যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাশে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশনের নির্বাহী সম্পাদক চেস্টার উইলিয়ামস।
যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাশে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশনের নির্বাহী সম্পাদক চেস্টার উইলিয়ামস।

রবীন্দ্রনাথ ও যুক্তরাষ্ট্র

চিত্রা কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার নাম ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’। গভীরভাবে দার্শনিক এই কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের কথা ভেবে লেখেননি। তবে পশ্চিমে, বিশেষত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে, তিনি যে দ্রুততায় জনপ্রিয়তার চূড়া থেকে পা পিছলে পড়েছিলেন, তাতে তাঁর নিজের বেলায় এই শিরোনাম বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জিত নয়।

নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের মাত্র দেড় দশকের মাথায় রবীন্দ্রনাথ প্রথম এশীয় ও প্রথম অশ্বেতাঙ্গ লেখক হিসেবে সাহিত্যে এ পুরস্কার লাভ করেন। বাংলার কবি হলেও পুরস্কারটি তাঁকে দেওয়া হয় তাঁর ইংরেজি গীতাঞ্জলি: সং অফারিংস কাব্যসংকলনের জন্য। নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়, ‘তাঁর গভীর সংবেদনশীল, নবীন ও সুন্দর কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি অসামান্য দক্ষতায় নিজের ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত কাব্যভাবনাকে পাশ্চাত্য সাহিত্যের অংশ করে তুলেছেন।’

এ পুরস্কার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথকে প্রায় রাতারাতি এক অতি যশস্বী কবি বা সেলিব্রিটিতে পরিণত করে। অপ্রত্যাশিত এই স্বীকৃতিতে কবি প্রীত হয়েছিলেন। বিশেষভাবে প্রীত হয়েছিলেন এই দেখে যে তাঁর কিছুটা সেকেলে ধাঁচের ইংরেজিও এজরা পাউন্ড ও ইয়েটসের মতো মহৎ কবিরা লুফে নিয়েছেন। তিনি বাংলার কবি, কিন্তু পশ্চিমা পাঠক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করতে বেছে নিয়েছিলেন প্রাচীন ভারতীয় দর্শন ও উপনিষদের কথা। চুক্তিবদ্ধ হয়ে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বক্তৃতা-সফরের ব্যবস্থাও করেছিলেন। ১৯১৫ সালে নিউইয়র্কের কার্নেগি হলে তাঁর ভাষণ শুনতে এত মানুষের সমাগম হয়েছিল যে অনেকে আসন না পেয়ে মেঝেতে বসে কিংবা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তা শুনেছিলেন।

পাঁচ বছর পেরোনোর আগেই খ্যাতির এই স্বর্গ থেকে ছিটকে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। এজরা পাউন্ড ও ইয়েটস, যাঁরা তাঁকে স্বর্গে ওঠার সিঁড়িটি এগিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সিঁড়ি সরিয়ে নেন। একসময় রবীন্দ্রনাথকে দান্তের সঙ্গে তুলনা করা পাউন্ড পরে তাঁকে কার্যত অপাঠ্য বলে বাতিল করে দেন। তাঁর প্রধান আপত্তি ছিল রবীন্দ্রনাথের নিজের করা ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে। ইয়েটস একসময় উদ্‌ভ্রান্তের মতো রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। পরে তিনিও বলেন, ‘এই লোক—শুধু এই লোক কেন, কোনো ভারতীয়ই—ইংরেজি জানে না।’ বার্ট্রান্ড রাসেল কিছুটা বিদ্রূপের সুরে বলেন, ‘এই লোক মিষ্টি মিষ্টি আবোলতাবোল বকে; কিন্তু যা বলে, তার সবই উপনিষদে আগেই বলা হয়েছে।’ আরও পরে বিংশ শতাব্দীর ইংরেজ কবি ফিলিপ লারকিন খানিকটা রুক্ষ ভাষায় বলেছিলেন, ‘ফাক টেগোর।’

ইংরেজ কবি হওয়ার চেষ্টা করে তিনি যে খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেননি, রবিঠাকুর কিছুটা বিলম্বে হলেও তা বুঝেছিলেন। অনেক পরে নিকট বন্ধু রটেনস্টাইনকে লেখা এক চিঠিতে তিনি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ঘরের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে বিদেশি দেবতার কৃপাপ্রার্থী হয়ে তিনি ভুলই করেছেন। নিজের অনুবাদের দুর্বলতা স্বীকার করে তিনি লিখেছেন, ‘আমি জানি, তড়িঘড়ি করে প্রস্তুত এই লেখায় ভিনদেশি চকমকি আর বিদেশি ভাবভঙ্গি-কথাবার্তা জুড়ে দিয়ে আপনাদের গৌরবের প্রদেশে নাক গলানো আমার কিছুতেই ঠিক হয়নি।’

আবদুল্লাহ জাহিদের বই ‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’–এর প্রচ্ছদ
রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে এজরা পাউন্ডের একধরনের মালিকানাবোধ ছিল। কবি নিজেও তাঁর অনুবাদ নিয়ে এজরা পাউন্ডের শিক্ষকতা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ এজরা পাউন্ডের পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজেই নিজের কবিতার অনুবাদ প্রকাশে মেতে ওঠেন। যশ ও অর্থপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ব্রিটিশ প্রকাশক ম্যাকমিলানের তাগিদ এর পেছনে কাজ করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। এতে পাউন্ড ভীষণ ক্ষিপ্ত হন।

এ কথা ১৯৩৫ সালের। তারপর প্রায় এক শতক কেটে গেলেও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। পশ্চিমের চোখে রবিঠাকুর এখনো প্রাচ্যদেশীয় এক চকমকি ছাড়া আর কিছু নন। তবে এ কথা মানতেই হবে, আটলান্টিকের দুই পারে একাধিক যোগ্য ও দায়িত্বশীল অনুবাদকের অধ্যবসায়ের ফলে রবিঠাকুরের কবিতার পুনর্মূল্যায়নের একটি সচেতন প্রয়াস গড়ে উঠেছে। তাঁদের মধ্যে উইলিয়াম রাদিচে, অ্যান্ড্রু রবিনসন ও কেতকী কুশারী ডাইসন উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালিরাও এই কাজে হাত লাগিয়েছেন। মার্কিন রবীন্দ্র–ভক্তদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁরা টেগোর সোসাইটি গড়ে তুলেছেন। তাঁদের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবাহী ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রজয়ন্তী ও নাট্যোৎসব তো রয়েছেই। রক্তকরবী রচনার শতবর্ষ উপলক্ষে এই নিউইয়র্কেই নাটকটির নতুন ও আধুনিক ব্যাখ্যাসহ মঞ্চায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রবীন্দ্র-নবায়নের এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবদুল্লাহ জাহিদের সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ। (ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০২৬)। রবীন্দ্রনাথ মোট পাঁচবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছিলেন, মূলত শান্তিনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। অপরিসীম যত্ন ও শ্রমে জাহিদ এই দেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক সম্পর্কের গ্রন্থিগুলো উন্মোচন করেছেন। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রকাশিত গ্রন্থ ও স্মারক প্রকাশনার অভাব নেই। এমনকি মার্কিন সরকারের উদ্যোগেও কবির জীবনী ও তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের বিবরণসংবলিত গ্রন্থ প্রকাশনা রয়েছে। এত সব প্রকাশনার ভিড়ে জাহিদের গ্রন্থটি ব্যতিক্রমী; কারণ, বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ও যুক্তরাষ্ট্র-সংক্রান্ত তথ্যের এমন একটি আকরগ্রন্থ এই প্রথম।

মানছি, গভীর বিশ্লেষণ কিংবা নতুন কোনো আবিষ্কারের ওপর আলোকপাত এ গ্রন্থের লক্ষ্য নয়। জাহিদ নিজের কথা এখানে বলেছেন খুব সামান্যই। রবিঠাকুরের নিজের কথা—কখনো চিঠিতে, কখনো স্মৃতিচারণায়, কখনো ভাষণে আবার কখনো সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে—কালানুক্রমিকভাবে সাজিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কবির তিন দশকের সম্পর্কের প্রায় পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। সে অর্থে গ্রন্থটির চরিত্র এনসাইক্লোপেডিক বা বিশ্বকোষীয়। ভবিষ্যতের কোনো নবীন গবেষক এই গ্রন্থ হাতে পেলে বাংলার এই কবিকে নিয়ে আরও সহানুভূতিশীল বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবেন—এমন প্রত্যাশা অবান্তর নয়।

গ্রন্থের প্রাক্‌–ভূমিকায় আবদুল্লাহ জাহিদ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের তিনটি মাত্রা চিহ্নিত করেছেন। সমগ্র গ্রন্থ তিনি এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্ক ও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নির্মাণে ও নির্ণয়ে ব্যয় করেছেন।

প্রথমত, গীতাঞ্জলিকে বিশ্বসভায় পরিচিত করতে এসব সফর বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল মার্কিন কবি এজরা পাউন্ড ও মার্কিন সাময়িকী পোয়েট্রির। জাহিদ বস্তুনিষ্ঠভাবে রবীন্দ্রনাথ ও পাউন্ডের সম্পর্কের বিবর্তনের সব নাটকীয়তা, বৈচিত্র্য, দ্বৈততাসহ তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে এজরা পাউন্ডের একধরনের মালিকানাবোধ ছিল। কবি নিজেও তাঁর অনুবাদ নিয়ে এজরা পাউন্ডের শিক্ষকতা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ এজরা পাউন্ডের পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজেই নিজের কবিতার অনুবাদ প্রকাশে মেতে ওঠেন। যশ ও অর্থপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ব্রিটিশ প্রকাশক ম্যাকমিলানের তাগিদ এর পেছনে কাজ করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। এতে পাউন্ড ভীষণ ক্ষিপ্ত হন। কবির প্রতি তাঁর ক্রোধ ও উপহাস কতটা তীব্র ছিল, তার প্রমাণ হিসেবে জাহিদ পাউন্ডের ব্যঙ্গাত্মক রচনা ‘যদিন্দ্রনাথ মাহোয়ারস অকুপেশন’-এর কথা উল্লেখ করেছেন।

জাহিদ অবশ্য মনে করেন, তাঁর সন্তসুলভ প্রবণতা নয়, জাতীয়তাবাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রতি প্রকাশ্য বিরাগই সেখানে তাঁর জনপ্রিয়তায় ধস নামার কারণ। অর্থ সংগ্রহের আশায় হাতে টুপি নিয়ে যে কবি যুক্তরাষ্ট্র চষে বেড়াচ্ছেন, তাঁর মুখে ভোগবাদের এই সমালোচনা কিছুটা শূন্যগর্ভ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কোথাও রবিঠাকুরের নাম নেই; কিন্তু এটি যে তাঁকে ব্যঙ্গ করে লেখা, তাতেও সন্দেহ নেই। যদিন্দ্রনাথ এমন একজন মানুষ, যাঁর কোনো সুনির্দিষ্ট পেশা নেই। তাঁর একমাত্র কাজ নারীদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং মাঝেমধ্যে ছেলেভোলানো ধর্মকথা বিলি করা। রচনাটির বিস্তারিত বিবরণ কিংবা পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ আমার চোখে পড়েনি। জাহিদ এর কিছু অংশ আমাদের জন্য উদ্ধার করেছেন; সে জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। বস্তুত, দুই কবির সম্পর্কের গতিপথ অনুসরণ করে তিনি যে গল্প তুলে ধরেছেন, তার ভিত্তিতে অনায়াসেই একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক নাটক বা প্রহসন লেখা সম্ভব। জাহিদ এ কথাও জানিয়েছেন, কবির প্রতি আপাত বিরাগ সত্ত্বেও এজরা পাউন্ডের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। প্রমাণ হিসেবে পাউন্ডের দুটি ইংরেজি কবিতাও তিনি অনুবাদ করেছেন। কিন্তু কোথায় ও কীভাবে এই প্রভাব পড়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

দ্বিতীয়ত, সফরকালে বিভিন্ন ভাষণ ও সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ নিঃসংকোচে পশ্চিমা সভ্যতার সংকটের চরিত্র তুলে ধরেছিলেন। পূর্ব ও পশ্চিম একে অপরের কাছ থেকে নেবে ও দেবে—এই পারস্পরিক আদান-প্রদানে রবীন্দ্রনাথের আস্থার কথা সুবিদিত। তবে দুই সভ্যতার অসমসম্পর্কের মধ্যে সমমর্যাদার আদান-প্রদান যে সম্ভব নয়, কবি তা বুঝেছিলেন জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে।

এই গ্রন্থে জাহিদ বেশ বড় পরিসরজুড়ে ‘জাতীয়তাবাদ’ প্রশ্নে কবির ভাবনার সঙ্গে আমাদের পুনঃপরিচয় ঘটিয়েছেন। ১৯১৬ সালে প্রথমে জাপানে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন। আমরা এমন এক সময়ের কথা বলছি, যখন জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততা চূড়ান্ত পর্যায়ে। ইউরোপের দেশগুলো এক মহাসমরে জড়িয়ে পড়েছে; সেই যুদ্ধের আগুন ছড়িয়েছিল মূলত জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকেই। যুদ্ধ থেকে দূরে থাকলেও জাতীয়তাবাদের ঢেউ যুক্তরাষ্ট্রেও এসে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথের চোখে জাতীয়তাবাদ এক বিপজ্জনক, স্বয়ংক্রিয় ও স্বার্থপর মতাদর্শ, যা মানুষের মানবিকতা হরণ করে এবং তাকে লোভী ও বস্তুতান্ত্রিক করে তোলে। বলাই বাহুল্য, মার্কিন মহলে কবির এ বক্তব্য মোটেই ভালো লাগেনি। তাঁর যুদ্ধবিরোধী ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী অবস্থানের কারণে রবীন্দ্রনাথ মার্কিন প্রশাসনের কোপানলে পড়েন। এক রহস্যময় সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁকে হেনস্তার মুখেও পড়তে হয়। সেই নাটকীয় ঘটনাও এ গ্রন্থে বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে।

তৃতীয়ত, ১৯১৩ থেকে ১৯৩০—এই ১৭ বছরে বারবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এ দেশের মানুষের কাছে প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক ও আত্মিক শক্তিকে পরিচিত করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন। ভারত বলতে তিনি প্রাচীন ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ও গভীরভাবে মানবিক এক সভ্যতার চিত্র তুলে ধরেছিলেন। তিনি কবি, অথচ তাঁর কোনো ভাষণেই কবিতা বা সাহিত্য নিয়ে কথা বলেননি; বলেছেন ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে। তাঁর আগে স্বামী বিবেকানন্দ যুক্তরাষ্ট্রে এসে ভারতের আধ্যাত্মিকতার বৈশ্বিক শক্তি নিয়ে ভাষণ দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সম্ভবত সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই রবীন্দ্রনাথ গোড়া থেকে নিজেকে একজন ভারতীয় সন্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন। এর কতটা বাণিজ্যিক কৌশল আর কতটা তাঁর অকৃত্রিম বিশ্বাস, তা বলা কঠিন। জাহিদ অবশ্য মনে করেন, তাঁর সন্তসুলভ প্রবণতা নয়, জাতীয়তাবাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রতি প্রকাশ্য বিরাগই সেখানে তাঁর জনপ্রিয়তায় ধস নামার কারণ। অর্থ সংগ্রহের আশায় হাতে টুপি নিয়ে যে কবি যুক্তরাষ্ট্র চষে বেড়াচ্ছেন, তাঁর মুখে ভোগবাদের এই সমালোচনা কিছুটা শূন্যগর্ভ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিপুল শ্রমে আবদুল্লাহ জাহিদ যে আকরগ্রন্থ লিখেছেন, তাতে একদিকে এক শতাব্দী আগের মার্কিন সমাজ ও সংস্কৃতির একটি ভালো ছবি মেলে; অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার দোলাচলও চমৎকারভাবে ধরা পড়ে। একই সঙ্গে ধরা পড়ে বাংলা ভাষার এই শ্রেষ্ঠ কবির ব্যক্তিত্বের অসংগতি ও পরস্পরবিরোধিতা।

আগেই বলেছি, এ গ্রন্থ মূলত রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা ও বলা কথার ভিত্তিতে নির্মিত। বাংলায় এই বিস্তারিত বিবরণ এই প্রথম লিপিবদ্ধ হলো। ফলে অনুবাদই গ্রন্থটির মূল শক্তি, আবার একই সঙ্গে প্রধান দুর্বলতাও। রবীন্দ্রনাথ-সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহে জাহিদ যতটা পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, অনুবাদে ততটা নয়। অনেক সময় তাঁর বাংলা অনুবাদ যান্ত্রিক ও প্রাণহীন মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি কিছুটা সেকেলে, কিন্তু তা রঙিন ও বর্ণিল, এতে সন্দেহ নেই। অনুবাদে সেই বর্ণবৈচিত্র্য রক্ষিত হয়নি। অনুমান করি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মার্কিনিদের প্রতি কিঞ্চিৎ বিদ্রূপ করে বন্ধু রটেনস্টাইনকে কবি লিখেছিলেন, ‘দেয়ার ইজ আ টাচ অব ভালগ্যারিটি ইন দেয়ার ক্লোসনেস।’ জাহিদের অনুবাদে তা দাঁড়িয়েছে, ‘তাদের স্পর্শে একধরনের অভদ্রতা রয়েছে।’ আমার মনে হয়, অনুবাদটি অধিকতর যথাযথ হতো যদি বলা হতো, ‘তাদের অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার মধ্যে একধরনের স্থূলতা রয়েছে।’

যান্ত্রিক অনুবাদ কখনো কখনো অর্থহীনও হয়ে দাঁড়ায়। যেমন কবির একসময়ের ব্যক্তিগত সহকারী লেনার্ড এলমহার্স্টের স্মৃতিকথা দ্য পোয়েট অ্যান্ড দ্য প্লাউম্যান থেকে নেওয়া একটি উদ্ধৃতির অনুবাদ আমার কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এলমহার্স্টকে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিন্তু তখন তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। এলমহার্স্ট লিখেছেন, ‘আ কেব্‌ল অ্যারাইভড ফ্রম ইন্ডিয়া ইন আনসার টু মাই লেটার অব জুলাই টু টেগোর: “নো ফান্ডস অ্যাভেইলেবল, ডোন্ট কাম।”’ জাহিদের অনুবাদে কথাটি হয়েছে, ‘ভারতের কাছ থেকে জুলাই মাসের চিঠির উত্তরে কেব্‌ল এল, “কোনো তহবিল উপলব্ধ নয়। আসবেন না।”’ অথচ এর সহজ অর্থ, ‘জুলাইয়ে রবীন্দ্রনাথকে লেখা আমার চিঠির জবাবে ভারত থেকে একটি তারবার্তা এল: “তহবিলে অর্থ নেই, এসো না।”’

কিছুদিন পর তহবিলের ব্যবস্থা হলে এলমহার্স্ট কবিকে বার্তা পাঠালেন, ‘ফান্ডস অ্যাভেইলেবল, ক্যান আই কাম?’ জাহিদের অনুবাদে তা হয়েছে, ‘তহবিল উপলব্ধ। আমি কি আসব?’ স্বাভাবিক বাংলায় কথাটি হতে পারত, ‘টাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমি কি আসতে পারি?’

এ ধরনের উদাহরণ আরও দেওয়া যায়, যদিও তা কোনোভাবেই বইটির সামগ্রিক গুণাগুণের নির্ণায়ক নয়। বিপুল শ্রমে আবদুল্লাহ জাহিদ যে আকরগ্রন্থ লিখেছেন, তাতে একদিকে এক শতাব্দী আগের মার্কিন সমাজ ও সংস্কৃতির একটি ভালো ছবি মেলে; অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার দোলাচলও চমৎকারভাবে ধরা পড়ে। একই সঙ্গে ধরা পড়ে বাংলা ভাষার এই শ্রেষ্ঠ কবির ব্যক্তিত্বের অসংগতি ও পরস্পরবিরোধিতা। আগামী দিনের কোনো গবেষক এই আকরগ্রন্থ ব্যবহার করে প্রকৃত আলোকসম্পাতকারী গবেষণা বা অভিসন্দর্ভ উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

  • আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ
    আবদুল্লাহ জাহিদ

    প্রকাশক: ভাষাচিত্র
    প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
    প্রচ্ছদ: আনিসুল হক
    পৃষ্ঠা: ৩৫২; মূল্য: ১০০০ টাকা