অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

যে ছবির জন্য চার কাপ চা ঠান্ডা হয়

পত্রিকা অফিসে প্রতিদিন অনেক যুদ্ধ হয়।

কোন খবর লিড হবে, কোনটা যাবে নিচে, কোন শিরোনামে সম্পাদক ভ্রু কুঁচকাবেন, কোন রিপোর্টার দেরিতে কপি দেবেন—এসব যুদ্ধ তো আছেই।

কিন্তু আমাদের অফিসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধটা হয় একটা ছবি নিয়ে।

এই যুদ্ধে প্রাথমিক সৈনিক দুজন।

আমি আর আমাদের ফটোগ্রাফার সাজিদ হোসেন।

আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে ছবি বাছাই শুরু হলেই আমরা দুজনই এমন আচরণ করি, যেন অপরজনের হাতে পত্রিকার সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী।

অবশ্য ডেস্ক আর ফটোগ্রাফি বিভাগের সম্পর্ক অনেকটা শ্বশুরবাড়িতে জামাই গমনের মতো। দুজনই ভদ্র থাকে, কিন্তু কেউ কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না।

আমাদের ঘটনা শুরু হয় খুব নিরীহভাবে।

আমি বলি, ‘এই ছবিটা দিই?’

সাজিদ সঙ্গে সঙ্গে ‘না’ বলে না।

আগে নিশ্চিত হয়, আমি মজা করছি কি না।

তারপর শুরু হয় বিচারকাজ।

সাজিদ ছবি বড় করতে চায়। আমি খবর বড় করতে চাই।

ও ফ্রেম দেখে। আমি প্রথম পাতা দেখি।

ও মুহূর্ত খোঁজে। আমি গুরুত্ব খুঁজি।

সে বলে, ‘ছবিটা দেখেন।’

আমি বলি, ‘খবরটা দেখেন।’

ফটোগ্রাফারদের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। তারা নিজের তোলা প্রতিটি ছবিকে সন্তান মনে করে। আর আমরা ডেস্কের লোকেরা যেন সেই সন্তানদের ভর্তি পরীক্ষার পরীক্ষক! আমি বলি, ‘এইটা বাদ।’ এই দুটি শব্দ শোনার পর সাজিদের মুখের যে অভিব্যক্তি হয়, সেটা কোনো ক্যামেরাই ঠিকমতো ধরতে পারে না।

সে বলে, ‘লোকটার চোখে কী অসাধারণ এক্সপ্রেশন!’

আমি বলি, ‘লোকটা কে?’

সে বলে, ‘ওটা গুরুত্বপূর্ণ না।’

আমি বলি, ‘আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

সাজিদের কাছে মানুষটা একটা ছবি।

আমার কাছে মানুষটা একটা খবর।

সাজিদ বিশ্বাস করে, একটা ভালো ছবি হাজার শব্দের সমান।

আমি বিশ্বাস করি, একটা ভালো ক্যাপশন লিখতে না পারলে হাজার শব্দের ছবি মাঠে মারা যায়।

ও বলে, ‘আলোটা দেখেন!’

আমি বলি, ‘লোকেশনটা দেখেন!’

ও বলে, ‘কম্পোজিশন!’

আমি বলি, ‘কনটেক্সট!’

ও বলে, ‘মোমেন্ট!’

আমি বলি, ‘নিউজ ভ্যালু!’

পাশ থেকে অনেকেই শোনে। তারা মনে করে, আজ আর পত্রিকা ছাপা হবে না। তাদের তর্ক গভীর রাত অবধি চলতে থাকবে।

আসলে আমরা একটা ছবি বাছাই করছি।

ফটোগ্রাফারদের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। তারা নিজের তোলা প্রতিটি ছবিকে সন্তান মনে করে। আর আমরা ডেস্কের লোকেরা যেন সেই সন্তানদের ভর্তি পরীক্ষার পরীক্ষক!

আমি বলি, ‘এইটা বাদ।’

এই দুটি শব্দ শোনার পর সাজিদের মুখের যে অভিব্যক্তি হয়, সেটা কোনো ক্যামেরাই ঠিকমতো ধরতে পারে না।

মাঝে মাঝে আশপাশের সহকর্মীরা সালিস করতে আসে। কেউ আমার পক্ষ নেয়। কেউ সাজিদের। কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিনা টিকিটে বিনোদন উপভোগ করে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোনো কোনো দিন লোকজন শুধু আমাদের ঝগড়া দেখার জন্যই ডেস্কের সামনে দিয়ে দু-তিনবার ‘ইভিনিং ওয়াক’ করে।

সাজিদ তখন সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা ছবি দেখায়।

‘এইটা?’

‘না।’

‘এইটা?’

‘না।’

‘এইটা?’

আমি কখনো কখনো সন্দেহ করি, ওর কম্পিউটারে একই ঘটনার আরও ৩৪৭টা ছবি লুকিয়ে আছে।

যতক্ষণ না আমি রাজি হচ্ছি, ততক্ষণ সে থামবে না।

আমিও কম যাই না।

আমি বলি, ‘পাঠক এই ছবিতে কী বুঝবে?’

সাজিদ উত্তর দেয়, ‘ভালো ছবি বুঝতে হয় না, অনুভব করতে হয়।’

আমি বলি, ‘পাঠক অনুভব করার আগে খবরটা পড়বে।’

সে বলে, ‘আপনারা ডেস্কে বসে ছবিকে মেরে ফেলেন।’

আমি বলি, ‘আপনারা মাঠে গিয়ে খবরকে ভুলে যান।’

তারপর দুজনেই পাঁচ সেকেন্ড চুপ। নিউজরুমে সবাই জানে, এই নীরবতা ঝড়ের আগের নীরবতা।

তারপর আবার—

‘না ভাই, এইটা হবে না।’

‘হবে।’

‘হবে না।’

‘হবে।’

মাঝে মাঝে আশপাশের সহকর্মীরা সালিস করতে আসে।

কেউ আমার পক্ষ নেয়। কেউ সাজিদের।

কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিনা টিকিটে বিনোদন উপভোগ করে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোনো কোনো দিন লোকজন শুধু আমাদের ঝগড়া দেখার জন্যই ডেস্কের সামনে দিয়ে দু-তিনবার ‘ইভিনিং ওয়াক’ করে।

কারণ, আমরা দুজনেই জানি, এই ঝগড়া না হলেও পত্রিকা বের হবে, কিন্তু নিউজরুমটা আর নিউজরুম থাকবে না। আর যদি কোনো দিন দেখি সাজিদ কোনো তর্ক ছাড়াই বলছে, ‘আপনি যেটা ভালো মনে করেন, সেটাই দেন।’ সেদিন আমি ছবি সিলেক্ট করব না। আগে নিশ্চিত হব, লোকটা সত্যিই সাজিদ কি না!

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, শেষ পর্যন্ত যে ছবিটা ছাপা হয়, পরদিন সেটা নিয়ে আর কেউ কথা বলে না।

কিন্তু সেই ছবিটার জন্য আগের দিন আধঘণ্টা তর্ক হয়েছে, চার কাপ চা ঠান্ডা হয়েছে, তিনজন সহকর্মী মধ্যস্থতা করেছেন, আর অন্তত একজন মনে মনে অন্যজনকে ‘ছবিবিরোধী’ কিংবা ‘খবরবিরোধী’ ঘোষণা করেছেন।

পরদিন আবার নতুন অ্যাসাইনমেন্ট।

নতুন ছবি। নতুন তর্ক।

কোনো দিন আমি জিতি। কোনো দিন সাজিদ।

আর বেশির ভাগ দিনই আমরা দুজনেই মনে করি—হেরেছি।

কারণ, আমরা দুজনেই নিশ্চিত থাকি, অন্যজনের কথা শুনে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবু পরদিন বিকেলে আবার পাশাপাশি বসি।

আবার ছবি খুলি।

আবার তর্ক করি।

কারণ, আমরা দুজনেই জানি, এই ঝগড়া না হলেও পত্রিকা বের হবে, কিন্তু নিউজরুমটা আর নিউজরুম থাকবে না।

আর যদি কোনো দিন দেখি সাজিদ কোনো তর্ক ছাড়াই বলছে, ‘আপনি যেটা ভালো মনে করেন, সেটাই দেন।’

সেদিন আমি ছবি সিলেক্ট করব না। আগে নিশ্চিত হব, লোকটা সত্যিই সাজিদ কি না!