতির দর্শন ও বিজ্ঞানের সম্পদ, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন পূর্ণ মাত্রায় সচেতন। রবীন্দ্রনাথ বাল্যরসকে তুলনা করেন সদ্য কর্ষিত মাটি থেকে উত্থিত ‘সৌরভ’-এর সঙ্গে। বর্ণনা করেন ‘স্নেহোলেকর গন্ধ’ এবং ‘অপূর্ব আদিম সৌকুমার্যপূর্ণ মাধুর্য’ হিসেবে। আবার একই সময়ে রবীন্দ্রনাথ জাতিগত পরিচয়ের জন্য এসব লোকছড়া, লোকগানের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ করেন। ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’-এর এক সভায় ছাত্রদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি তাদের পুঁথিগত বিদ্যায় ঔৎসুক্য সীমিত না রেখে জীবন্ত মানুষের মধ্যে গিয়ে জীবন দর্শনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘পুঁথি ছাড়িয়া সজীব মানুষকে প্রত্যক্ষ করিবার চেষ্টা করাতে একটা শিক্ষা আছে। তাহাতে শুধু জানা নয়, কিন্তু জানিবার শক্তির এমন একটা বিকাশ হয় যে কোনো ক্লাসের পড়ায় তাহা হইতেই পারে না।’ ওই ভাষণে তিনি এই বলে অভিযোগ করেন যে আমরা নৃতত্ত্ব, অর্থাৎ অ্যাথনোলজির বই পড়ি বটে, কিন্তু তাতে আমাদের ঘরের পাশের হাড়ি-ডোম-কৈবর্ত-বাদী—এদের জীবন জরিপের ঔৎসুক্য জন্মায় না। এ জন্য তিনি ছাত্রদের বইয়ের জড়ত্ব কাটিয়ে জ্ঞানের আদি নিকেতন, অর্থাৎ লোকজীবনে প্রবেশের আহ্বান জানান।
কেবল লেখায় কিংবা ভাষণে লোকজীবনের জরিপ কাজ চালনার আহ্বান জানিয়েই কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি। তিনি নিজেও লোকসংস্কৃতি সংগ্রহের জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চালান।
লোকায়ত জীবনের নিদর্শন কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার আগেই সংরক্ষণ করা এবং তাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণের সাহায্যে আমাদের বিগত জীবন ও স্মৃতির, জাতির ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বের, ভাষার ও বাসস্থানের বিচিত্র সত্য পরিচয় উদ্ঘাটন করা আজ অত্যন্ত জরুরি।
১৯১৫-১৬ সালের শীতকালে একবার পদ্মার বোটে মোহিতলাল মজুমদার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি দেখেন, তার কেবিনের ভেতর এক পাশে, একটা বেঞ্চে হস্তশিল্পের নানা রকম দ্রব্যাদি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেন, ‘আমি কিছুদিন যাবৎ একটা বিষয়ে বড় উদ্বিগ্ন বোধ করিতেছি। বাংলার নিজস্ব আর্ট-আইডিয়া ক্রমেই বিদেশীয় প্রভাবে নষ্ট হইয়া যাইতেছে, আর কিছুদিন পরে আমাদের খাঁটি দেশীয় শিল্পের নিদর্শনগুলি লোপ পাইবে। তাই আমি এই সকল নমুনা সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি।’ লোকশিল্পের নিদর্শন হিসেবে তো বটেই, লোকায়ত শিল্পের পূর্ণাঙ্গ পরিচয়ের জন্য প্রাত্যহিক জীবনের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের বা ম্যাটেরিয়াল কালচারের মধ্যে গণমনস্তত্ত্ব ও গণশিল্পবোধ বিচারের প্রয়োজনীয়তাও রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেন। এক চিঠিতে তিনি সে সময় চট্টগ্রামে কর্মরত দার্শনিক-অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তকে লেখেন, ‘চাটগাঁ অঞ্চলে মেয়েলি শিল্প যা কিছু প্রচলিত আছে সংগ্রহ করে দিতে পারবেন, ওরা লক্ষ্মীপূজা, বিবাহ প্রভৃতি উপলক্ষে যে সমস্ত আল্পনা এঁকে থাকে সেইগুলি কোনো শিল্পপটু মেয়েকে দিয়ে কাগজের উপর আলতার রঙে আঁকিয়ে পাঠাতে পারেন? খাঁটি সেকেলে জিনিস হওয়া চাই। শিকে, কাঁথা প্রভৃতি গৃহস্থালীর শিল্পদ্রব্য সংগ্রহ করতে চাই। আর একটা জিনিস চাই—চাঁটগাঁ অঞ্চলে যত বিভিন্ন রীতির কুঁড়ে ঘর আছে তার ফটো বা অন্য কোনো রকমের প্রতিকৃতি। আপনার ছাত্রদের লাগিয়ে দিলে এটা দুঃসাধ্য হবে না। ওখানে জনসাধারণের মধ্যে মাটির, কড়ির, বাঁশের, বেতের শিল্পকাজ কি রকম চলিত আছে ভালো করে খোঁজ নেবেন। আমরা বাংলার প্রত্যেক জেলা থেকে এই সমস্ত গণশিল্প সংগ্রহ করতে ব্রতী।’
রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই লোকজীবন ও সংস্কৃতির গবেষণায় বিজ্ঞানমনস্ক ও বস্তুনিষ্ঠ ধারা প্রচলিত ছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখের আলোচনা অনেকাংশে এই ধারার ওপরই প্রতিষ্ঠিতা। এমনকি রবীন্দ্রনাথ যদিও লোকশিল্পের নৃতত্ত্বের চেয়ে ভাবসম্পদেই বেশি আগ্রহী ছিলেন, তার আলোচনায় নিজের যুক্তিনিষ্ঠ মনস্বিতার যথার্থ প্রকাশ ঘটিয়েছেন। রবীন্দ্রধারায় পশ্চিমবঙ্গে যারা লোকশিল্প ও লোকসংস্কৃতির সংগ্রহ, গবেষণা ও আলোচনায় ব্রতী হন তাদের মধ্যে নরেশ ত্রিপাঠী, আশুতোষ ভট্টাচার্য, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, দীনেশ সেন, তারাপদ লাহিড়ী, ক্ষিতিমোহন সেন, ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে লোকশিল্প নিদর্শন সংগ্রহ এবং তার ওপর গবেষণা অনেক দূর এগিয়েছে। পাশ্চাত্যে এ বিষয়ে যুগান্তকারী গবেষণা-গ্রন্থ প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের লোকসংস্কৃতির গবেষকদের তাদের মতামত ও বিশ্লেষণ রীতি প্রভাবিত করে। কাল মার্ক্স, ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কার্ল অব্রাহাম, জেমস ফ্রেজার, লুই হেনরি মর্গ্যান, কার্ল ইউং, মার্সিয়া ইলিয়াদ, জোসেফ ক্যাম্বেল, লেভিসস্ট্রস প্রমুখ মনীষীগণ লোকজীবন, লোকাচার, লোককাহিনি, মিথ, মোটিফ, আর্কিটাইপ, সমাজতত্ত্ব, সমষ্টি মনস্তত্ত্ব, ভাষার সমাজতত্ত্ব প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সৃজনশীল আলোচনার মাধ্যমে লোকজীবন ও সংস্কৃতির গবেষণায় যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। তাদের উদ্ভাবিত ও প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ও গবেষণা পদ্ধতি দ্বারাও প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হন বাংলার লোকসংস্কৃতির গবেষকগণ। ফলে লোকশিল্পের ভাবসম্পদ অন্বেষণের চেয়ে এঁরা বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে বাংলার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক, তুলনামূলক, ভাষাতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় অনুসন্ধানেই বেশি আগ্রহী।
আমাদের লোকসংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণার ইতিহাস ও পরিমাণ সংক্ষিপ্ত। তবু বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠান, যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি এবং বেশ কয়েকজন উৎসাহী গবেষক ও সংগ্রাহক, যেমন মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, ড. মযহারুল ইসলাম, ড. মনিরুজ্জামান, ড. ওয়াকিল আহমদ, মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন কাশিমপুরী, মুহম্মদ আবু তালিব এ দেশের লোকসংস্কৃতির নিদর্শন সংগ্রহে জরিপ গবেষণায় তাঁদের একনিষ্ঠ শ্রম ও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে ড. শহীদুল্লাহ ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রের সাহায্যে লোকসাহিত্যের প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সম্ভাবনা উন্মোচন করেন। অন্য অনেকেরই আলোচনা প্রশংসনীয়ভাবে ভাবাবেগবর্জিত, বস্তুনিষ্ঠ ও বিজ্ঞানমনস্ক।
বাংলার লোকসংস্কৃতির জরিপ গবেষণার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের নামোল্লেখের প্রয়োজন এ জন্য যে তিনি এই সংস্কৃতির ক্ষয় ধরতে পেরেছিলেন বহুকাল আগেই এবং তা রোধ করতে কিংবা তার আদি রূপ ধরে রাখতেও সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন যে বহিঃশক্তির, বিশেষত কৃত্রিম জীবন ও এলিয়েন সংস্কৃতির প্রভাবেই লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতির বিনাশ ঘটছে। আসলেও নাগরিক সমাজের প্রভাবে যে সমাজ প্রত্যক্ষভাবে বৈদেশিক সাহায্যে প্রতিপালিত ও উটকো সংস্কৃতির একনিষ্ঠ গ্রাহক—পল্লী সমাজে যেসব কৃত্রিমতা প্রবেশ করেছে, তাতে লোকসংস্কৃতির স্বাভাবিক শিকড় যাচ্ছে মরে। নয়া ঔপনিবেশিক প্রভাবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাবে শ্রম, সামাজিক সম্পর্ক, উৎপাদন পদ্ধতি এবং জীবনযাপনের অন্যান্য বিভিন্ন সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং এসব প্রভাব ও পরিবর্তন বিষয়ে ব্যক্তির ও সমষ্টির সচেতনতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতকাল যে পরিবেশে গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করেছিল, সেই পরিবেশই আজ দ্রুত পরিবর্তনশীল। এমন অবস্থায় লোকসংস্কৃতিরও পরিবর্তিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই পরিবর্তন লোকজীবন ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুললে তা হতো বরণীয়। কিন্তু আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরনির্ভরশীলতা, অসৎ ও অযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইত্যাদি কারণে বহিঃশক্তির প্রভাবকে লোকজীবনে সৃষ্টিশীলভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এর ফলে লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতির পরিবর্তন আমাদের ক্ষেত্রে অবক্ষয় ও মৃত্যুরই শামিল হয়ে দেখা দিয়েছে। এ জন্য লোকায়ত জীবনের নিদর্শন কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার আগেই সংরক্ষণ করা এবং তাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণের সাহায্যে আমাদের বিগত জীবন ও স্মৃতির, জাতির ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বের, ভাষার ও বাসস্থানের বিচিত্র সত্য পরিচয় উদ্ঘাটন করা আজ অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে আমরা যেমন নিজেদের হারানো বা মৃত শিকড়ের সন্ধান পেয়ে আত্মোপলব্ধি লাভ করতে পারি, আমাদের পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় সাহিত্যের লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের বিভিন্ন লোকজ মিথ, আর্কিটাইপ ও চরিত্রে সৃষ্টিশীল প্রতীক বা রূপক ব্যবহার করতে পারি, তেমনি আমাদের অনাগত বংশধরদের জন্যও প্রস্তুত করতে পারি তাদের সৃজনশীল চিন্তার ও কর্মের দৃঢ় ভিত্তি, তাদের আত্মদর্শনের বিচিত্র চিত্রকল্প।
(প্রথম আলোর বর্তমান বানানরীতি প্রয়োগ করা হয়েছে)