তুর্কি সাহিত্যিক এলিফ শাফাকের বিখ্যাত উপন্যাস ফর্টি রুলস অব লাভ। উপন্যাসটির গল্প এগোতে থাকে শামস তাবরিজকে কেন্দ্র করে। মরমি কবি জালাউদ্দিন রুমির ‘অভিন্নহৃদয় বন্ধু’ হয়ে উঠেছিলেন শামস। পথে পথে ফিরে স্রষ্টাকে খোঁজাই ছিল তাঁর কাজ। রুমি তখনো কবি হয়ে ওঠেননি।
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি তখন আনাতোলিয়ার কোনিয়া শহরে স্বনামধন্য ধর্মবেত্তা। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দূরদূরান্তে; কিন্তু মনে তাঁর শান্তি নেই। প্রতিদিন স্বপ্নে দেখেন—তাঁর একজন সঙ্গী আসবেন, পথ দেখাবেন আলোর। সেই অজানা সঙ্গীর প্রতীক্ষায় নির্ঘুম রজনী কাটে রুমির।
একদিন ঠিকই শামস তাবরিজ কোনিয়ায় হাজির হলেন। এসেই সটান রুমির সঙ্গে দেখা করতে চলে গেলেন না। তাঁর ইচ্ছা, শহরের মানুষ রুমি সম্পর্কে কী ভাবেন, সেটি জানার। সেদিনই জুমার নামাজে খুৎবা দিচ্ছেন রুমি।
গোপনে ছেলে সেজে খুতবা শুনতে এসেছেন এক বারাঙ্গনা। মা–বাবার দেওয়া নাম হারিয়ে এখন তাঁর নাম ‘মরুর গোলাপ’ বা ‘ডেজার্ট রোজ’। কিন্তু সেখানে তাঁকে দেখে চিনে ফেলেন তাঁরই এক পুরোনো খদ্দের বাইবারস। টেনেহিঁচড়ে তাঁকে মসজিদ থেকে বাইরে বের করে আনা হয়। তাকে ঘিরে বাইবারসের মতো আরও কয়েকজন যখন হিংস্র উন্মাদনায় মাতাল, ঠিক তখনই সেখানে আসেন শামস। রুখে দেন এই দঙ্গলবাজদের।
পরে যখন এই ডেজার্ট রোজের সঙ্গে তাবরিজের আলাপ হয়; তখন রোজ বলেন, তাঁর হয়তো মসজিদে খুতবা শুনতে যাওয়াই উচিত হয়নি। কারণ, তিনি তো স্খলিত! শামস তখন তাঁকে একটি গল্প বলেন। গল্পটি মূলত সহিহ বুখারিতে বর্ণিত ৩৩২১ নম্বর হাদিস থেকে নেওয়া। একবার এক বারাঙ্গনা দেখেন, পথের একটি কুকুর পানি না পেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। কাছের একটি কুয়া থেকে পানি তুলে তিনি কুকুরটিকে দেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, তাঁর এই একটি কাজের প্রতিদানে মহান স্রষ্টা তাঁর সব পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন।
শামস বলেন, ডেজার্ট রোজ যেন নিজেকে সম্মান করতে শুরু করেন, ভালোবাসতে শুরু করেন। তাহলেই অনিন্দ্যসুন্দর জীবনের দেখা তিনি পাবেন, পাবেন বেশ্যালয় থেকে মুক্তি। শামস আরও প্রশ্ন করেন—বাইবারসের মতো মানুষেরা, যারা একটু আগে দঙ্গল পাকিয়ে রোজের প্রাণ নিতে উন্মুখ হয়েছিল, তারা কি আদৌ স্রষ্টার চোখে পুণ্যবান?
এলিফ শাফাক এখানে আরও গভীর এক প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। বেশ্যালয়ে যাঁরা থাকেন, সেই নারীরাই কেন অপবিত্র হন? কেন সেখানে যাতায়াত করা পুরুষেরা দিব্বি ধর্মের পাহারাদার হয়ে উঠতে পারেন? কেন কলঙ্ক কেবল নারীর? কেন বেশ্যালয়ের পুরুষ খদ্দেররা থেকে যান নিষ্কলুষ?
কাজী নজরুল এ প্রশ্ন তোলেন অনেকটা সরসারি, কোনো ভণিতা না করেই। নজরুলের ভাষায়, ‘দোহাই তোদের! এবার তোরা সত্যি করে সত্য বল।/ ঢের দেখালি ঢাক ঢাক গুড় গুড় ঢের মিথ্যা ছল।।’ বারাঙ্গনা প্রশ্নে নিজের অবস্থান অকপটে তুলে ধরেন কবি ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায়—
‘তব সন্তানে জারজ বলিয়া কোন্ গোঁড়া পাড়ে গালি,
তাহাদের আমি এই দু’টো কথা জিজ্ঞাসা করি খালি—
দেবতা গো জিজ্ঞাসি—
দেড় শত কোটি সন্তান এই বিশ্বের অধিবাসী—
কয়জন পিতা-মাতা ইহাদের হ’য়ে নিষ্কাম ব্রতী
পুত্রকন্যা কামনা করিল? কয়জন সৎ-সতী?
ক’জন করিল তপস্যা ভাই সন্তান-লাভ তরে?
কার পাপে কোটি দুধের বাচ্চা আঁতুড়ে জন্মে’ মরে?
সেরেফ্ পশুর ক্ষুধা নিয়ে হেথা মিলে নরনারী যত,
সেই কামনার সন্তান মোরা! তবুও গর্ব কত!
শুন ধর্মের চাঁই—
জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই!
অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়! ’
আবদুল্লাহেল মাহমুদের লেখা নাটক কৈবর্ত গাথার গল্প এর আগেও একদিন করেছিলাম। এই নাটকের নায়িকা কঙ্কাবতী। দুর্ভিক্ষে গ্রাম থেকে পালিয়ে শহরে এলে তাঁর ঠাঁই হয় বেশ্যালয়ে। তাঁর কাছে আসেন রাজপুত্র, রাজসভাকবি থেকে শুরু করে পথের ভিখারি পর্যন্ত। তাঁর অবস্থান থেকেই তিনি নিষ্ঠুর পাল রাজাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। মুক্তির লড়াইয়ে জীবন দেন শেষ পর্যন্ত।
এই পুরো নাটকে সবচেয়ে গূঢ় প্রশ্নটি আসে কঙ্কার মুখ দিয়ে। যশ আর নগদ প্রাপ্তির আশায় তখন অনর্গল মিথ্যা উৎপাদন করে চলেছেন রাজসভাকবি সন্ধ্যাকর। তাঁর কাছেই কঙ্কার প্রশ্ন, ‘গৃহে অন্ন, মাথায় ছাদ, সব থাকতে তুই কেন বেশ্যা হলি?’ ‘অদ্ভুত অলৌকিক এ পঙ্ক্তিমালা’! কেন কেবল শরীর বিক্রি করে নারী বেশ্যা হন? কেন মন, বিবেক–বিবেচনা, যুক্তি সব বিক্রি করে পুরুষ বেশ্যা নয়?
হালে কর্মজীবী নারীকে ‘বেশ্যা’ বলায় বিস্তর হইচই লেগেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বেশ্যাখানা ছিল বলে বক্তৃতা দিয়েছেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি শামীম আহসান। এতে অবশ্য তাঁর রুকন পদ স্থগিত হয়েছে। জামায়তের আমিরের এক্স হ্যান্ডল থেকে কর্মজীবী নারীদের বেশ্যা বলে পোস্ট দেওয়া হয়েছে। পরে দাবি করা হয়েছে তা হ্যাক হয়েছিল। এ নিয়ে বিতর্ক শেষ হতে এখনো ঢের বাকি।
যে নারীরা রাজপথে বেরিয়ে এসেছিলেন ‘২৪-এর অগ্নিঝরা বর্ষায়, তাঁরা বৈষম্য দূর করার স্বপ্ন নিয়েই এসেছিলেন! তাঁরা হয়তো আজ আর দৃশ্যমান নন; কিন্তু কেউ যদি মনে করেন তাঁরা হারিয়ে গেছেন, তবে খুব বড় ভুল হবে।
আমার প্রশ্ন সেখানে নয়। আমার প্রশ্ন সেই সমাজব্যবস্থা নিয়ে, যেখানে বেশ্যাবৃত্তির দায় কেবল নারীর! এ নিয়ে সমাজে ঘৃণার আস্ফালন দেখলে মনে হতে পারে, এই বৃত্তি নারী একা একাই চালাতে পারেন পুরুষের কোনো সংস্রব ছাড়াই। যে পুরুষ বেশ্যালয়ে যাতায়াত করেন, তাঁর জন্য বিশেষ কোনো শব্দও অভিধান ঘেঁটে পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে যে শিশুর জন্ম হচ্ছে সেই পুরুষের ঔরসে, তার জন্য বিশেষ নাম খুঁজে নিয়েছে সমাজ ‘জারজ’। নজরুল প্রশ্ন করছেন—
‘কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?
হয়ত তোমায় স-ন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।
না-ই হ’লে সতী, তবু তো তোমরা মাতা-ভগিনীরই জাতি;
তোমাদের ছেলে আমাদেরই মতো, তারা আমাদের জ্ঞাতি;
আমাদেরই মতো খ্যাতি যশ মান তারাও লভিতে পারে,
তাহাদের সাধনা হানা দিতে পারে সদর স্বর্গ-দ্বারে।—’
পুরুষতান্ত্রিকতার মূল কত গভীরে প্রোথিত, তা ভাষার প্রয়োগ দেখলেই বোঝা যায়। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল মন্ত্রই হলো বৈষম্য থেকে মুক্তি। আর বৈষম্যের সবচেয়ে পুরোনো রূপটি বোধ করি নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্য। এ বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে কাজ করে চলেছেন নারী-পুরুষ উভয়েই। কেউ জেনে, কেউ না জেনে।
অথচ যে নারীরা রাজপথে বেরিয়ে এসেছিলেন ‘২৪-এর অগ্নিঝরা বর্ষায়, তাঁরা বৈষম্য দূর করার স্বপ্ন নিয়েই এসেছিলেন! তাঁরা হয়তো আজ আর দৃশ্যমান নন; কিন্তু কেউ যদি মনে করেন তাঁরা হারিয়ে গেছেন, তবে খুব বড় ভুল হবে। কারণ, তাদের কানে কানে নজরুল আজও গেয়ে চলেছেন—
‘ধূ ধূ জ্ব’লে ওঠ ধূমায়িত অগ্নি,
জাগো মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নী!
পতিতোদ্ধারিণী স্বর্গ-স্খলিতা
জাহ্নবী সম বেগে জাগো পদ-দলিতা,
মেঘে আনো বালা বজ্রের জ্বালা
চির-বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা।।’
মানজুর–আল–মতিন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
* মতামত লেখকের নিজস্ব