
বাব আল-মানদেব প্রণালি ও লোহিত সাগরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা মিসরকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে কায়রোকে যে বিশাল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত মাশুল গুনতে হবে, তা নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগের শেষ নেই।
ইয়েমেনে হুতিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, সৌদি আরবের ভেতরে তাদের ঘন ঘন হামলা এবং লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে কৌশলগত দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ কায়রোর আঞ্চলিক অবস্থানের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, অঞ্চলটিতে হরমুজ প্রণালির মতো আরেকটি জটলা বা সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে।
কায়রো আজ এমন এক নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যা কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সুয়েজ খালের রাজস্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে না; বরং মিসরের পূর্ব ও দক্ষিণ সীমান্তে যেন এক বিষাক্ত খঞ্জর বসিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে জলদস্যুতা, সামরিক প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হওয়া এই বাব আল-মানদেব প্রণালি কায়রোর জন্য সত্যিই চরম দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। হুতিরা যদি একে ‘দ্বিতীয় হরমুজ প্রণালি’ বানিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়, তবে তা মিসরের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এক মারাত্মক আঘাত হানবে, যা দেশে সামাজিক অসন্তোষও উসকে দিতে পারে।
লোহিত সাগরের এই দক্ষিণ প্রবেশদ্বার সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপকে যুক্ত করা সংক্ষিপ্ততম সামুদ্রিক পথের অন্যতম মূল অংশ। দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল খনিজ তেল (বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৭ শতাংশ), ৮ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং বিশ্ববাণিজ্যের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর এ প্রণালি দিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য আনা-নেওয়া করা হয়।
চলতি পরিস্থিতি হরমুজ এবং বাব আল-মানদেব—উভয় প্রণালি একযোগে অবরুদ্ধ হওয়ার মতো এক ভীতিকর দৃশ্যাংশের দিকে ইঙ্গিত করছে। এমনটি ঘটলে সংকটটি কেবল জ্বালানি বা নৌপরিবহন খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, রূপ নেবে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটে। যার ধাক্কা উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে মিসর, ইউরোপ এবং পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে ইতিমধ্যেই ১৬৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণে জর্জরিত মিসরের অর্থনীতি চরম সংকটে পড়বে।
প্রথমত, সুয়েজ খালের রাজস্ব রাজস্ব আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ রুটের খোঁজে আন্তর্জাতিক নৌযানগুলো সুয়েজ খাল এড়িয়ে বিকল্প পথে চলতে শুরু করবে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি পণ্য আমদানির চড়া বিল পরিশোধ করতে হবে। চতুর্থত, গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে। পঞ্চমত, লোহিত সাগরের তলদেশের সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে মিসরের ইন্টারনেট নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে—যেখানে বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ১৭ শতাংশই মিসরের ওপর দিয়ে যায়। আর ষষ্ঠত, সৌদি-হুতি যুদ্ধে অনিচ্ছাসত্ত্বেও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তো রয়েছেই।
সম্প্রতি কায়রোয় অনুষ্ঠিত মিসর-সৌদি দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতাই প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা মিসরের জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ।
অন্যদিকে দীর্ঘ দুই বছর পর মিসর সফর করা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। তাঁর পূর্বে হরমুজ এবং পশ্চিমে বাব আল-মানদেব। ফলে সিসির কাছ থেকে কেবল ফাঁকা আশ্বাস বা মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং লোহিত সাগরকে আঞ্চলিক সংঘাতের আখড়া হওয়া থেকে বাঁচাতে মিসরের প্রত্যক্ষ সামরিক পদক্ষেপ আশা করছেন তিনি।
লোহিত সাগরের বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াদ ও কায়রো—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত। তবে রিয়াদের ঝুঁকি কিছুটা বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে অনীহা প্রকাশ করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদির কৌশলগত বিরোধ রয়েছে এবং ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সত্ত্বেও পাকিস্তান ও তুরস্ক রিয়াদকে প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা দিতে ইতস্তত করছে।
ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়ে হুতিদের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর জন্য মিসরের সামনে কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, বাব আল-মানদেবে মিসরীয় জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পেতে হুতিদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করা।
এমন পরিস্থিতিতে বিন সালমান চাইছেন, মিসর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হুতিদের থামাক এবং নৌপথের সুরক্ষা দিক। এর বিনিময়ে মিসরে নতুন সৌদি বিনিয়োগ, নগদ অর্থ জমা এবং সম্ভবত মিসরের দেনা মওকুফের মতো লোভনীয় প্রস্তাবও টেবিলে রয়েছে।
মিসরও অর্থনৈতিকভাবে সৌদির সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি পা ফেলার পরিণতি নিয়ে কায়রোর মনে গভীর ভয় রয়েছে। তাই সরাসরি যুদ্ধ না করে কায়রো মূলত নৌ–নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার করার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। কায়রো চাইছে, কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা প্রশমন করতে, আর রিয়াদ চাইছে আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠন করে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। অন্যদিকে হুতিদের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক অবরোধ ভেঙে অঞ্চলে নিজেদের সামরিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা।
ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়ে হুতিদের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর জন্য মিসরের সামনে কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, বাব আল-মানদেবে মিসরীয় জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পেতে হুতিদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করা।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষায় এবং লোহিত সাগরের সামরিকীকরণ রোধে একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমঝোতায় পৌঁছানো এবং তৃতীয়ত, সৌদিসহ লোহিত সাগর তীরবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে নৌ-নিরাপত্তা সমন্বয় বাড়ানো, যাতে কোনো পক্ষই নৌপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিসরের সামনে আরও কিছু বিকল্প রয়েছে। যেমন হুতিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করা কিংবা সানা নিয়ন্ত্রণকারী হুতিদের সঙ্গে কিছুটা রাজনৈতিক নমনীয়তা দেখিয়ে সুয়েজ খালমুখী জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি নেওয়া। এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে একটি রাজনৈতিক সমাধান প্রস্তাব করা অথবা হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পঙ্গু করে দিতে সীমিত পরিসরে নির্দিষ্ট স্থানে বিমান হামলা চালানো।
কায়রো ও রিয়াদের মূল স্বার্থ হলো—বাব আল-মানদেবের সমস্যাটিকে ইরানের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে পৃথক রাখা। কিন্তু সংঘাতের অন্যান্য পক্ষ চাইবে, হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—উভয় পথকে নিজেদের দর–কষাকষির হাতিয়ার বানাতে। এতে ইরান ও হুতি শিবিরের অবস্থানই শক্তিশালী হবে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান জন র্যাটক্লিফের সাম্প্রতিক হঠাৎ কায়রো সফর বেশ অর্থবহ। এই গোপন সফরের উদ্দেশ্য হয়তো ওই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, যা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন রূপ দিতে পারে।
মিসরের নীতিনির্ধারকেরা আপাতত বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়িয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথেই হাঁটতে চান। তবে কায়রোর এই শান্তির কৌশল ওয়াশিংটন কিংবা তেহরানের যুদ্ধংদেহি মনোভাবের সঙ্গে খাপ খাবে কি না, তা নিয়ে বড় সংশয় রয়েছে। আর দুই পরাশক্তির টানাপোড়েনে বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালির সংকট ঘনীভূত হলে তার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে বিশ্ব অর্থনীতিকেই।
মাহমুদ হাসান সাংবাদিক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।