
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে আর মাত্র সাত মাস বাকি। এমন এক সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য, একটি ‘ক্যু’ বা অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য, এ যেন এক আদর্শ পরিস্থিতি।
ট্রাম্পের মূল চিন্তা একটাই—নিজের ক্ষমতা ও আরাম-আয়েশ ধরে রাখা। ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় (যার সম্ভাবনা প্রবল) তাহলে এই ক্ষমতার বড় অংশই ট্রাম্পের হাতছাড়া হবে।
নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে ট্রাম্প যে কোনো দ্বিধা করেন না, তা আগেই দেখা গেছে। তিনি ইতিমধ্যে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, এমনকি মাঝপথে নির্বাচন বাতিল করার কথাও বলেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভোটাধিকার কঠোরভাবে সীমিত করার মতো আইন পাস করানোর চেষ্টাও করেছেন ট্রাম্প।
তবে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যেন ‘উত্তেজনা বাড়ানোর’ এক ফাঁদে আটকে পড়েছেন। আজকের ব্যর্থতা কাল নতুন কোনো পদক্ষেপ নিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যাবে—এই ধারণাই যেন তাঁদের চালিত করছে।
সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আর তার ভবিষ্যৎ যত অনিশ্চিত থাকছে, ততই প্রেসিডেন্টের আশপাশের লোকজন লাভবান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে শেয়ারবাজারে লেনদেন, রাজনৈতিক বাজি বা অস্ত্র ব্যবসা—সবই চলছে। আর এই পরিস্থিতি যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ততই ‘ক্যু’ ঘটানোর সুযোগ বাড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা বাজেট ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাবটিও বোঝা দরকার। এটি আসলে সেই সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য একধরনের ‘প্রলোভন’, যাঁদের সমর্থন তাঁর দরকার। অন্যদিকে হেগসেথ দ্রুতগতিতে নীতিমান ও নীতিতে অটল কর্মকর্তাদের উচ্চপদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আমেরিকান জনগণ যদি সতর্ক ও দৃঢ় থাকে, তাহলে এসব পরিকল্পনার কোনোটিই সফল হওয়ার কথা নয়। ইতিহাসের জ্ঞান ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। ট্রাম্পের ‘ক্যু’ প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় বাধা তার দুর্বলতা নয় বরং জনগণের আগাম অনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি।
অবশ্য বিদেশি যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করা সহজ নয়। আর ট্রাম্পের অবস্থানও ততটা শক্ত নয়। তবু তিনি যদি এমন চেষ্টা করেন, তাহলে সেই চেষ্টা পাঁচটি সম্ভাব্য পথে এগোতে পারে।
প্রথমত, ট্রাম্প যুক্তি দেখাতে পারেন—যুদ্ধের সময় স্থিতিশীল নেতৃত্ব দরকার। ২০০৪ সালের নির্বাচনে জর্জ ডব্লিউ বুশ এই যুক্তি ব্যবহার করেছিলেন। তবে সেখানে যুদ্ধের যৌক্তিকতা বা নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই যুক্তি ব্যবহার করতে হলে তাঁকে হয় নির্বাচন বাতিল করতে হবে, নয়তো ফলাফল উল্টে দিতে হবে।
তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে এমন সহযোগী, যাঁরা আইন ভাঙতে প্রস্তুত। অথচ অধিকাংশ আমেরিকানই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধী। এই সংঘাত ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের ভেতরেও ফাটল ধরিয়েছে। তা ছাড়া সম্ভাব্য নির্বাচনী কারচুপির সঙ্গে জড়িত অনেককেই ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় পথটি ‘বোনাপার্টবাদ’। অর্থাৎ বিদেশে গণতন্ত্র রক্ষার নামে যুদ্ধ চালিয়ে, দেশের ভেতরে গণতন্ত্র ভেঙে দেওয়া। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি নেপোলিয়নের যুদ্ধনীতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ট্রাম্প কখনোই গণতন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাননি। বরং তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরশাসকদের পছন্দ করেন এবং বিদেশে রাষ্ট্রগঠনের বিরোধিতা করে সেই অর্থ দেশের ভেতরে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তৃতীয় পথ ‘বিসমার্কীয় ঐক্য’। প্রুশিয়ার নেতা অটো ভন বিসমার্ক ১৮৬৪ থেকে ১৮৭১ সালের মধ্যে ডেনমার্ক, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তিনটি যুদ্ধ জিতে জার্মানিকে একত্র করেছিলেন। তবে এটি বিপ্লব বা নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, শক্তির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। ফলে নতুন জার্মান সাম্রাজ্য শুরু থেকেই ছিল সামরিকতান্ত্রিক রাজতন্ত্র, যেখানে পার্লামেন্ট কার্যত প্রতীকী।
ট্রাম্প হয়তো এই মডেল পছন্দ করবেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা হলো—একটি যুদ্ধই তিনি জিততে পারছেন না, তিনটি তো দূরের কথা।
চতুর্থ পথটি ফ্যাসিবাদী নেতাদের মতো নিজের জনগণের একটি অংশকে যুদ্ধে বলি দিয়ে বাকি জনগণকে বিশ্বাস করানো যে, চারপাশে শত্রুতে ঘেরা এক কঠিন সংগ্রামের মধ্যে তারা বেঁচে আছে। তখন গণমৃত্যুই হয়ে ওঠে অর্থবহ এক অভিজ্ঞতা, যা কিনা নেতা ও জনগণকে একসূত্রে গেঁথে ফেলে।
পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধেও এর কিছুটা ছায়া দেখা যায়। তবে এর ক্লাসিক উদাহরণ ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানির সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ। সে আক্রমণ প্রথমে কঠিন হলেও দীর্ঘ সময় ধরে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল।
তবে ট্রাম্প প্রচলিত অর্থে ফ্যাসিস্ট নন। নাৎসিদের মতো ‘সংগ্রাম’-এ তাঁর বিশ্বাস নেই। জীবনের শেষভাগে এসে তিনি যুদ্ধে আগ্রহী হয়েছেন, ভেবেছেন বিদেশে সহজ ‘জয়’ তাঁকে দেশে জনপ্রিয় করে তুলবে। ইরানে জয়ের দাবি তিনি বহুবার করেছেন। ফলে হঠাৎ করে ব্যাপক স্থলযুদ্ধ শুরু করে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি নেওয়া তাঁর জন্য কঠিন। কারণ, সেই আদর্শগত প্রস্তুতি তিনি নেননি।
এর বিপরীতে হিটলার প্রথমে পোল্যান্ড ও ফ্রান্সে দ্রুত জয় পেয়েছিলেন, যা সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। এরপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে আরও বড় ও আদর্শগত যুদ্ধ শুরু করেন।
সবশেষে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক পথটি হলো ‘সন্ত্রাসের ব্যবহার’। যুদ্ধের সময় কোনো বিদেশি শক্তি যদি আমেরিকান নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়, তাহলে সেটিকে অজুহাত বানিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে নির্বাচন স্থগিত করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। আর সম্ভবত ঘটবেও না।
ইরানের প্রচারে মাঝে মাঝে মার্কিন নেতাদের বিরুদ্ধে হুমকি শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে তারা হেগসেথকে হত্যা করার চেয়ে তাকে উপহাস করতেই বেশি আগ্রহী।
আরেকটি সম্ভাবনা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন। অর্থাৎ নিজেদের তৈরি সন্ত্রাস। ১৯৯৯ সালে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মস্কোয় অ্যাপার্টমেন্টে বোমা হামলা চালিয়ে এক ধারাবাহিক ঘটনার সূচনা করেছিল। এটি শেষ পর্যন্ত পুতিনের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে সহায়ক হয়। পুতিনের ঘনিষ্ঠ ট্রাম্পও এমন কৌশল ভেবে দেখেছেন—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক তিক্ত। ফলে এমন কোনো অপারেশন তিনি সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আর এমন হামলা হলেও নির্বাচন বন্ধ করার সুস্পষ্ট পথ নেই।
তবু আগামী সাত মাসে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হলে আমেরিকানদের সতর্ক থাকা উচিত—কারণ, ট্রাম্প সেটিকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের দোষারোপ করতে পারেন এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আমেরিকান জনগণ যদি সতর্ক ও দৃঢ় থাকে, তাহলে এসব পরিকল্পনার কোনোটিই সফল হওয়ার কথা নয়। ইতিহাসের জ্ঞান ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। ট্রাম্পের ‘ক্যু’ প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় বাধা তার দুর্বলতা নয় বরং জনগণের আগাম অনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি।
টিমোথি স্নাইডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঙ্ক স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসির আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ার।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ