
জীবন এত ছোট কেন—এ আক্ষেপ নেই, এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। অথচ জীবন উপভোগের উপকরণ কত বিপুল! জানার–বোঝার, দেখার–শোনার, পড়ার–সক্ষমতার অপরিসীম সীমাবদ্ধতা নিয়েই বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে জি এইচ হাবীবের নিয়মিত পাক্ষিক—‘মৃদুল মধুর সন্তরণ’
ফরাসি বিপ্লবে জনতার ভূমিকাকে সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকের ব্রিটিশ রক্ষণশীলদের কাছে—যাঁদের মধ্যে এডমান্ড বার্কের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—জনসমক্ষে দৃশ্যমান সেই ঝাঁকবদ্ধ মানবতা ছিল রক্তপিপাসু এবং সহিংসতাপূর্ণ এক প্রতিশোধপরায়ণ দানব। উল্লেখ্য, ১৭৯০ সালে প্রকাশিত অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী রাজনৈতিক পুস্তিকা রিফ্লেকশনস অন দ্য রেভোল্যুশন ইন ফ্রান্স–এ বার্ক বিপ্লবী জনতার কর্মকাণ্ডকে ভাবাবেগতাড়িত, আতঙ্কজনক বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সেই ঝাঁকবদ্ধ মানবতা এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে তিনি লোকপ্রিয় ইচ্ছার আইনানুগ ব্যবস্থাপনা হিসেবে নয়, বরং রক্তপিপাসা আর সহিংসতাতাড়িত বিপজ্জনক, বিশৃঙ্খল ও দানবীয় শক্তি হিসেবে দেখেছেন, যে শক্তি কিনা সভ্য সমাজ, ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলার ভিত্তিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলার হুমকি দেয়। তিনি বিশেষ করে প্যারিসের ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’র ‘বিকারগ্রস্ত ভিত্তিহীন বিশ্বাস’ আর ‘বর্বর বিজয়’ নিয়ে খেদ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘সম্ভ্রমপূর্ণ’ রাজতন্ত্র ও অভিজাত সমাজের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে ফরাসি বিপ্লবকে একটি ভয়ংকর ও নৈরাজ্যমূলক আশ্চর্য ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। রচনাটি এখন ইতিহাসে রক্ষণশীল রাজনৈতিক চিন্তার একটি দলিল ও অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক রেটরিকগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিপুল পরিচিতি লাভ করেছে।
বার্কের চিন্তাকে ধারণ করেছিলেন রক্ষণশীল টমাস কার্লাইল, ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস রচনার সময়। তারপর সেটাকে আরও স্মরণীয়ভাবে নাটকীয়তা দান করেছিলেন চার্লস ডিকেন্স তাঁর আ টেল অব টু সিটিজ উপন্যাসে এবং তা আরও বিদ্বজ্জনোচিতভাবে আলোচিত হয়েছিল ফরাসি ঐতিহাসিক গুস্তাভ লে বোঁর দ্য সাইকোলজি অব ক্রাউড (১৮৯৫) গ্রন্থে। স্রেফ একটি সংগঠিত জনতার অংশ হওয়ার কারণেই একজন মানুষ সভ্যতার মইয়ের বেশ কয়েক ধাপ নিচে নেমে যায়। লে বোঁ এই বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সে একজন মার্জিত রুচিসম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে, কিন্তু জনতার মধ্যে সে একজন বর্বর, এমন এক প্রাণী, যে তার প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত।
স্রেফ একটি সংগঠিত জনতার অংশ হওয়ার কারণেই একজন মানুষ সভ্যতার মইয়ের বেশ কয়েক ধাপ নিচে নেমে যায়। লে বোঁ এই বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সে একজন মার্জিত রুচিসম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে, কিন্তু জনতার মধ্যে সে একজন বর্বর, এমন এক প্রাণী, যে তার প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে আসে এক প্রতি-ঐতিহ্য; জনতাকে তা কার্যকরভাবে একদল মানুষ হিসেবে দেখল, যেসব মানুষ একটি পছন্দকে বাস্তব রূপ দান করছে। এই ফরাসি ধরনের বামপন্থী ভাষ্য সেটার শিখরে পৌঁছায় জাঁ পল সার্ত্রে ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে বাস্তিল দুর্গ পতনের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন সেখানে। এই বর্ণনায় সার্ত্রে একটি ‘একীভূত গোষ্ঠী’র ধারণার কথা বলেছিলেন, জনতার সেই শক্তির দিকে ইঙ্গিত করার জন্য যে শক্তি বিশৃঙ্খল ও হইহট্টগোলপূর্ণ আবেগকে বাধ্যতামূলক কাজ বা ক্রিয়াতে পরিচালিত করতে পারে।
সার্ত্রে আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে এতটাই পরিচিত ছিলেন যে রাস্তার যেকোনো উচ্ছৃঙ্খল জনতার ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কার ব্যাপারটি তাঁর দেখতে না পারার কথা নয়। কিন্তু তিনি তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রধানত ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেছেন, যে কর্মকাণ্ড কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনই ঘটাতে পারে তা নয়, বরং সেই সঙ্গে একটি অংশভাগী অস্তিত্ববাদী এপিফেনি বা নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গও ঘটাতে পারে: একটি সাধারণ বিপদের মুহূর্তে বা কোনো সুনির্দিষ্ট জরুরি লক্ষ্য সাধনের জন্য স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে একত্র হওয়া একদল মানুষ সাময়িকভাবে, উত্তেজিত অবস্থায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ব্যক্তিগত হতাশার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারে। উচ্ছৃঙ্খল জনতার প্রতি এ দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘মেলোড্রামা’ আখ্যা দিয়ে অ্যাডাম গোপনিক বলতে চান যে এখানে একটা বৃহত্তর সত্যকে তত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, আর তা হলো প্যারিসের জনতা যখন বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটায় তখন তারা ভেতরে ঢুকে সম্ভবত সাতজনের বেশি হতভম্ব বন্দী পায়নি; তত দিনে নানা সংস্কারমূলকে পদক্ষেপ নেওয়াতে সংখ্যাটা এতটাই কমে এসেছিল। কামু একবার সার্ত্রেকে এই বলে বিদ্রূপ করেছিলেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্যারিস যখন নাৎসি শত্রুমুক্ত হয় সার্ত্রে তখন সে শহরের সবচেয়ে প্রাচীন ও মর্যাদাবান থিয়েটার ‘কমেডি ফ্রসেজ’-এ আরামকেদায়ার বসে ঝিমাচ্ছিলেন।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জর্জ রুদের ধ্রুপদি গ্রন্থ দ্য ক্রাউড ইন দ্য ফ্রেঞ্চ রেভোল্যুশন (১৯৫৯) ‘নিচ থেকে দেখা ইতিহাস’–এর একটি বিশিষ্ট নিদর্শন। সেখানে বৈপ্লবিক জনতাকে অভিজাততন্ত্রী চোখে অযৌক্তিক, বর্বর এবং অজ্ঞাতপরিচয় ‘দানব’ হিসেবে দেখানো হয়নি, যা কি না ঊনবিংশ শতকীয় চিত্রায়ণে হয়েছে। লে বোঁর দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড (১৮৯৫) গ্রন্থের ক্রুদ্ধ, একক দানবের বদলে, রুদে সেই বিপ্লবের (উচ্ছৃঙ্খল) জনতাকে সুনির্দিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পেশাগতে নানা দলে ভাগ করে দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন যে তারা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে জড়ো হওয়া কিছু মানুষের সমষ্টি, ফরাসি সমাজের সত্যিকারের নিচু তলার বাসিন্দা নয়, বরং আমরা যাকে বলি পেটি বুর্জোয়া, তাই। রক্তপিপাসু, অনিয়ন্ত্রিত, উচ্ছৃঙ্খল দানব বা আবার কোনো সচেতন সম্প্রদায়ও নয়, বরং সেই বৈপ্লবিক জনতার মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন কারিগর, ছোটখাটো ব্যবসায়ী, প্রমুখ—এমন কিছু মানুষ, যাঁরা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু জিনিসের দাবি জানাচ্ছিলেন, যেমন আরও রুটি, আরও ভালো বেতন-কড়ি। সত্যি বলতে, বাস্তিলে আক্রমণ চালানো লোকজন যে কারাগারটিতে মাত্র সাতজন বন্দী দেখতে পেয়ে হতাশ হয়েছিল, তা কিন্তু নয়। তারা সেখানে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে জন্য সবার মনোযোগ আকর্ষণে একটি কাজ করতে গিয়েছিল, কেবলই জেল ভেঙে কাউকে উদ্ধার করতে বা পালাতে সাহায্য করতে যায়নি।
রুদে সেই বিপ্লবের (উচ্ছৃঙ্খল) জনতাকে সুনির্দিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পেশাগতে নানা দলে ভাগ করে দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন যে তারা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে জড়ো হওয়া কিছু মানুষের সমষ্টি, ফরাসি সমাজের সত্যিকারের নিচু তলার বাসিন্দা নয়, বরং আমরা যাকে বলি পেটি বুর্জোয়া, তাই।
বছর দেড়েক আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ব্রিটিশ সাংবাদিক ড্যান হ্যানকক্সের নাতিদীর্ঘ নতুন বই মাল্টিচ্যুডস: হাউ ক্রাউডস মেড দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড-এ লেখক জনতার বিরুদ্ধে বিষোদ্গারকারীদের একহাত নেওয়ার দৌড়ে তার পূর্বসূরি বিদ্বজ্জনদের ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। তিনি জনতার ও জনতার ক্রিয়াকলাপের একজন অকুণ্ঠ সমর্থক। ‘রাজনৈতিক জনতা যে শিহরণজাগানো শক্তির জন্ম দেয়’, যেখানে লোকে বাতাসে ‘ইতিহাসের একটা স্পর্শযোগ্য, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং প্রায়ই, টানটান উত্তেজনাপূর্ণ আবহ’ অনুভব করতে পারে, হ্যানকক্স আমাদের সে কথা মনে করিয়ে দেন। মানুষ উপলব্ধি করে যে আমাদের নির্বাচিত নেতারা তাঁদের প্রতিশ্রুতি কোনো না কোনোভাবে ভঙ্গ করবেন, জনগণের প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পারবেন না, সেটা অনিচ্ছায় হোক বা স্বেচ্ছায়। আর সেসব ব্যর্থতা জনগণ মানতে পারে না, তখন তারা গণতন্ত্র নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়, এবং বাস্তিল, ক্যাপিটলের দিকে এগোয়।’ শাহবাগ বা গণভবনের দিকেও। জনতা হচ্ছে তাই যা জনমানসের সংরাগ, বিদ্রোহ, ইত্যাদি নিয়ে ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ায়।
তাঁর বইয়ে অবশ্য তিনি মাঝেমধ্যে এ কথা স্বীকার করেছেন যে জনতা মোটেই ধোয়া তুলসীপাতা নয় সব সময়। তবে অপেক্ষাকৃত বেশি অপ্রীতিকর সমাবেশগুলোকে আদৌ জনতা বলতে তার অনীহা আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ন্যায়পর জনতা আর উচ্ছৃঙ্খল জনতার মধ্যে ফারাক করার মাপকাঠি হচ্ছে তারা হ্যানকক্সের রাজনীতির পক্ষে না বিপক্ষে—পক্ষে হলে প্রথমটি, নইলে দ্বিতীয়টি।
সত্যি বলতে, চার্লস ডিকেন্স উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে যে দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, বিশেষ করে তাঁর আ টেল অব টু সিটিজ উপন্যাসে, তার যথেষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও লেখক সাইমন চামা—প্রজাতন্ত্রের পক্ষের লোক হয়েও—ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে রচিত তাঁর সিটিজেনস: আ ক্রনিকল অব দ্য ফ্রেঞ্চ রেভোল্যুশন গ্রন্থে, কার্লাইলের দৃষ্টিভঙ্গিরই সমর্থনে বলছেন যে সেই বৈপ্লবিক উচ্ছৃঙ্খল জনতার মধ্যে একটা সুপ্ত মন্দ ব্যাপার ছিল। স্পষ্টতই, জ্যাকোবিনদের প্রতিশোধমূলক গণকৃত্যগুলোর সাফাই গাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়—এই যেমন উচ্ছৃঙ্খল জনতার হর্ষধ্বনির মধ্যে পরিবারগুলোকে একের পর এক জনসমক্ষে তাদের সদস্যদের নিধনযজ্ঞ দেখতে বাধ্য করা। সবাই জানে যে প্যারিসের একটি জনতা একটা কারাগারের দখল নেওয়ার পর অসহায় প্রিন্সেস দে ল্যাম্বেলেকে খুন করে তাঁর দেহটি ছিন্নভিন্ন করে তাঁর মাথাটা একটা খুঁটির ডগায় গেঁথে সেটা নিয়ে রানির বাসস্থানের সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল, যাতে তিনি দেখেন তাঁর বন্ধুর কপালে কী ঘটেছে। হতে পারে এই উচ্ছৃঙ্খল জনতা বহু ধরনের, বহু রকম উদ্দেশ্য তাদের। কিন্তু তারপরও তারা খুনে।
যখন কেউ গণতন্ত্রকে নিজের হাতে তুলে নেয় বা নিতে চায়, তখন তার হাতে আর যা-ই হোক গণতন্ত্র থাকে না। কারণ, গণতন্ত্রের শুরু এই স্বীকৃতি দিয়ে যে অন্য লোকজনেরও হাত আছে। ভারতে মুসলমানদের ওপর উচ্ছৃঙ্খল যে হিন্দু জনতা প্রায়ই মুসলমানদের ওপর কিছুদিন পরপরই হামলে পড়ে—গরুর সুরক্ষার চেয়ে যার অন্য কোনো সমর্থিত আদর্শ প্রায় থাকে না বললেই চলে—তারাও হ্যানকক্স যে সক্রিয় বা প্রত্যক্ষ প্রতিবাদকারীদের জয়গান করেন তাদের মতোই স্বতঃস্ফূর্ত।
চিরন্তন সত্যটি হচ্ছে, একজনের দৃষ্টিতে যা তাণ্ডব সৃষ্টিকারী উচ্ছৃঙ্খল জনতা, অন্যের কাছে তা ন্যায়সংগত প্রতিবাদ এবং উন্মুক্ত ও বদ্ধ জনতার মধ্যে সীমারেখা, একটা মানে বা অর্থের অন্বেষণে ব্যস্ত সার্ত্রের উদ্দীপ্ত অ্যাকটিভিস্ট আর কারলাইলের রক্তপিপাসু উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খল জনতার মধ্যে ফারাকটা নিয়ত পরিবর্তনশীল।
স্পষ্টতই হ্যানকক্সের বইয়ে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে গণপিটুনিতে বা বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার ঘটনা ঘটানো উচ্ছৃঙ্খল জনতার কোনো উল্লেখ নেই (যেসব বীভৎস ঘটনার মিল পাওয়া যাবে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের কিছু আগে–পরে ঘটা ঘটনাগুলোর সঙ্গে)। অথচ তাদেরকেই তখন দেখা হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ও মৌলিক লোকগ্রাহ্য বিদ্রোহ করা আর অক্ষম স্থানীয় পুলিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো রাস্তার জনসমাবেশের আদর্শ হিসেবে। অথচ রাষ্ট্রের তরফ থেকে আরোপিত কোনো শৃঙ্খলার অনুপস্থিতির কারণেই কিন্তু অসহায় কালো মানুষগুলো এভাবে গাছের ডালে ঝুলছিল।
আসলে সেই রোমক যুগ থেকে আজ অবধি চিরন্তন সত্যটি হচ্ছে, একজনের দৃষ্টিতে যা তাণ্ডব সৃষ্টিকারী উচ্ছৃঙ্খল জনতা, অন্যের কাছে তা ন্যায়সংগত প্রতিবাদ (দুই প্রতিপক্ষের একদলের কাছে যে বীর, অন্য দলের কাছে সে গাদ্দার যেমন) এবং উন্মুক্ত ও বদ্ধ জনতার মধ্যে সীমারেখা, একটা মানে বা অর্থের অন্বেষণে ব্যস্ত সার্ত্রের উদ্দীপ্ত অ্যাকটিভিস্ট আর কারলাইলের রক্তপিপাসু উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খল জনতার মধ্যে ফারাকটা নিয়ত পরিবর্তনশীল। ঠিক যেমন কানেত্তি ভেবেছিলেন, জনতা হচ্ছে আকস্মিকভাবে উত্থানশীল সত্তা এবং লোকজন দশে মিলে যা করবে তা হয়তো তারা কখনো একা করত না। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলে যে উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে, বিশেষ করে কালো মানুষদের হত্যা করেছিল, গাছে গাছে লটকে দিয়েছিল, সেই উচ্ছৃঙ্খল জনতার মধ্যে এমন অনেক মানুষ ছিল, যারা রবিবার গির্জায় যেত এবং বেশির ভাগ সময় তাদের প্রতিবেশী কালো মানুষদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করত।
উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিষয়টি হচ্ছে বিভিন্ন আবেগকে শান্তিপূর্ণ দ্বন্দ্ব আর সুশৃঙ্খল বিনিময়ের ভেতর নিয়ে আসা, কিন্তু সে কাজটি করতে গিয়ে মূলত যে সংরাগ বা সুতীব্র আবেগ জনতার জন্ম দিয়েছিল, সেটাকে যেন স্তিমিত করার চেষ্টা না করা হয়। ডিকেন্সের ‘পিকউইক পেপার্স’-এর মতো আমরাও সবচেয়ে বড় জনতার সঙ্গে উচ্চকণ্ঠ হতে চাই, কিন্তু তার আগে আমরা চাই আমাদের জনতাকে সবচেয়ে বড় হিসেবে তৈরি করতে, যাতে আমরা চিৎকার করতে পারি। আমরা এই ভয়ের মধ্যে বাস করি যে একটা উচ্ছৃঙ্খল জনতা না জানি কী করে বসে; আমরা এই আশা নিয়েও চেয়ে থাকি যে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ না জানি কোন প্রাপ্তি বয়ে আনে। আমাদের সামাজিক অস্তিত্বের মধ্যে এই টানাপোড়েন, এই দোদুল্যমানতা নিহিত আছে এবং এ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বিপ্লবীরা হয়তো অন্য কথা বলবেন।
তাহলে আমরা কি জনতার প্রজ্ঞার কথা বলতে পারি না? কখনো–সখনো পারি বৈকি। আর উচ্ছৃঙ্খল জনতার উন্মত্ততার কথা? এবারও সেই একই উত্তর: পারি, কখনো–সখনো। শেন ববিক্রি উল্লিখিত সেই ‘ভালগাস’ আর ‘পপুলাস’, আর অন্যগুলোর আকৃতি যা-ই হোক না কেন, সেই শব্দগুলোর মধ্যে একটা সত্য নিহিত রয়েছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী, এমনকি সহস্রাব্দজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। জনসমাবেশের পরিবর্তনশীল বৈচিত্র্য আমরা লক্ষ করি আর সেটার একটা অর্থ দাঁড় করাতে চাই; অথচ সেই অর্থটি রয়েছে খোদ সেই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেই। জনতাকে একটি উচ্ছৃঙ্খল সমাবেশে পরিণত করা সব সময়ই খুব সহজ। আর আমরা এটা দেখেও খুব একটা অবাক হই না যে আজ নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী যে উচ্ছৃঙ্খল জনতা ক্ষমতাকে প্রতিহত করছে, কয়েক দিন বা কয়েক বছর পর তারাই সেই ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দাঁড়ায়, যাকে প্রতিহত করা দরকার। নিরীহ জনতা উচ্ছৃঙ্খল জনতায় পরিণত হতে পারে, জনতা একটা সেনাদলেও পরিণত হতে পারে। কিন্তু জনতাকে একটা সম্প্রদায়ে বা গোষ্ঠী বা দলে পরিণত করা কঠিন কাজ।
সূত্র: অ্যাডাম গোপনিক রচিত ‘গেট ইট টুগেদার’